করোনা সংক্রমণ রোধে ব্যয় এবং করণীয়

করোনা মহামারীর শুরু থেকে এখন পর্যন্ত স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন দপ্তর ও প্রকল্পের ব্যাপক দুর্নীতির খবর নিয়মিতই প্রকাশিত হচ্ছে এবং সংসদেও আলোচিত হয়েছে। সর্বশেষ সিরাজগঞ্জ শহীদ মনসুর আলী মেডিকেল কলেজে ৩০০ টাকার আরবিসি টিউব এক লাখ ৩৫ হাজার টাকায় কেনার তথ্য দৈনিক দেশ দেশান্তরের হেডলাইন নিউজ। এদিকে, গত ৯ জুলাই ২০২১ তারিখে দৈনিক প্রথম আলো, বাংলাদেশ প্রতিদিন ও আরও কয়েকটি পত্রিকায় ‘আকুল আবেদন’ শিরোনামে প্রায় আধাপৃষ্ঠা বিজ্ঞাপন মারফত স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্য অধিদপ্তর স্ব-প্রণোদিত হয়ে বিশিষ্ট নাগরিক ও বিরোধী রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের অভিযোগের উত্তরে নিম্নলিখিত তথ্য প্রকাশ করেছেন:

ক) ১ কোটি ১ লাখ ৫০ হাজার ডোজ টিকা কেনা হয়েছে। প্রতি ডোজ ৩০০০ (তিন হাজার) টাকা হিসেবে মোট ব্যয় ৩ হাজার ৪৫ কোটি টাকা।

খ) কভিড পরীক্ষা করা হয়েছে ৬৫ লাখ ৬ হাজার ৭৮১ জনের। প্রতি তিন হাজার টাকা হিসেবে মোট ব্যয় ১ হাজার ৯৫২ কোটি টাকা।

গ) হাসপাতালে ১ লাখ করোনা রোগীর চিকিৎসা করা হয়েছে। প্রতিদিন ২০,০০০ (বিশ হাজার) টাকা হিসেবে ১০ দিনে প্রতি রোগীর জন্য ব্যয় ২ লাখ টাকা। এই খাতে এ পর্যন্ত ব্যয় ২ হাজার কোটি টাকা।

ঘ) সারা দেশে ১০০ সেন্ট্রাল অক্সিজেন লাইন স্থাপন করা হচ্ছে। এই খাতে ব্যয় ৩৫০ কোটি টাকা।

ঙ) ৯৭টি ল্যাব স্থাপন করা হচ্ছে, এই বাবদ ব্যয় ৩০০ কোটি টাকা।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের এই বিজ্ঞাপনের পরিপ্রেক্ষিতে আরও কিছু বিষয় বিবেচনার জন্য সামনে আসা প্রয়োজন। এখানে সে সবের কয়েকটি তুলে ধরা হলো।

১. খালেদা জিয়ার কথিত ২ কোটি টাকা আত্মসাৎ বনাম স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের আকুল আবেদন :দানের দুই কোটি টাকা যথাযথভাবে লিপিবদ্ধ না হওয়ায় ‘সাময়িক আত্মসাৎ’  (Temporary Embezzlement)-এর বিধিতে সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার ৭ বছরের কারাদন্ড হয়েছে, যদিও পুরো টাকা ব্যাংকে জমা রয়েছে এবং তা সুদে-আসলে বেড়ে ৮ কোটি টাকায় পরিণত হয়েছে। বেগম খালেদা জিয়ার মামলাটি স্মরণ রেখে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্য অধিদপ্তর প্রদত্ত তথ্যসমূহ বিশ্লেষণ প্রয়োজন।

২. রাশিয়ার স্পুটনিক-ভি এর প্রতি ডোজের প্রস্তাবিত বিক্রয় মূল্য ৮ (আট) ডলার অর্থাৎ ৮৫০ টাকা। কিন্তু সরকার অন্যত্র কিনছে ৩,০০০ টাকায়। এটা অপচয় না আত্মসাৎ?

