করোনা মহামারী শুরুর দেড় বছরের মধ্যে বর্তমানে সবচেয়ে ‘বিপর্যয়কর’ পরিস্থিতি পার করছে দেশ। ভাইরাসটির বিস্তার ঠেকাতে দেশজুড়ে ‘কঠোর বিধিনিষেধ’ চালু রাখলেও সংক্রমণ-মৃত্যু কোনোটিই কমছে না। এরই মধ্যে দেশে করোনায় একদিনে সর্বোচ্চ মৃত্যু ও রোগী শনাক্তে নতুন রেকর্ড হয়েছে। গত রবিবার সকাল ৮টা থেকে গতকাল সোমবার সকাল ৮টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় করোনায় আক্রান্ত হয়ে ২৪৭ জনের মৃত্যু হয়েছে। এই সময়ে নতুন রোগী শনাক্ত হয়েছে ১৫ হাজার ১৯২ জন। দেশের বিভাগীয় শহরের করোনা ডেডিকেটেড হাসপাতালগুলোতে রোগীর চাপ ক্রমাগত বেড়েই চলছে। বাড়ছে মৃত্যুর সংখ্যাও। এর মধ্যে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ (মমেক) হাসপাতালে একদিনে রেকর্ড সংখ্যক করোনা রোগীর মৃত্যু হয়েছে। এ ছাড়া জেলায় একদিনে রোগী শনাক্তেও রেকর্ড হয়েছে। এই সময়ে গ্রামাঞ্চলে সংক্রমিত রোগীদের অসচেতনতাকে অধিক মৃত্যুহারের জন্য দায়ী করছেন স্বাস্থ্য ও চিকিৎসা বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, গ্রামাঞ্চলের মানুষরা আক্রান্ত হয়েও সময়মতো নমুনা পরীক্ষা না করা এবং অক্সিজেন লেভেল একেবারে নিম্ন পর্যায়ে এসে ঠেকে যাওয়ার পরই হাসপাতালে আসছেন। হাসপাতালে আসার পর এসব রোগীকে সব রকম চিকিৎসা দিয়েও রক্ষা করা যাচ্ছে না। দেশ রূপান্তরের নিজস্ব প্রতিবেদক, প্রতিনিধি ও সংবাদদাতাদের পাঠানো খবরে বিস্তারিত :
মমেক হাসপাতালে একদিনে রেকর্ড মৃত্যু : ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ (মমেক) হাসপাতালে করোনায় মৃত্যু ও জেলায় রোগী শনাক্তে নতুন রেকর্ড হয়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায় মমেক হাসপাতালের করোনা ইউনিটে নতুন করে আরও ২৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। যা হাসপাতালটিতে এ যাবৎকালের করোনায় সর্বোচ্চ মৃত্যুর রেকর্ড। এ ছাড়াও ময়মনসিংহ জেলায় ৩৭০ জনের করোনা শনাক্ত হয়েছে। এটিও একদিনে জেলায় সর্বোচ্চ সংখ্যক করোনা রোগী শনাক্তের রেকর্ড। গতকাল সকালে মমেক হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, করোনা ইউনিটে গত ২৪ ঘণ্টায় ৯ জন করোনায় এবং ১৪ জন উপসর্গ নিয়ে মারা গেছেন। হাসপাতালের করোনা ইউনিটের ফোকালপারসন ডা. মহিউদ্দিন খান মুন জানান, বর্তমানে আইসিইউতে ১৯ জনসহ হাসপাতালের করোনা ইউনিটে ৪৫৬ জন চিকিৎসাধীন।
খুলনা বিভাগে একদিনে ৪৬ জনের মৃত্যু : খুলনা বিভাগে গত ২৪ ঘণ্টায় করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে ৪৬ জনের মৃত্যু হয়েছে। এই সময়ে করোনা রোগী শনাক্ত হয়েছে ১ হাজার ১৮৬ জন। এর আগে গত রবিবার বিভাগে ৪৫ জনের মৃত্যু এবং ১ হাজার ২৭৮ জনের করোনা শনাক্ত হয়েছিল। গতকাল সোমবার বিভাগীয় স্বাস্থ্য অধিদপ্তর এ তথ্য নিশ্চিত করেছে। সূত্র জানায়, বিভাগে সর্বোচ্চ সংখ্যক ১৩ জনের মৃত্যু হয়েছে কুষ্টিয়া জেলায়। বাকিদের মধ্যে খুলনায় ১১, যশোরে ১১, বাগেরহাট ও মেহেরপুরে তিনজন করে, নড়াইল ও মাগুরায় দুজন করে এবং ঝিনাইদহে একজন মারা গেছেন। এ পর্যন্ত বিভাগে মোট শনাক্ত হয়েছে ৮৮ হাজার ২৪৮ জন। মারা গেছেন ২ হাজার ২১৭ জন। সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন ৬২ হাজার ৫৮২ জন।
