কর্তৃত্ববাদীদের অস্ত্র পেগাসাস

পৃথিবীতে কয়েক বিলিয়ন মানুষ আছেন যাদের ফোন ছাড়া একটা মুহূর্ত কাটে না। মার্কেট ও মিডিয়ার এই সময়ে স্মার্টফোন হয়ে উঠেছে যোগাযোগ ও দাপ্তরিক অনেক কাজের প্রধান অনুষঙ্গ। অথচ সাধারণ মানুষের পক্ষে জানাই সম্ভব নয় যে, তার ব্যবহৃত স্মার্টফোনটিই হয়তো একটি নজরদারির যন্ত্র হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। কয়েক হাজার মাইল দূরের কেউ হয়তো অন্যের ফোনের ক্ষুদেবার্তা, ছবি, ঠিকানা তো রেকর্ড করছেই, পাশাপাশি ফোনের ব্যবহারকারীর অলক্ষ্যে স্মার্টফোনের মাইক্রোফোন অন করে দিয়ে রিয়েল টাইমের কথা শুনছে।

ঠিক এসব সুবিধাই দিচ্ছে পেগাসাস। ইসরায়েলি এনএসও গ্রুপ নামের একটি প্রতিষ্ঠান এই স্পাইওয়্যার বিক্রি করছে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সরকারগুলোর কাছে। অনেকে ব্যক্তিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়েও কিনছে, যে তালিকা পাওয়া সম্ভব নয়। তবে এনএসও বলছে, তারা শুধু সরকারি গোয়েন্দা সংস্থা ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর কাছেই বিক্রি করছে স্পাইওয়্যারটি। এ ব্যাপারে বিশ্লেষকরা বলছেন, এনএসও কাদের কাছে পেগাসাস বিক্রি করেছে বা করছে তা ওই প্রতিষ্ঠানটি ছাড়া অন্য কারও কাছে রেকর্ড নেই। আর যে সরকারগুলো পেগাসাস কিনছে, তারা তাদের দেশের ভিন্ন মত ও রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের ফোন হ্যাক করার কাজে ব্যবহার করছে। প্রয়োজন অনুসারে হ্যাক করা সেই তথ্য আবার ব্যবহারও করা হচ্ছে, যা মানবাধিকার লঙ্ঘনের শামিল।

দ্য গার্ডিয়ানের মতে, পেগাসাসের মাধ্যমে বিশ্বে সবচেয়ে বেশি টার্গেটের শিকার হচ্ছেন সাংবাদিকরা। আগামী সপ্তাহে সংবাদমাধ্যমটি বিশ্বের উল্লেখযোগ্য আইনজীবী, মানবাধিকার কর্মী, ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব, শিক্ষক, ব্যবসায়ী, কূটনীতিক, সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ছাড়াও রাষ্ট্রের প্রধানদের নাম প্রকাশ করবে, যাদের ফোন ইতিমধ্যেই হ্যাক হয়েছে পেগাসাসের মাধ্যমে। গার্ডিয়ানের মতে, তারা জনগুরুত্ব বিবেচনায় ফাঁস হওয়া তথ্যগুলো প্রকাশ করছে। কারণ, সংবাদমাধ্যমটি মনে করে বিশ্ববাসী এই স্পাইওয়্যার সম্পর্কে জানান অধিকার রাখেন। পেগাসাস প্রকল্পে ফ্রান্সের একটি মুনাফাহীন সংস্থা, গার্ডিয়ান ও অন্য ১৬টি সংবাদমাধ্যম কাজ করেছে। এই প্রকল্পের মাধ্যমেই মূলত স্পাইওয়্যার কেলেঙ্কারির বিষয়টি গত রবিবার প্রকাশ করা হয়।বলা হচ্ছে, বিশেষ নম্বরগুলোকে নজরদারির আওতায় সরকারই আনছে নাকি এনএসওর স্পাইওয়্যার নিজেই কাজটি করে তা পরীক্ষা করে দেখার প্রয়োজন রয়েছে। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের সাইবার সিকিউরিটি ল্যাবের গবেষকরা বলছেন, তারা বেশ কয়েকটি আইফোন টার্গেট করেন যেগুলো হ্যাক করা হয়েছে। পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, হ্যাকের ঘটনায় সরকারের সঙ্গে সঙ্গে স্পাইওয়্যারটি নিজেও নজরদারি করে। অর্থাৎ এই পুরো ঘটনার পেছনে আছে ইসরায়েল। বিশ্বের কর্র্তৃত্ববাদী সরকারগুলোর কাছে এই স্পাইওয়্যার তুলে দিয়ে ইসরায়েল নিজে গড়ে তুলছে নজরদারি থেকে পাওয়া বিশাল তথ্যভাণ্ডার।

অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের সাইবার সিকিউরিটি ল্যাব পরিচালনাকারী ক্লডিও গুয়ারনিয়েরির বরাত দিয়ে গার্ডিয়ান জানায়, যদি কোনো স্মার্টফোনে পেগাসাস সফটওয়্যারটি প্রবেশ করানো যায়, তবে এনএসওর গ্রাহক পুরো ফোনটির দখল পেয়ে যান। সম্প্রতি ফাঁস হওয়া ডাটাবেজে ৫০ হাজারের বেশি ফোন নম্বর পাওয়া গেছে। ২০১৬ সাল থেকে ইসরায়েল কর্র্তৃত্ববাদী সরকারগুলোকে এ সেবা দিয়ে আসছে। প্রথম খবরে আসে পেগাসাস ২০১৯ সালের অক্টোবরে। ফেইসবুক মালিকানাধীন সংস্থা হোয়াটসঅ্যাপ জানায়, চারটি মহাদেশের প্রায় ১৪০০ জনের মোবাইল পেগাসাসের মাধ্যমে হ্যাক করা হয়।