সরকার ৩ হাজার ৪৫ কোটি টাকা ব্যয় করেছে ১ কোটি ১ লাখ ৫০ হাজার ডোজ করোনা প্রতিরোধক ভ্যাকসিন কেনার জন্য। তবে সরকার ৭০ লাখ ডোজ ভ্যাকসিন কিনেছে ভারতের সেরাম ইনস্টিটিউট থেকে প্রতি ডোজ ৫ ডলার (৪২৫ টাকা) দরে। সেরাম ইনস্টিটিউটের ৭০ লাখ বাদ দিলে বাকি ৩১ লাখ ৫০ হাজার টিকা কেনার জন্য ব্যয় হয়েছে ২ হাজার ৭৪৭ কোটি ৫০ লাখ টাকা। অর্থাৎ প্রতি ডোজ ৮,৭২২ টাকা দরে। ডলারের হিসেবে প্রতি ডোজ ১০২ মার্কিন ডলার। উল্লেখ্য, সরকার দান হিসেবে অতিরিক্ত কয়েক লাখ ডোজ টিকা উপহার পেয়েছে ভারত ও চীন থেকে এবং কোভ্যাক্সের আওতায়। ২০২১ সালের জুন মাসে রাশিয়ার সরকারি জউওঋ (রাশিয়ান ডাইরেক্ট ইনভেস্টমেন্ট ফান্ড) অনুমোদিত রাশিয়ান কোম্পানি ২ কোটি ডোজ স্পুটনিক-ভি করোনা প্রতিষেধক ভ্যাকসিন প্রতি ডোজ ৮ (আট) ডলার দরে অর্ডার পাওয়ার ১০ দিনের মধ্যে ঢাকা শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে একবারে কিংবা প্রতিদিন ৫ লাখ করে পৌঁছানোর প্রস্তাব করেছে। চীনের প্রতি ডোজ টিকার মূল্য ১০ ডলার। স্পুটনিক-ভি প্রতি ডোজের মূল্য ৮ ডলার। স্পুটনিক-ভি টিকা কিনলে বাংলাদেশ সরকারের সাশ্রয় হবে ৪০ মিলিয়ন ডলার অর্থাৎ ৩৪০ কোটি টাকা।

৩. কভিড পরীক্ষায় সরকারের ব্যয় হয়েছে ১ হাজার ৯৫২ কোটি টাকা অর্থাৎ প্রতি টেস্টে ব্যয় তিন হাজার টাকা। কিন্তু প্রকৃত ব্যয় কত?

RT-PCR এর প্রতি টেস্ট করতে রাসায়নিক দ্রব্য বাবদ খরচ হয় ৭০০ টাকা এবং কনজ্যুমেবলস বাবদ ৩০০ টাকা। বেতন ভাতা, ইলেকট্রিসিটি, বাড়িভাড়া প্রভৃতি বাবদ আরও ৫০০ টাকা। এই হিসাবে প্রতি টেস্টে অপচয়/আত্মসাৎ হয়েছে ১,৩০০ টাকা। অর্থাৎ ৬৫ লাখ ৬ হাজার ৭৮১ টেস্টে অতিরিক্ত ব্যয় হয়েছে ৮৪৫ কোটি ৮৮ লাখ টাকা। এখন তাহলে দুর্নীতি দমন কমিশনের দায়িত্ব খুঁজে বের করে নিশ্চিত হওয়া এসব ক্ষেত্রে কে কত টাকা আত্মসাৎ করেছে এবং এক্ষেত্রে মন্ত্রী, সচিব ও অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের দায়িত্ব কতটুকু। প্রশ্ন জাগে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় এসব বিষয়ে অবগত আছেন কি? ‘সাময়িক আত্মসাৎ’-এর কারণে যদি বেগম খালেদা জিয়ার ৭ বৎসরের কারাদন্ড হয়, তবে প্রকৃত আত্মসাৎ ও অপচয়ের জন্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের কত বছরের কারাদন্ড হবে হিসাব করে দেখুন। 

৪. ৯৭টি পিসিআর ল্যাবরেটরি স্থাপন করতে খরচ হয়েছে ৩০০ কোটি টাকা। অথচ, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে সবচেয়ে দামি জঞ-চঈজ মেশিন বায়োরেড-ডি অক্স এর শুল্কসমেত মূল্য ২৫ লাখ টাকা। সঙ্গে বায়ো সেফটি লেভেল-২ থাকলে অতিরিক্ত ব্যয় হবে ১ কোটি টাকা। অথচ মন্ত্রণালয় প্রতি ল্যাব স্থাপনে ব্যয় করেছে ৩ কোটি টাকা।

