চামড়া শিল্পে ব্যবস্থাপনা সংকট

প্রায়ই গৌরবের সঙ্গে বলা হয়ে থাকে, চামড়া বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম রপ্তানি খাত। কিন্তু বাস্তবে রপ্তানি আয়ের বিবেচনাতে বিগত এক দশকেও এই খাতে দৃশ্যমান কোনো উন্নতি নেই। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো বা ইপিবির তথ্যানুযায়ী করোনা মহামারীর আগে বিগত ২০১৮-১৯ অর্থবছরেও বাংলাদেশের চামড়ার প্রায় ১৬ শতাংশ বাজার পতন হয়েছে। আর ২০১৩-১৪ সাল থেকে এ খাতের আয় ১ দশমিক শূন্য ৮ থেকে ১ দশমিক ২৩ বিলিয়ন ডলারের মধ্যেই ওঠানামা করেছে। চামড়া শিল্পের অচলাবস্থা কাটাতে বাংলাদেশে ২০১৬-১৭ সালকে চামড়াবর্ষ হিসেবে সরকারিভাবে ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু এক্ষেত্রেও নানা সিদ্ধান্তহীনতা, ব্যবস্থাপনার সংকট ও দুর্নীতির কারণে কাক্সিক্ষত কোনো ফল আসেনি। এই পরিস্থিতির মধ্যেই করোনা মহামারীর কারণে গত বছর আর এ বছরের কোরবানি ঈদেও কাঁচা চামড়া সংগ্রহ ও প্রক্রিয়াজাতকরণে সংকট তৈরি হয়েছে। অবশ্য, এ বছর দেশব্যাপী করোনা ও বন্যার কারণে চামড়া সরবরাহ কিছুটা কম হলেও চামড়ার সংকট হবে না বলেই মনে করছেন ট্যানারি মালিকরা। তবে কাঁচা চামড়া নিয়ে শঙ্কা দেখা দিয়েছে ট্যানারিপল্লী থেকে শুরু করে আড়ত সব জয়গাতেই। মূলত লকডাউনের কারণে শ্রমিক সংকট ও মেঘলা আবহাওয়ার কারণে চামড়া পচে যাওয়ার ঝুঁকি দেখা দিয়েছে। মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের তথ্যানুযায়ী এবার সারা দেশে মোট ৯০ লাখ ৯৩ হাজার ২৪২টি গবাদিপশু কোরবানি হয়েছে। গত কয়েক বছর ধরে একটি অভিযোগ রয়েছে যে, সরকার ট্যানারি মালিকসহ বড় ব্যবসায়ীদের স্বার্থরক্ষা করে চামড়ার দাম নির্ধারণ করছে। ফলে কাঁচা চামড়ার যথাযথ দাম পাচ্ছে না মৌসুমি ব্যবসায়ী এবং আড়তদাররা। গত বছরও দেখা গেছে দাম না পাওয়ায় কেউ চামড়া পানিতে ফেলে দিয়েছে, কেউ মাটিতে পুঁতে ফেলেছে। কিন্তু এ বছর সে রকম ঘটনা কম বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে, এবার গরুর চামড়ার দাম পেলেও ছাগলের চামড়ার দাম নিয়ে মিশ্র বক্তব্য শোনা যাচ্ছে। কিছু এলাকার মানুষ ছাগলের চামড়ার দাম পায়নি। কিন্তু সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আসলে ছাগলের চামড়া সঠিকভাবে ছাড়াতে না পারার কারণে দাম কমে যায়। উত্তরবঙ্গে ভালোভাবে ছাগলের চামড়া ছাড়ানো হয় বলে সেখানে দাম ঠিকই আছে বলে দাবি তাদের।