রামেক হাসপাতালে একদিনে ১৭ মৃত্যু : রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালের করোনা ইউনিটে একদিনে আরও ১৭ জনের মৃত্যু হয়েছে। গত রবিবার সকাল থেকে গতকাল সকালের মধ্যে তাদের মৃত্যু হয়। মৃতদের মধ্যে করোনা আক্রান্ত হয়ে ৮ জন ও উপসর্গে ৯ জন মারা গেছেন। এদের মধ্যে রাজশাহীর ১২ জন, চাঁপাইনবাবগঞ্জের ১ জন, নাটোরের ২ জন, নওগাঁর ১ জন এবং কুষ্টিয়ার ১ জন। ১১ জন পুরুষ এবং ৬ জন নারী। রামেক হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল শামীম ইয়াজদানী এসব তথ্য নিশ্চিত করেন। তিনি জানান, মৃতদের মধ্যে ৭ জনের বয়স ৬১ বছরের ওপরে। ৫১ থেকে ৬০ বছরের মধ্যে ৬ জন, ৪১ থেকে ৫০ বছর বয়সের মধ্যে ১ জন, ৩১ থেকে ৪০ বছরের মধ্যে ২ জন এবং ২১ থেকে ৩০ বছরের মধ্যে একজন রয়েছেন।
বরিশাল বিভাগে শনাক্ত ৮৪১, মৃত্যু ১৮ : বরিশাল বিভাগে গত ২৪ ঘণ্টায় ২ হাজার ১২৬ জনের নমুনা পরীক্ষায় ৮৪১ জনের করোনা শনাক্ত হয়েছে। এ সময় করোনা পজিটিভ ও উপসর্গ নিয়ে ১৮ জন মারা গেছেন। গতকাল সোমবার সকাল পর্যন্ত নতুন শনাক্ত ৮৪১ জনের মধ্যে বরিশাল জেলায় সর্বোচ্চ ৩৮২ জন রয়েছেন। এ ছাড়া পটুয়াখালীতে নতুন করে ১০৭, ভোলায় ১৩৭, পিরোজপুরে ৭৬, বরগুনায় ৭৯ ও ঝালকাঠিতে ৬০ জন শনাক্ত হয়েছেন। এর আগে গত রবিবার সকাল পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় বরিশাল বিভাগে ১ হাজার ৮২৬ জনের নমুনা পরীক্ষায় ৭৬৬ জনের করোনা শনাক্ত হয়েছিল। ওই সময়ে করোনায় ও উপসর্গে ১৫ জনের মৃত্যু হয়েছিল। গতকাল সোমবার বরিশাল বিভাগীয় স্বাস্থ্য অধিদপ্তর এসব তথ্য নিশ্চিত করে।
ফেনীতে একদিনে ৭ জনের মৃত্যু : ফেনী জেনারেল হাসপাতালের করোনা ইউনিটে গত ২৪ ঘণ্টায় করোনা ও উপসর্গ নিয়ে আরও ৭ জনের মৃত্যু হয়েছে। গত রবিবার সকাল থেকে গতকাল সোমবার সকাল পর্যন্ত সময়ে তাদের মৃত্যু হয়। করোনা ডেডিকেটেড ঘোষণার পর থেকে এটি হাসপাতালে একদিনে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ মৃত্যু। এর আগে একদিনে সর্বোচ্চ ৯ জন মারা যান। হাসপাতালের আবাসিক কর্মকর্তা ডা. ইকবাল হোসেন জানান, আইসিইউ ও আইসোলেশন ইউনিটে উপসর্গ নিয়ে মারা যাওয়া ব্যক্তিদের ৪ জন পুরুষ ও ৩ জন নারী। করোনা ইউনিটে নতুন ২৫ জন ভর্তিসহ ১১৩ রোগী ভর্তি আছেন। তাদের মধ্যে আইসিইউতে ১০ ও সিসিইউতে ৫ জন চিকিৎসাধীন। গত ২৪ ঘণ্টায় সুস্থ হয়ে হাসপাতাল ত্যাগ করেছেন ২১ জন।
লক্ষ্মীপুরে শনাক্ত ১৬৯, মৃত্যু ৩ : লক্ষ্মীপুরে একদিনে করোনায় নতুন করে আরও তিন জনের মৃত্যু হয়েছে। আক্রান্ত হয়েছেন ১৬৯ জন। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, গত ২৪ ঘণ্টায় ৪৩৫ জনের নমুনা পরীক্ষায় ১৬৯ জনের করোনা শনাক্ত হয়। জেলা স্বাস্থ্য বিভাগ জানায়, ৯ দিনে করোনা আক্রান্ত হয়ে একজন স্বাস্থ্য সহকারীসহ ৩০ জন মারা গেছেন। এ পর্যন্ত জেলায় করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন ৪ হাজার ৭৯৮ জন। মারা গেছেন ৬৯ জন। জেলা সিভিল সার্জন ডা. আবদুল গফফার জানান, ইতিমধ্যে তিন বেডের আইসিইউ সুবিধা পেয়েছে অন্তত ২০০ রোগী। আরও আইসিইউ বেডের বরাদ্দ চাওয়া হয়েছে।
