করোনা মহামারীতে দেশজুড়ে সংক্রমণের ঊর্ধ্বগতি এবং অতিমারীর এই জটিল সংকটেও চা উৎপাদন বন্ধ করেনি শ্রমিকরা। দেশের অর্থনীতির চাকা সচল রেখেছে। আমাদের পেয়ালা উপচে দিয়েছে ক্লান্তি নিবারণী টলটলে চায়ে। কিন্তু চা শ্রমিকের ক্লান্তিকর বিবর্ণ অর্থনীতি কি একটুখানিও চাঙা হলো? চুমুকেই চাঙা হয়ে ওঠা দেশের কতজন মানুষ জানে যে একজন চা শ্রমিকের দৈনিক মজুরি কত? মহামারীকালে ১৩ জুন ২০২১ সরকারের নিম্নতম মজুরি বোর্ড একজন চা শ্রমিকের নিম্নতম মজুরি দৈনিক ১১৭ টাকা প্রস্তাব করে গেজেট প্রকাশ করেছে। ১১৭ টাকা দিয়ে কি একটি পাঁচ সদস্যের পরিবারের চাল-ডাল-নুন হয়? এরপর তো পড়েই রইল শিক্ষা, স্বাস্থ্য, যোগাযোগ কি বিনোদনের খরচ। নয়া উদারবাদী বাজারের প্রবল ভোগবাদিতার হাতছানি না হয় এখানে নাই টানলাম। তো, চায়ে চুমুক দিতে দিতে চাঙা হয়ে ওঠা নীতিনির্ধারকরা কি একবার ভাববেন একজন চা শ্রমিকের দৈনিক মজুরি কত হতে পারে?
চা শ্রমিকের মাথাপিছু আয় কত?
বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে তরতর করে। তার একটি মাপকাঠি দেখানো হচ্ছে মাথাপিছু আয়। প্রতিবেশী অনেক দেশের চেয়ে এখানে মাথাপিছু আয় বেশি। সরকারি হিসাবে ২০১৯-২০ অর্থবছরে এ আয় ছিল ২,০৬৪ মার্কিন ডলার বা প্রায় ১ লাখ ৭৫ হাজার টাকা। অথচ ২০০৫-০৬ সালে ছিল ৫৪৩ মার্কিন ডলার। মানে গত ১৩/১৪ বছরে দেশে মাথাপিছু আয় বেড়েছে প্রায় তিন গুণ। কিন্তু এই মাথাপিছু আয় কার আয়? দেশের ১৬৭টি চা বাগানের লক্ষাধিক স্থায়ী চা শ্রমিক বা প্রায় দশ লাখ বাগানিয়া মানুষের আয়? ১৩/১৪ বছর আগে একজন চা শ্রমিকের দৈনিক মজুরি ছিল প্রায় ৩০ টাকা। এখন ১১৭ টাকা প্রস্তাব করেছে নিম্নতম মজুরি বোর্ড। নিম্নতম মজুরি বোর্ডের হিসাব ধরলে একজন চা শ্রমিকের মাসিক মজুরি মাত্র সাড়ে তিন হাজার টাকা হয় এবং বছরে তা দাঁড়ায় মাত্র ৪২,১২০ টাকা। কিন্তু সেটি তো ১ লাখ ৭৫ হাজার টাকার ধারে-কাছেও যেতে পারছে না। নিম্নতম মজুরি বোর্ডের প্রস্তাব মেনে নিলে, পাশাপাশি এটিও মানতে হচ্ছে দেশে প্রায় ১০ লাখ মানুষের মাথাপিছু আয় খুবই কম। উন্নয়নের পরিভাষায় এরা ‘গরিব’ ও ‘প্রান্তিক’। তার মানে রাষ্ট্র চা বাগানের ১০ লাখ মানুষকে উন্নয়নের মূলধারায় যুক্ত করতে পারেনি। ১৭ কোটির দেশে ১০ লাখ মানুষ কি তাহলে পিছিয়ে আছে? নাকি পিছিয়ে রাখা হয়েছে? অথচ নিদারুণভাবে এই মেহনতি ১০ লাখ মানুষই প্রতিদিন তাদের রক্তজলের লিকারে চাঙা রাখছে ক্লান্ত স্বদেশ।
নিম্নতম মজুরি বোর্ড কী করেছে?