আসলে কাঁচা চামড়ার দাম নির্ধারণ এবং চামড়া সংগ্রহ ও প্রক্রিয়াজাতকরণের বিষয়টি দেশে এখনো সনাতন পদ্ধতিতেই রয়ে যাওয়ায় এসব সংকটের সমাধান হচ্ছে না বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। অর্থনীতিবিদ ও শিল্প খাত বিশ্লেষকরা বলছেন, দেশে চামড়ার কী পরিমাণ চাহিদা ও মজুদ রয়েছে এবং আগামী দিনে চাহিদা বৃদ্ধির কতটুকু সম্ভাবনা রয়েছে, তার ওপর ভিত্তি করে কাঁচা চামড়া কেনাকাটা হয়। তাই কোরবানির আগে এসব বিষয়ে ক্রেতা ও বিক্রেতাকে পরিষ্কার ধারণা না দেওয়ার কারণেই বছর বছর কাঁচা চামড়ার দামে বিপর্যয় হচ্ছে। এজন্য চামড়ার মূল ব্যবহারকারী হিসেবে ট্যানারি মালিকদের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির অভাব যেমন দায়ী তেমনি চামড়ার সরবরাহ ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ নিয়ন্ত্রক আড়তদাররাও দায়ী বলে মনে করেন তারা। কোরবানির ঈদের চামড়া কেনাবেচা ও ব্যবস্থাপনায় বাণিজ্য মন্ত্রণালয় আরও দায়িত্বশীল হতে পারে। সারা বছর দেশের কারখানাগুলোতে কত বর্গফুট চামড়া প্রয়োজন, তার মধ্যে কোরবানির সময় কতটুকু চামড়া মিলবে এবং কত চামড়া মজুদ আছে, এমন পরিসংখ্যান জানতে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় উদ্যোগী হতে পারে। চাহিদা ও জোগানের এই তথ্য জানার পর যদি মন্ত্রণালয় চামড়ার দাম নির্ধারণ করত এবং ট্যানারি মালিক-আড়তদার-মৌসুমি ব্যবসায়ী সব পক্ষকে আগেই সেসব জানিয়ে দিত তাহলে পরিস্থিতির আরও উন্নতি হতো। এছাড়া চামড়া মাপার পরিষ্কার বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি নির্ধারণ করে দেওয়া প্রয়োজন যাতে সারা দেশে সেই চর্চা ছড়িয়ে পড়ে এবং ব্যবসায়ী ও আড়তদারদের বিরোধের সুযোগ না থাকে।

কাঁচা চামড়ার কেনাবেচায় আরেকটি বড় সমস্যা হচ্ছে এখানে বাকিতে প্রচুর লেনদেন হয়। এতে করে বিস্তর সমস্যাও হচ্ছে। ট্যানারি মালিকদের বিরুদ্ধে আড়তদারদের অভিযোগ তারা আগের বকেয়া পরিশোধ করেননি। অন্যদিকে ট্যানারি মালিকরা বলেন, ব্যাংক তাদের ঋণ দিচ্ছে না। আর কাঁচা চামড়া আড়তদার ও ব্যবসায়ীদের অভিযোগ ব্যাংকগুলো ট্যানারি মালিকদের ঋণ দেয় তাদের ঋণ দেয় না। তাই এ পর্যায়ের কেনাবেচায় স্বচ্ছতা আনা দরকার। আরেকটি বড় সমস্যা হলো কাঁচা চামড়ার বাজারটি পুরোপুরি দেশীয়। ফলে আড়তদার, ট্যানারি মালিক, জুতা ও চামড়া পণ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো মিলে এই পরিস্থিতির সুযোগের অপব্যবহার করে চলেছেন। তাই চামড়ার বাজার উন্মুক্ত করা দরকার। চলতি বছর ওয়েট ব্লু চামড়া রপ্তানির জন্য পাঁচটি কোম্পানিকে অনুমতি দিয়েছে সরকার। তারা এক কোটি বর্গফুট চামড়া রপ্তানি করতে পারবে। এ উদ্যোগ ইতিবাচক। এটা অব্যাহত রাখা দরকার। আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে ভারসাম্য রক্ষার পাশাপাশি চামড়াপণ্যে মূল্য সংযোজনের ওপর জোর দিতে হবে এবং রপ্তানির নতুন বাজার অনুসন্ধান করতে হবে। সর্বোপরি চামড়াশিল্পে যথাযথ ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠা করতে হবে।