বর্তমান সময়ে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে সমাজে অহরহ ফেতনা-ফ্যাসাদ ও বিশৃঙ্খলা সংঘটিত হচ্ছে। প্রায়ই দেখা যায়, এসব ফেতনার সূত্র হচ্ছে অপ্রয়োজনীয় কথা ও উদ্দেশ্যহীন কাজ। অথচ পবিত্র কোরআন-হাদিসে সব ধরনের ফেতনা থেকে বেঁচে থাকতে বলা হয়েছে। মুমিন-মুসলমানের উদ্দেশ্যে অত্যন্ত সুস্পষ্টভাবে বারবার বলা হয়েছে, ফেতনার সময় কী করতে হবে, কীভাবে চলতে হবে। যেকোনো কঠিন পরিস্থিতিতে ফেতনা থেকে বিরত থাকার নির্দেশনা দিয়েছে ইসলাম। ফেতনার ভয়াবহতা প্রসঙ্গে আল্লাহতায়ালা কোরআনে কারিমে ইরশাদ করেন, ‘বস্তুত ফেতনা-ফ্যাসাদ কিংবা দাঙ্গা-হাঙ্গামা সৃষ্টি করা হত্যার চেয়েও কঠিন অপরাধ।’ সুরা বাকারা : ১৯১
মুমিন-মুসলমানের উচিত, যাবতীয় ফেতনা থেকে দূরে থাকার পাশাপাশি ফেতনা সৃষ্টি হয় এমনসব বিষয় ও কাজ থেকে বিরত থাকা; অন্যদেরও ফেতনা মুক্ত রাখা। কাউকে ফেতনার কাজে সহযোগিতা না করা। আর এটাই হলো ইমানের জন্য নিরাপদ কাজ। ফেতনা সৃষ্টি শয়তানের কাজ। ফেতনার সময় মুমিনদের করণীয় সম্পর্কে হাদিসের সুস্পষ্ট বাণী রয়েছে। ওইসব হাদিসের ওপর আমল করলে যাবতীয় ফেতনা থেকে বেঁচে থাকা সম্ভব হবে ইনশাআল্লাহ।
আলেমরা বলেছেন, চুপ থাকা ব্যক্তিকে কোনো ধরনের ফেতনা কখনো স্পর্শ করতে পারে না। সেই সঙ্গে ফেতনা সৃষ্টিকারী ঘটনা ও বিষয়ের দিকে দৃষ্টি না দেওয়া, এমনকি উঁকিও না মারা। এ প্রসঙ্গে হাদিসে ইরশাদ হয়েছে, হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি ফেতনার দিকে তাকাবে ফেতনা তাকে ঘিরে ধরবে। তখন কেউ যদি কোনো আশ্রয়ের জায়গা কিংবা নিরাপদ জায়গা পায়, তাহলে সে যেন আত্মরক্ষা করে।’ সহিহ বোখারি : ৭০৮১
ফেতনার সময় নিজেকে গুটিয়ে রাখা, প্রয়োজন ছাড়া ঘর-বাড়ি থেকে বের না হওয়া। এ বিষয়ে হাদিসে হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘অচিরেই এমন ফেতনার আত্মপ্রকাশ হবে, যা (ওই সময়ে) বসে থাকা ব্যক্তি দাঁড়িয়ে থাকা ব্যক্তি থেকে উত্তম থাকবে। আর দাঁড়িয়ে থাকা ব্যক্তি তখন চলমান ব্যক্তি থেকে উত্তম থাকবে। আর চলমান ব্যক্তি তখন দ্রুতগামী ব্যক্তি থেকে ভালো থাকবে।’ সহিহ্ মুসলিম : ৭১৩৯
ফেতনার সময় সৎ কাজ আঁকড়ে ধরা এবং অসৎ কাজ পরিহার করে চলা। সেই সঙ্গে আল্লাহভীরু মুত্তাকিদের সঙ্গে চলাফেরা করা, ফেতনা সৃষ্টিকারীদের সঙ্গ ত্যাগ করা। এ প্রসঙ্গে হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘যখন ফেতনা তীব্র আকার ধারণ করবে, তখন তোমরা সৎ কাজকে মজবুতভাবে আঁকড়ে ধরবে এবং অসৎ কাজ থেকে বিরত থাকবে। তোমাদের মধ্যে বিশেষ লোক (সৎ ও চরিত্রবান) যারা রয়েছে তাদের প্রতি মনোনিবেশ করবে এবং সর্বসাধারণকে (যারা ফেতনার সঙ্গে জড়িত) এড়িয়ে চলবে।’ আল ফিতান : ৭২১
