ড্রাইভার বলেছিল, সাইমন একটা জ্বিন

সাইমন ড্রিং ১৯৯৯ সালে যখন একুশে টেলিভিশনের মহাব্যবস্থাপকের দায়িত্ব নিয়েছিলেন, তখন তিনি ৫৪ বছর বয়সের একজন আইডিয়াবাজ স্বপ্নবাজ কর্মমুখর উদ্যোগী মানুষ। বাংলাদেশের টেলিভিশন সাংবাদিকতার জগতে একটা নতুন দিগন্ত খুলে দেওয়ার সূচনা করতে এসে উৎসাহে উত্তেজনায় সারাক্ষণই টগবগ করে ফুটতেন তিনি। তার সেই উদ্যমী কিন্তু শান্ত কর্মস্পৃহা তিনি সঞ্চারিত করতে চাইতেন একুশে টেলিভিশনের প্রতিটি কর্মীর মধ্যে।

একুশের নিউজ রুমে সাংবাদিক নির্বাচন করা হয়েছিল বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় দীর্ঘদিন কাজ করা বাঘা বাঘা সাংবাদিকের মধ্য থেকে। মোস্তফা ফিরোজ, আমিনুর রশিদ, হাসনাইন খোরশেদ, জ ই মামুন, মুন্নী সাহা, সুপন রায়, শামসুদ্দিন হায়দার ডালিম, তুষার আবদুল্লাহ, কাওসার মাহমুদ, শাকিল আহমেদ, পার্থ তানভির নভেদ, বাদল মুস্তাফিজ, জহুরা মোর্শেদা আর আমি ছিলাম রিপোর্টিং টিমে। এডিটোরিয়াল বিভাগে ছিলেন নিয়াজ মোরশেদ, সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা, আহমেদ জোবায়ের, ইব্রাহিম আজাদ, রুমি নোমান ও ভানু রঞ্জন চক্রবর্তী। সামিয়া জামান ও সামিয়া রহমান শুরু থেকেই ছিলেন সংবাদ উপস্থাপক হিসেবে। গাজীপুরের উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ে টানা দুই মাসের একটা ট্রেনিং হয়েছিল আমাদের। বিবিসির ট্রেইনার বেন কোহেন, রাসেল ট্রট এবং রাসেল গুডপিস বলে তিনজন খ্যাতনামা ব্রিটিশ সাংবাদিকের তত্ত্বাবধানে হাতে-কলমে কাজ শেখানো হয়েছিল আমাদের।

সাইমন ড্রিং ছিলেন আমাদের দলনেতা। অনতিকাল পরেই যোগ দিলেন মিশুক মুনীর ও মনজুরুল আহসান বুলবুল। তবে শুধু নিউজ রুমে আমাদের কয়েকজনকে নিয়েই তো আর একুশে টেলিভিশন নয়। সংবাদের পাশাপাশি ছিল অনুষ্ঠান বিভাগ। ক্যামেরা বিভাগ। ভিডিও এডিটিং বিভাগ। ব্রডকাস্ট বিভাগ। অ্যাডমিন। অ্যাকাউন্টস। মার্কেটিং। সব মিলিয়ে প্রায় তিন-চারশ মানুষের বিশাল কর্মযজ্ঞ। আর সেই টিমেরই একজন দৃঢ় চরিত্র শক্তিশালী নেতা ছিলেন কিংবদন্তি সাংবাদিক সাইমন ড্রিং।

দীর্ঘদেহী প্রায় ছয় ফুট লম্বা, মাথায় পাতলা হয়ে আসা সাদা চুল, মেদহীন শরীরের শ্বেতকায় মানুষটি হাঁটতেন একটু সামনের দিকে ঝুঁকে। খুব সকালে অন্যরা এসে পৌঁছানোর আগেই প্রতিদিন কারওয়ান বাজারে জাহাঙ্গীর টাওয়ারের অফিসে এসে ঢুকতেন তিনি। জেনারেটর অপারেটর, লিফটম্যান, সিকিউরিটির সদস্য, পিয়ন, স্টোরের কর্মচারী প্রত্যেককে নাম ধরে চিনতেন তিনি। হাসিমুখে তাদের সঙ্গে কুশলবিনিময় করে পাঁচতলায় নিজের রুমে গিয়ে বসতেন সাইমন ড্রিং। ফিরতেন সবার পরে গভীর রাতে। তার গাড়ি চালাতেন ড্রাইভার বাশার। তিনি পরে হাসতে হাসতে একদিন বলেছিলেন, ‘আপা সাইমন একটা জি¦ন। জি¦ন না হইলে কেউ এত কাজ করতে পারে?’

