চট্টগ্রামকে বলা হয় বন্দরনগরী। বাণিজ্যিক রাজধানীও বলে থাকেন অনেকে। সাগর, সবুজ ও পাহাড় এই শহরকে দিয়েছে বিশেষত্ব। যদিও উন্নয়নের অজুহাতে পাহাড়ে পড়েছে কোদালের কোপ। দৃষ্টিসীমার সবুজও এসেছে কমে। সম্প্রতি চট্টগ্রাম শহরের সবুজ ধ্বংসের আরেকটি খবর সামনে এসেছে। সেটি সিআরবি চত্ত্বরে হাসপাতাল নির্মাণের উদ্যোগ। পরিবেশের ক্ষতি নিয়ে নতুন করে কিছু বলার নেই। চট্টগ্রাম শহরে পাহাড় কাটার জন্য পরিবেশ অধিদপ্তরের জরিমানা পরিশোধ করে বহুতল ভবন গড়ে উঠতে দেখা গেছে। সিআরবি এলাকাতেও যেকোনো অবকাঠামো গড়ে তুলতে হলে কয়েকশ প্রাচীন বৃক্ষ যে ধুলায় লুটাবে, তা সহজেই বোঝা যায়।
শতাধিক শতবর্ষী গাছ ও সবুজে ঘেরা চট্টগ্রাম নগরীর সিআরবি এলাকা। সেন্ট্রাল রেলওয়ে বিল্ডিং (সিআরবি) এলাকাটি চট্টগ্রাম শহরের মাঝখানে একখণ্ড প্রশান্তির জায়গা। এটিকে চট্টগ্রামের ফুসফুস বলে স্থানীয় লোকজন। ইট-কাঠ ও কারখানার ধোঁয়ার শহরে বিশুদ্ধ অক্সিজেনের জন্য এখানে লোকজন বেড়াতে আসেন। চট্টগ্রাম শহরের টাইগারপাস এলাকার এই গাছপালাঘেরা সবুজ শান্ত এলাকাটি নগরবাসীর পছন্দের জায়গা। এখানে রয়েছে বাংলাদেশ রেলওয়ের পূর্বাঞ্চলীয় মহাব্যবস্থাপকের কার্যালয়। লাল ইট-সুরকির ভবনটি বন্দর নগরীর প্রাচীন ভবনগুলোর একটি। শিরীষতলার প্রশস্ত মাঠ শহরের মানুষের মাটির কাছাকাছি যাওয়ার অন্যতম জায়গা। এই মাঠে পহেলা বৈশাখ, পহেলা ফাল্গুন উৎসব আয়োজন করা হয়। ২০১২ সালে ১০ কোটি টাকা ব্যয়ে সিআরবি এলাকাকে আরও সুন্দর ও আকর্ষণীয় করে তোলার একটি প্রকল্প হাতে নিয়েছিল চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (চউক)। সেই পরিকল্পনা এখনো আলোর মুখ দেখেনি।
জানা যায়, চট্টগ্রামের ঐতিহ্য সিআরবি এলাকায় রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশিপের (পিপিপি) ভিত্তিতে ৫০০ শয্যার বিশেষায়িত হাসপাতাল ও ১০০ আসনের মেডিকেল কলেজ স্থাপনের উদ্যোগ নিয়েছে। এই হাসপাতাল নির্মাণ বন্ধে সামাজিক ও পরিবেশবাদী অনেক সংগঠন প্রতিবাদ কর্মসূচি ও আন্দোলনের ডাক দিয়েছে। তবুও প্রকল্প বাস্তবায়নে অনড় রেল কর্তৃপক্ষ। রেলমন্ত্রী বলছেন, ‘সিআরবি রেলওয়ের জায়গা। রেলওয়ের জায়গায় রেলওয়ে যা করার করবে। এখানে তো কোনো সমস্যা দেখি না। ভালো উদ্যোগে বাধা আসবে। মুক্তিযুদ্ধের সময়ও একটি পক্ষ বিরোধিতা করেছিল; এখানেও তাই। পরিবেশ নষ্ট না করেই সিআরবিতে হাসপাতাল ও মেডিকেল কলেজ নির্মাণ করা হবে।’ চট্টগ্রামের সর্বস্তরের নাগরিকের আপত্তি উপেক্ষা করে সিআরবিতেই হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ অনড় থাকলে স্বাভাবিকভাবে প্রশ্ন জাগবে, শহরের কেন্দ্রস্থলে নামমাত্র মূল্যে ৬ একর জমি ইজারা দেওয়ার সঙ্গে কোনো মহলের স্বার্থ জড়িত কিনা?
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সিআরবি এলাকায় রেলের প্রায় ৬ একর জায়গার ওপর ৫০০ শয্যার এই বিশেষায়িত হাসপাতালটি নির্মাণ করা হবে। সেখানে রেলওয়ের হাসপাতাল (বক্ষব্যাধি) সংলগ্ন ও দক্ষিণ অংশে গড়ে তোলা হবে এই হাসপাতাল ও মেডিকেল কলেজ। এ অংশে রেলওয়ের কয়েকটি কোয়ার্টারও রয়েছে। এ বিশেষায়িত হাসপাতাল ও মেডিকেল কলেজ নির্মাণে গত বছর ১৮ মার্চ ইউনাইটেড গ্রুপের সঙ্গে রেলপথ মন্ত্রণালয় চুক্তি করেছে।
হাসপাতালের প্রয়োজন অস্বীকার করা যায় না। সিআরবি এলাকার সবুজ অংশ ধ্বংস করে হাসপাতাল তৈরি না করে অন্য জায়গা বেছে নেওয়া যেতে পারে। যেমন হালিশহরের দিকে প্রচুর খালি জায়গা রয়েছে, আগ্রাবাদ থেকে বন্দরের দিকেও খালি জায়গা রয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, চট্টগ্রাম শহরের অদূরে কুমিরায় রেলওয়ের একটি বক্ষব্যাধি হাসপাতাল পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে আছে। হাসপাতাল ও এর আশপাশে আছে প্রায় ১০ একর জমি। হাসপাতালের প্রকল্পটি সেখানেও বাস্তবায়ন করা যেতে পারে। হাসপাতাল হয়তো যেকোনো জায়গাতেই তৈরি করা যাবে দুই-চার বছরে। কিন্তু সিআরবি এলাকার যে সবুজ ও প্রাচীন বৃক্ষ আচ্ছাদিত অঞ্চলটি গড়ে উঠেছে শতবর্ষের অধিক সময় ধরে সেটি একবার ধ্বংস হয়ে গেলে আর গড়ে তোলা সম্ভব হবে না। তাই হাসপাতাল নির্মাণ করতে হবে তবে সেটি সবুজ ও প্রকৃতি ধ্বংস করে নয়।