এই উম্মতের একটি ফেতনা হচ্ছে, ধন-সম্পদের ফেতনা। যা আল্লাহতায়ালার স্মরণ ও আনুগত্য থেকে মানুষকে উদাসীন করে রাখে, এটা পরিহার করা। ইসলাম কাউকে ধন-সম্পদ উপার্জন থেকে নিষেধ করে না। তবে সম্পদ যেন মানুষকে মহান আল্লাহর ইবাদত-বন্দেগি থেকে দূরে না রাখে সে বিষয়ে সজাগ ও সতর্ক থাকার কথা বলে। হাদিসে ইরশাদ হয়েছে, হজরত কাব ইবনু ইয়াজ (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) কে বলতে শুনেছি, ‘প্রত্যেক উম্মতের জন্য কোনো না কোনো ফেতনা রয়েছে। আর আমার উম্মতের ফেতনা হলো ধন-সম্পদ।’ তিরমিজি : ২৩৩৬
ইসলামি স্কলাররা বলেছেন, ফেতনা থেকে বাঁচতে জ্ঞানার্জনের কোনো বিকল্প নেই। যারা ফেতনা সম্পর্কে অবগতি লাভ করবে তারা ধ্বংস (ফেতনায় জড়াবে না) হবে না। ফেতনার জামানায় গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে কোরআন-সুন্নাহ আঁকড়ে ধরা। এ বিষয়ে হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘নিশ্চয় আমি তোমাদের মধ্যে এমন বস্তু ছেড়ে যাচ্ছি তোমরা যদি তা আঁকড়ে ধরে থাকো তবে কখনই পথভ্রষ্ট হবে না। আর তা হলো আল্লাহর কিতাব (কোরআন) ও তার নবীর সুন্নত (হাদিস)।’ তারগিব ওয়াত তারহিব : ৪০
ফেতনা শুধু ভয়ের বিষয় নয়, এ সময়টি মানুষের জান্নাতি হওয়ার সময়। অর্থাৎ সময়টি কাজে লাগিয়ে ইবাদত-বন্দেগি করে আল্লাহর সাহায্যে নিরাপদে থাকা। এ বিষয়ে হাদিসে ইরশাদ হয়েছে, হজরত উকবা ইবনু আমির (রা.) বলেন, একদা আমি হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সঙ্গে সাক্ষাৎ করলাম এবং বললাম, নাজাতের উপায় কী? তিনি বললেন, ‘নিজের জিহ্বা আয়ত্তে রাখো, নিজের ঘরে পড়ে থাকো (ইবাদতে মনোনিবেশ করো) এবং নিজের পাপের জন্য রোদন (তওবা-ইস্তেগফার) করো।’ মিশকাত : ৪৮৩৭
এই হাদিসে ব্যাখ্যায় আলেমরা বলেছেন, জিহ্বার হেফাজত (অনর্থক কথা না বলা, মিথ্যা না বলা ইত্যাদি) অনেক বড় সওয়াবের কাজ। হাদিসে হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি চুপ থাকে, সে মুক্তি পায়।’ সহিহ্ বোখারি : ৭৮৫৪
বর্ণিত হাদিস দ্বারা সহজেই অনুমান করা যায়, জিহ্বার নিয়ন্ত্রণ কতটা গুরুত্বপূর্ণ। জিহ্বার অসংযত ব্যবহারের কারণে স্বামী-স্ত্রী, মানুষে-মানুষে, পরিবারে, সমাজে, রাষ্ট্রে অশান্তি বিরাজমান। এ জন্যই আল্লাহর রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি আমাকে তার দুই চোয়ালের মধ্যবর্তী জিনিসের (জিহ্বা) এবং দুই পায়ের মধ্যবর্তী জিনিসের (লজ্জাস্থান) নিশ্চয়তা দিতে পারবে, আমি তার জন্য বেহেশতের জামিনদার হতে পারি।’ সহিহ্ বোখারি : ৭৮৮৪