সাততলায় আমাদের নিউজ রুমের প্রতিটি কোনায় তার ছিল অবাধ বিচরণ। সবার সব কাজের দিকেই তার ছিল সুষম নজর। নিজেকে উজাড় করে আমাদের টিভি সাংবাদিকতার পাঠ দিয়েছেন তিনি। হয়ে উঠেছেন সবার গুরু।

পিস টু ক্যামেরা মানে যেটাকে আমরা পিটিসি বলি অর্থাৎ রিপোর্ট শেষে যেখানে সাংবাদিক এসে ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়ে দু-একটি বাক্যে শেষ উপসংহারটি টানেন, তারপর নিজের নাম, চ্যানেলের পরিচয় ও স্থানের নামটি জানান। সেই পিটিসি নিয়ে খুব খুঁতখুঁতে ছিলেন সাইমন। কীভাবে প্রতিটি শব্দ ডেলিভারি দিতে হবে, কেমন করে ক্যামেরার দিকে তাকাতে হবে, কী ধরনের রঙের পোশাক পরতে হবে সেসব নিয়ে সবাইকেই পরামর্শ দিতেন তিনি।

আমি বরাবরই নিজের সাজ-পোশাক নিয়ে একটু উদাসীন ছিলাম। ফলে প্রায়ই সাইমন ড্রিং এসব বিষয়ে সচেতন হতে আমাকে উপদেশ দিতেন। ভুল ধরিয়ে দিতেন। একদিন তার রুমে ডাকলেন, সুন্দর করে বুঝিয়ে বললেন, ক্যামেরার সামনে পরিপাটি করে নিজেকে উপস্থাপনের প্রয়োজনীয়তা। আমি তর্ক করার ভঙ্গিতে বললাম, বাংলাদেশের মানুষ নিউজ রিপোর্টারকে সহজ সরল নিজের মানুষ ভাবতে পছন্দ করে। সুতরাং বাইরের দিকে কেমন লাগল তা হয়তো ততটা গুরুত্বপূর্ণ নয়। সাইমন ড্রিং হেসে বললেন, টেলিভিশনে তো তোমার বাইরেরটাই দেখা যায়। ভেতরে তুমি তোমার মতোই থাকো, কে মানা করেছে?

তার কথায় এসব বিষয়ে আমি সচেতন হলাম। তবু মাঝে মাঝে সাইমনের ফোন পেতাম, ‘শাহ্নাজ আজকে পিটিসিতে তোমার চুল এলোমেলো ছিল।’

‘শাহ্নাজ, আজ যে রঙের জামা পরেছিলে সেটি ক্যামেরায় ভালো দেখায়নি। তুমি কি নোটিস করেছো?’

তিনি বলতেন, ‘পিটিসিতে কথা বলবে হৃদয় থেকে, ক্যামেরার দিকে তাকাবে ভালোবাসার দৃষ্টিতে, তখন ক্যামেরাও তোমাকে ভালোবাসবে।’

সাইমন ড্রিং-এর আরও কত টুকরো টুকরো কথা মনে পড়ে। প্রতিদিনই নিউজ রুমে এসে প্রত্যেকের কাছেই জানতে চাইতেন, ‘আজকে তুমি সারা দিন কী কাজ করলে?’

সবার কথাই শুনতেন ধৈর্য ধরে। ফলে আমরা প্রত্যেকেই ভাবতাম তিনি আমাকে গুরুত্ব দিচ্ছেন, আমাকে ভালোবাসেন। তিনি নিজে পরিশ্রমী অনুসন্ধানী পেশাদার সাংবাদিক ছিলেন, তার সেই কাজের ধারা তিনি একুশের প্রতিটি সাংবাদিকের মধ্যে প্রবাহিত করতে চাইতেন। সংবাদ নিয়ে নিত্যনতুন পরিকল্পনা ছিল তার। প্রতিদিনের খবর তো ছিলই পাশাপাশি এমন সব বিষয় নিয়ে নিউজ করতে বলতেন যা সচরাচর করা হতো না। একবার সাইমনের পরিকল্পনায় মানিকগঞ্জের একজন সাধারণ প্রবীণ হজযাত্রীকে ফলো করেছিলাম। তার আত্মীয় পরিজনদের প্রতিক্রিয়া, জড়িয়ে ধরে কেঁদে কেটে বিদায় জানানো থেকে শুরু করে এয়ারপোর্টের আনুষ্ঠানিকতা শেষে বিমানে চড়া পর্যন্ত একটা মানবিক রিপোর্ট। সাইমন খুব পছন্দ করেছিল রিপোর্টটা। একুশে টিভিতে প্রথমবার খুব ভালো ইনক্রিমেন্ট হয়েছিল আমাদের, সাইমনকে ধন্যবাদ জানালাম। তিনি হেসে বললেন, ‘ধন্যবাদ জানানোর কিছু নেই। ইউ ডিজার্ভ ইট।’