১৯৬২ সালের ‘দ্য টি-প্ল্যান্টেশন লেবার অর্ডিন্যান্স’ এবং ১৯৭৭ সালের ‘দ্য টি-প্ল্যান্টেশন লেবার রুলস’ দ্বারা চা শ্রমিকদের কল্যাণ নিয়ন্ত্রিত হতো। পরে ২০০৬ সালে বাংলাদেশ শ্রম আইনে চা বাগান অন্তর্ভুক্ত করা হয়। ২০০৮ সালে একজন চা শ্রমিকের মজুরি ছিল দৈনিক ৩২ টাকা। ২০০৯ সালে নিম্নতম মজুরি বোর্ড সর্বনিম্ন মজুরি নির্ধারণ করে ৪৫ টাকা এবং সর্বোচ্চ ৪৮ টাকা। এর আগে চা শ্রমিকদের মজুরি নির্ধারিত হতো শ্রমিক পক্ষের প্রতিনিধি চা শ্রমিক ইউনিয়ন এবং মালিক পক্ষের প্রতিনিধি ‘বাংলাদেশীয় চা সংসদ’-এর ভেতর সম্পাদিত চুক্তির মাধ্যমে। সর্বশেষ চুক্তিপত্রটি কার্যকর হয় ২০০৫ সালে এবং ২০০৭ সালে চুক্তির মেয়াদ শেষ হলেও দেশে জরুরি অবস্থার কারণে তখন চুক্তি হয়নি। প্রতি পাঁচ বছর পরপর মজুরি বোর্ড গঠন করে চা শ্রমিকের মজুরি নির্ধারণ করার কথা থাকলেও দীর্ঘ ১১ বছর পর চলমান করোনা অতিমারীকালে ১৩ জুন চা শ্রমিকদের জন্য অন্যায্য এই মজুরি কাঠামো গেজেট আকারে প্রকাশ করে। গেজেটে সিলেট, মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জ জেলার চা বাগানগুলোকে ‘এ’, ‘বি’ এবং ‘সি’ শ্রেণিতে এবং চট্টগ্রাম, রাঙ্গামাটি ও অন্যান্য জেলার চা বাগানকে ১, ২ ও ৩ ক্যাটাগরিতে ভাগ করে মজুরি প্রস্তাব করা হয়েছে। বছরে ১,৮০,০০০ কেজি বা তার চেয়ে বেশি চা উৎপাদন করে এমন বাগান এ-শ্রেণি এবং ১,০৮,০০০ কেজির কম উৎপাদন করে চা বাগানগুলো সি-শ্রেণির। এ-শ্রেণির বাগানের স্থায়ী এবং সাময়িক/ক্যাজুয়াল শ্রমিকের জন্য দৈনিক ১২০ টাকা, বি-শ্রেণির বাগানের জন্য ১১৮ টাকা এবং সি-শ্রেণির বাগানের জন্য ১১৭ টাকা প্রস্তাব করেছে মজুরি বোর্ড। পাশাপাশি চা বাগানের সঙ্গে জড়িত সব পদের জন্যই মজুরি প্রস্তাবিত হয়েছে। নিম্নতম মজুরি বোর্ডের চেয়ারম্যান, নিরপেক্ষ সদস্য, মালিকদের প্রতিনিধি এবং শ্রমিকদের প্রতিনিধিসহ মোট ছয়জনের স্বাক্ষর এই গেজেটে আছে। শুধু শ্রমিকদের প্রতিনিধিত্বকারী রামভজন কৈরী এই গেজেটে স্বাক্ষরদানে বিরত ছিলেন।
চা-শিল্পের ভঙ্গুর মেরুদন্ড
চা শ্রমিকই চা-শিল্পের মেরুদ-। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনকালে ১৮৫৪ সালে সিলেটের মালনীছড়ায় এবং ১৮৯৪ সালে চট্টগ্রামের কোদালায় চা উৎপাদন শুরু হয়। বাংলাদেশ চা উন্নয়ন বোর্ডের হিসাবে দেশে এখন ১৬৭টি চা বাগান আছে। অন্যদিকে ১৬৭ বছর ধরে চা উৎপাদন করতে থাকলেও চা শ্রমিকের মজুরি এখনো ১৬৭ টাকাও হয়নি! চা শ্রমিক ইউনিয়নের তথ্য মতে দেশে নিবন্ধিত চা শ্রমিক প্রায় ১ লাখ ১৭ হাজার এবং অনিবন্ধিত আরও প্রায় ২৫ হাজার। এ ছাড়া চা বাগানে বসবাস করছে প্রায় ১০ লাখ মানুষ। ইতিহাস বলে এক পয়সা মজুরি বাড়ানোর দাবিতে শ্রমিকদের ‘হাত বন্ধ’ আন্দোলনেও যেতে হয়েছে, শিকার হতে হয়েছে জেল-জুলুমের। ব্রিটিশ জুলুম গেছে, পাকিস্তানি জুলুম গেছে, দেশ স্বাধীন হয়েছে কিন্তু চা বাগানগুলোতে শ্রমিক নিপীড়নের ঔপনিবেশিক মনস্তত্ত্ব এবং বৈষম্যমূলক দৃষ্টিভঙ্গি বদলায়নি। চা বাগানগুলো যেন এখনো একটি স্বাধীন দেশের ভেতরই একেকটি জুলুমের মুলুক হয়ে আছে। এই জুলুমখানা ছেড়ে ১৯২১ সালে হাজারে হাজার চা শ্রমিক নিজ মুলুকে ফিরতে চেয়েছিল। কিন্তু চা শ্রমিকের রক্তে প্রমত্ত মেঘনা নদীকে লাল করেছিল ব্রিটিশ সরকার। যে ঘটনা এখনো ‘মুলুক চলো দিবস’ হিসেবে পালন করে চা শ্রমিকরা। স্মরণ করুন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাও একই বছরে। শত বছর পাড়ি দিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় যখন গর্ব করছে, স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে উদযাপনে যখন গৌরবান্বিত পুরো দেশ, তখনো চা শ্রমিকদের ওপর চেপে থাকছে দৈনিক ১১৭ টাকার মজুরির জোয়াল। অথচ মুক্তিযুদ্ধসহ দেশের নানা কৃষক-শ্রমিক আন্দোলনে চা শ্রমিকদের আছে অবিস্মরণীয় অবদান। অন্যদিকে, এখনো চা বাগানে পানীয়-জলের ব্যবস্থা নেই, বছর বছর ডায়রিয়া আর পানিবাহিত রোগে সেখানে মানুষ মারা যায়। বিপজ্জনক রাসায়নিক ব্যবহৃত হয় চা বাগানে, এতে নারী-শিশুরা ভুগছে দুরারোগ্য ব্যাধিতে। চা বাগানগুলোতে কেন এত ক্যানসার আক্রান্ত মানুষ এর কারণ কি খতিয়ে দেখছে চা বোর্ড? এখনো ১০ হাতের ছোট্ট খুপরি ঘরে দিন কাটে চা বাগানের লাখো লাখো পরিবারের। নেই নিরাপদ পুষ্টিকর খাদ্যের জোগান। বিগত ১৬৭ বছরেও নিশ্চিত হয়নি চা শ্রমিকদের স্থায়ী আবাসন ও ভূমির মালিকানা। শিক্ষা, ক্রীড়া, প্রযুক্তি বা বিনোদন কিছুই নাগালে নেই এই চা শ্রমিকের। তার পরও চা শ্রমিকরা পরিবেশ ও বাস্তুতন্ত্র সংরক্ষণে রাখছে অনবদ্য অবদান। চা বাগানের বিশাল সবুজের আবহ টিকে আছে চা শ্রমিকের রক্তজলের বিনিময়েই।
দৈনিক মজুরি ৬০০ টাকা হোক
নিম্নতম মজুরি বোর্ড কর্তৃক ঘোষিত ৪৩টি সেক্টরে এবং মজুরি কমিশন ঘোষিত রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্প সেক্টরের মজুরির ভেতর তুলনা করে অনেকে দেখিয়েছেন যে চা শ্রমিকের মজুরি কত কম। চলমান করোনা মহামারীর মধ্যেও ২০২০ সালে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ১ কোটি ৪ লাখ ৫০ হাজার কেজি চা বেশি উৎপাদন করেছে চা শ্রমিকরা। চা উৎপাদনে বাংলাদেশ আজ বিশ্বে নবম স্থান অর্জন করেছে। এই অবিস্মরণীয় সাফল্যের একমাত্র কারিগর এই বঞ্চিত চা শ্রমিক জনগণ। করোনা মহামারীর ভেতরেও যারা লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি উৎপাদন করল, দেশের অর্থনীতি এবং বৈশ্বিক পরিসরে দেশের জন্য মর্যাদা বয়ে আনল, রাষ্ট্র কি পারে তাদের ওপর এক অন্যায় মজুরি হার চাপিয়ে দিতে? আশা করি রাষ্ট্র চা শ্রমিকের ন্যায্য জীবনের পক্ষে দাঁড়াবে। ন্যায্য মজুরিসহ চা বাগানে গণতান্ত্রিক পরিবেশ প্রতিষ্ঠায় বাগান মালিকসহ সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে বাধ্যবাধকতা ও জবাবদিহির আওতায় আনতে রাষ্ট্রকে অগ্রণী হতে হবে। চা বাগানের মানুষরা রাষ্ট্রের নাগরিক, কোনো কোম্পানি বা মালিকপক্ষের চুক্তিবদ্ধ দাস নয়। দেশের সব নাগরিকের সমমর্যাদা সমুন্নত রাখার ঘোষণা দিয়েছে আমাদের সংবিধান; চা শ্রমিকরা নিশ্চয়ই এর বাইরে নয়? আশা করি মজুরি বোর্ড তাদের প্রস্তাবিত মজুরি কাঠামোটি বাতিল করবে এবং চা শ্রমিক জনগণের আকাক্সক্ষা, দাবি, প্রস্তাব এবং সুপারিশগুলো গুরুত্ব দিয়ে বিশ্লেষণ করে একটি ন্যায্য মজুরি কাঠামো পুনর্নির্ধারণ করবে। বর্তমান বাজার ও সামগ্রিক পরিস্থিতি বিবেচনায় চা শ্রমিকদের জন্য দৈনিক মজুরি ৬০০ টাকা করা যায় কি না, বিষয়টি আমলে নেওয়ার প্রস্তাব রাখছি।
লেখক গবেষক ও লেখক
animistbangla@gmail.com