৫. নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে রোগীদের চিকিৎসা ব্যয়বহুল বটে। কিন্তু অক্সিজেনসমেত সব ওষুধ, একাধিকবার রোগ নির্ণয় ও অগ্রগতি পরীক্ষা এবং একবার ব্যবহার করে সব সামগ্রী ফেলে দেওয়া (Disposable) সামগ্রীর খরচ বাবদ দৈনিক ২০ হাজার টাকা ব্যয় কতটুকু যুক্তিসংগত? করোনা ওয়ার্ডে সিট ভাড়া ছাড়া বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বিধি মোতাবেক চিকিৎসা ও রোগ নির্ণয় পরীক্ষায় গড়ে দৈনিক দুই হাজার টাকার অতিরিক্ত ব্যয়ের কোনো যুক্তিসংগত কারণ নেই। এক্ষেত্রে কয়টি জেলা হাসপাতালে কত শয্যার জন্য সেন্ট্রাল অক্সিজেন লাইনের সুবিধা করা হয়েছে তা প্রকাশ করা প্রয়োজন। উল্লেখ্য, গণস্বাস্থ্য নগর হাসপাতালে ১০টি আইসিইউসহ ২৫০টি শয্যার প্রতিটিতে সেন্ট্রাল অক্সিজেন লাইনের সুবিধা দেওয়া আছে। এতে প্রতি মাসে অক্সিজেন সরবরাহ বাবদ খরচ হয় মাসে তিন লাখ থেকে পাঁচ লাখ টাকা।

করোনা সংক্রমণ রোধে কার কী করণীয় :

প্রথমত, জরিমানা, লাঠিপেটা করে নয়, সব সংবাদপত্র, ইলেকট্রনিক মিডিয়া, স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী, ইমাম, পুরোহিত এবং রাজনৈতিক ও এনজিও কর্মীদের সক্রিয় সাহায্যে শতভাগ রিকশা, ভ্যানচালক, নৌকার মাঝি, ফুটপাতের দোকানদার, ক্রেতা-বিক্রেতা ও সব স্তরের জনসাধারণকে বাড়ির বাইরে চলাফেরার সময় সার্বক্ষণিকভাবে মাস্ক ব্যবহারে এবং সামাজিক দূরত্ব (Social Distance) নয়, চলাফেরায় শারীরিক দূরত্ব (Physical Distance) বজায় রাখায় অভ্যস্ত করাতে হবে। দ্বিতীয়ত, তিনফুট দূরত্ব বজায় রেখে চলাফেরা ও মসজিদে জামাতে অংশ নেওয়া যাবে। তৃতীয়ত, বেবিট্যাক্সিতে দুজন, রিকশায় একজন চড়তে পারে। রিকশাচালকের আয় বৃদ্ধির জন্য সরকারের প্রণোদনা প্রয়োজন হবে। চতুর্থত, সব গণপরিবহন চালু রাখতে হবে। তবে প্রত্যেক বাসস্টপে ছাত্র ও বয়স্কাউট রেখে নিশ্চিত করতে হবে সবাই মাস্ক পরছে এবং পরিবহনে অর্ধেক সিট খালি থাকছে। সব স্টপে পনেরো মিনিট পরপর বাস আসবে ও থামবে।

ঈদকেন্দ্রিক পরিস্থিতি মোকাবিলায় ঈদে পরিবার-পরিজনকে দেখার জন্য গ্রামের বাড়িতে যেতে হলে অবশ্যই করোনা টেস্ট করাতে হবে। টেস্ট নেগেটিভ হলে রিপোর্ট দেখিয়ে বাসে, ট্রেনে, লঞ্চে বাড়ি যাবে মানুষ। পজিটিভ হলে শহরে অবস্থান করে চিকিৎসা নিতে হবে। রোগ নিয়ে গ্রামে গেলে প্রিয়জন রোগাক্রান্ত হবেন এবং আপনিও চিকিৎসা সংকটে পড়বেন। সরকারের দায়িত্ব তিন শিফটে করোনা টেস্ট করার সুবিধা নিশ্চিত করা। লক্ষ্য হবে প্রতিদিন এক লাখ পরীক্ষা করা, বর্তমানে হচ্ছে দৈনিক মাত্র ৩৫,০০০ পরীক্ষা। বেসরকারি খাতে দুই হাজার টাকার বেশি চার্জ করা উচিত হবে না এবং সরকারি হাসপাতালে দুইশ টাকায়। এক্ষেত্রে গণস্বাস্থ্য উদ্ভাবিত অ্যান্টিবডি টেস্টের অনুমোদন হলে জনগণের সুবিধা বাড়বে।

লকডাউন শতভাগ কার্যকর করতে হলে সরকারের করণীয় :