মনে পড়ে সেই সময় ২০০১ সালে সাইমনের স্ত্রী ফিওনাও এসেছিলেন বাংলাদেশে, একুশে টেলিভিশনের নিউজ রুমে। হয়তো স্বামীর ভালোবাসার জায়গাটিকে বুঝতে, দেখতে, জানতে। ভিনদেশি সাংবাদিক হিসেবে যে বাংলাদেশের জন্মের ইতিহাসের সঙ্গে সাইমন ড্রিং জড়িয়ে ছিলেন সেই বাংলাদেশকে অন্তর দিয়ে ভালোবেসেছিলেন তিনি। ফেইসবুকে তার কভার ফটোটিও ছিল বাংলাদেশের নদী আর অবারিত সবুজ ধানক্ষেতের। সুযোগ পেলেই ঢাকার বাইরে যেতেন সাইমন। এ দেশের গ্রাম, প্রকৃতি ভালোবাসতেন। গ্রামে একটা মাটির ঘর তৈরি করে সপ্তাহান্তেসেখানে থাকবেন এমন কথাও তিনি বলেছেন ঘনিষ্ঠজনদের।

সাইমন ড্রিং-এর সঙ্গে সবশেষ দেখা হয়, ২০১২ সালের ১১ জানুয়ারি। প্রয়াত মেয়র আনিসুল হকের বাসায় আয়োজিত একটা গেট-টুগেদার অনুষ্ঠানে। সেই দিনটা ছিল সাইমন ড্রিং-এর জন্মদিন। আরেকটি টেলিভিশন চ্যানেলের দায়িত্ব নিয়ে তার দ্বিতীয়বার বাংলাদেশে ফিরে আসাটা ছিল উপলক্ষ। একুশে টেলিভিশনের পুরনো সব সাংবাদিক, কলাকুশলী, কর্মকর্তা, কর্মচারীর অনেকেই এসেছিলেন সেদিন। সাইমন খুবই আন্তরিকভাবে সবার খোঁজখবর নিয়েছিলেন সেই পুরনো দিনের মতোই। তাকে খুব আনন্দিত দেখাচ্ছিল। যখন আনিসুল হক বলছিলেন, এক যুগ আগে সাইমন ড্রিং-এর হাতে তৈরি হওয়া সেই একঝাঁক পেশাদার সাংবাদিক এখন কীভাবে ছড়িয়ে পড়ছে বাংলাদেশের বিভিন্ন ইলেকট্রনিক মিডিয়ায়। কাজ করছে। নেতৃত্ব দিচ্ছে। সাইমন ড্রিংকে খুব উজ্জ্বল দেখাচ্ছিল সেই সন্ধ্যায়। তাকে নিয়ে একটা ছোট্ট বুকলেটও প্রকাশিত হয়েছিল সেই দিনে। ‘ফ্রেন্ডস অব সাইমন’ শিরোনামের সেই ছোট্ট প্রকাশনায় আমরা সবাই ছোট্ট ছোট্ট কমেন্ট লিখেছিলাম। আমার লেখাটা ছিল এ রকম।

It was my great opportunity that once I had the chance to work with Simon Dring in Ekushey Television. I will ever remember the affection and generosity he showed to me during my association with him as his junior colleague. I learnt a lot of things from him, which helped me to come to the present position. I wish him a long, happy and healthy life.

Shahnaz Munni

Chief reporter, ATN Bangla

আমি বিশ্বাস করি একুশে টেলিভিশনের প্রতিটি সাংবাদিকের কাছেই তিনি ছিলেন একজন মহান শিক্ষক। সাইমন ড্রিং-এর দেখানো পথ ধরেই এগিয়ে চলছে এ দেশের সম্প্রচার সাংবাদিকতা। মাত্র ৭৬ বছর বয়সে তার মতো একজন সৃষ্টিশীল মানুষের চলে যাওয়া মেনে নেওয়া যায় না। তবুও প্রকৃতির নিয়মকে আমরা অস্বীকার করতে পারি না। সাইমন ড্রিং যেখানেই থাকুন ভালো থাকুন। বাংলাদেশের অস্তিত্বের সঙ্গে মিশে আছেন আপনি। অনন্ত যাত্রায় আপনার আত্মার শান্তি কামনা করি।

লেখক : সাংবাদিক ও সাহিত্যিক