১. লকডাউন শুরুর ৭ দিন আগে থেকে প্রত্যেক দরিদ্র পরিবারকে একমাসের রেশন বিনামূল্যে সেনা, ছাত্র, বয়স্কাউট ও রাজনৈতিক কর্মীদের সাহায্যে ঘওউ কার্ড দেখে প্রত্যেকের বাড়িতে পৌঁছানোর ব্যবস্থা নেওয়া। এক মাসের রেশন বাবদ ১৫ সের চাল, ৫ সের আটা, ৫ সের আলু,  ২ সের ডাল, ১ লিটার তেল, ৫০০ গ্রাম মরিচ, পেঁয়াজ, রসুন ও  লবণের প্যাকেট দিতে সর্বোচ্চ ব্যয় হবে পনেরশ টাকা মাত্র। অর্থাৎ ৪ কোটি দরিদ্র পরিবারের জন্য ব্যয় হবে মাসে ৬০০০ কোটি টাকা।

২. লকডাউন কালে চিকিৎসক, স্বাস্থ্যকর্মী, আইনশৃঙ্খলা ও মিডিয়া কর্মী ছাড়া অন্য কেউ ব্যক্তিগত গাড়ি ব্যবহার করতে পারবেন না। রোগীদের সব সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতাল-ক্লিনিকে আনা-নেওয়ার জন্য বিশেষ গণপরিবহন চালু করতে হবে।

৩. অনতিবিলম্বে দশ কোটি ডোজ স্পুটনিক-ভি ও সিনোভ্যাক কিনে জরুরি ভিত্তিতে সব জনগণকে টিকা দিতে হবে। টিকা মৃত্যুহার এবং রোগের তীব্রতা কমায়, ফলে চিকিৎসা ব্যয় কমে।

৪. দেশের ৮০ ভাগ প্রাপ্তবয়স্ককে দ্রুত টিকাকরণে সবাই মিলে প্রধানমন্ত্রীর সদিচ্ছাকে কাজে পরিণত করতে হবে। সবচেয়ে সুলভে প্রতি ডোজ ৮ ডলারে রাশিয়া থেকে দুই কোটি স্পুটনিক-ভি টিকা কিনলে চীন থেকে কেনা ভ্যাকসিনের তুলনায় বাংলাদেশের সাশ্রয় হবে ৩৪০ কোটি টাকা। অপরপক্ষে ইউরোপীয় ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কোম্পানি থেকে ২ কোটি ডোজ টিকা কিনলে সরকারের অতিরিক্ত ব্যয় হবে ১৫ হাজার ৯৮০ কোটি  টাকা।

৫. ট্রেন, লঞ্চ ও আন্তঃজেলা বাস চালু করা অত্যাবশ্যক। এতে দরিদ্র মানুষের যাতায়াতে সাশ্রয় হবে। তবে সব যাত্রীর করোনা নেগেটিভ রিপোর্ট প্রদর্শন বাধ্যতামূলক করতে হবে।

৬. করোনায় মৃত্যুহার কমাতে হলে সার্বক্ষণিক অক্সিজেন সরবরাহ নিশ্চিত করে প্রত্যেক জেলা হাসপাতালে ৫-১০ শয্যার সুসজ্জিত আইসিইউ চালু করতে হবে। এজন্য ন্যূনতম ১০ জন চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীর তিন সপ্তাহের বাস্তব প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা নিতে হবে। একইসঙ্গে ৪ কোটি টাকা ব্যয় করে অক্সিজেন উৎপাদন ও সরবরাহ প্ল্যান্ট চালুর ব্যবস্থা নিতে হবে। ৬৪ জেলা হাসপাতালে সার্বক্ষণিক অক্সিজেন সরবরাহ নিশ্চিত করতে সরকারের ব্যয় হবে ৩৮৪ কোটি টাকা মাত্র।

৭. বাংলাদেশ সরকারের উদ্বৃত্ত সঞ্চয় আছে ৪৬ বিলিয়ন ডলার। মাত্র ০.৫ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করে ট্রিপস চুক্তির স্থায়ী লাইসেন্স পদ্ধতির (Compulsory Licence) এর আওতায় আগামী ছয় মাসের মধ্যে বাংলাদেশে টিকা উৎপাদন ও বাজারজাত করা সম্ভব। এ জন্য প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা। টেকনোলজি ও রয়্যালটি প্রতি ডোজ করোনা ভ্যাকসিন উৎপাদন ও বাজারজাতকরণে খরচ পড়বে দুই ডলারের চেয়েও কম।

লেখক ট্রাস্টি, গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র