সুনামগঞ্জে শনাক্ত ১০৭, মৃত্যু ৩ : সুনামগঞ্জে গত ২৪ ঘণ্টায় করোনায় আক্রান্ত হয়ে ৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। এই সময়ে নতুন করে ১০৭ জন করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন। গতকাল দুপুরে জেলা সিভিল সার্জন অফিসের তথ্যমতে জানা যায়, মৃতদের মধ্যে সদর উপজেলায় ২ ও জগন্নাথপুর উপজেলায় একজন রয়েছেন। এ নিয়ে করোনা আক্রান্ত হয়ে জেলায় মোট মৃত্যুর সংখ্যা ৪৭ জনে দাঁড়াল। আর মোট আক্রান্ত সংখ্যা ৪ হাজার ৮৬ জন। এদের মধ্যে সুস্থ হয়েছেন ৩ হাজার ৭৬২ জন। জেলা সিভিল সার্জন ডা. শামস উদ্দিন জানান, গতকাল সিলেটের শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের পিসিআর ল্যাবে করোনা টেস্টে একজন এবং অ্যান্টিজেন নমুনা পরীক্ষায় ১০৬ জনের শরীরে করোনাভাইরাস শনাক্ত হয়েছে।
কুষ্টিয়ায় শনাক্ত ২২৩, মৃত্যু ১৫ : কুষ্টিয়া ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট করোনা ডেডিকেটেড হাসপাতালে গত রবিবার সকাল ৮টা থেকে গতকাল সকাল ৮টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় করোনায় ও উপসর্গ নিয়ে ১৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। এই সময়ে কুষ্টিয়া মেডিকেল কলেজ পিসিআর ল্যাবে ৬৬৬টি নমুনা পরীক্ষা করে ২২৩ জনের শরীরে নতুন করে করোনা শনাক্ত হয়। শনাক্তের হার হিসেবে যা ৩৩% শতাংশ। এ নিয়ে জেলায় মোট মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়াল ৫০৮ জন। হাসপাতালটির তত্ত্বাবধায়ক ডা. আবদুল মোমেন জানান, বর্তমানে হাসপাতালে করোনা পজিটিভ নিয়ে ১৫৬ জন এবং উপর্সগ নিয়ে ৫৪ জনসহ মোট ২১০ জন চিকিৎসা নিচ্ছেন।
দিনাজপুরে শনাক্ত ১০৩, মৃত্যু ৬ : দিনাজপুরে গত ২৪ ঘণ্টায় করোনা ও উপসর্গে ৬ জনের মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে জেলায় নতুন করে ১০৩ জন করোনা আক্রান্ত হয়েছেন। দিনাজপুরের সিভিল সার্জন কার্যালয়ের মেডিকেল অফিসার ডা. শাহ মো. এজাজ-উল হক জানান, গত রবিবার সন্ধ্যা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় জেলায় করোনায় ৪ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে দিনাজপুর সদরে ২, বোচাগঞ্জে একজন ও পার্বতীপুরে একজন রয়েছেন। এছাড়া একই সময়ে দিনাজপুর এম. আব্দুর রহিম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ২ জন উপসর্গ নিয়ে মারা গেছেন। এ নিয়ে জেলায় করোনায় ২৩১ জনের মৃত্যু হলো। বর্তমানে জেলায় ১ হাজার ২৪৯ করোনা রোগীকে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। এর মধ্যে উপসর্গ নিয়ে ১১৯ জন বিভিন্ন হাসপাতালে ও ১২৭ জন করোনা রোগী চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
বগুড়ায় একদিনে ১৬ জনের মৃত্যু : বগুড়ায় তিনটি হাসপাতালের করোনা ইউনিটে ১৬ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে করোনা আক্রান্ত হয়ে একজন এবং উপসর্গে ১৫ জন মারা গেছেন। গত রবিবার সকাল ৮টা থেকে পরবর্তী ২৪ ঘণ্টায় তাদের মৃত্যু হয়। এই সময়ে জেলায় ৬২২ জনের নমুনা পরীক্ষায় আরও ১৭০ জনের করোনা শনাক্ত হয়েছে। বগুড়ার ডেপুটি সিভিল সার্জন ডা. মোস্তাফিজুর রহমান তুহিন গতকাল সোমবার অনলাইন ব্রিফিংয়ে করোনা পরিস্থিতি সম্পর্কে এসব তথ্য নিশ্চিত করেন। তিনি জানান, জেলায় এ পর্যন্ত মোট ১৮ হাজার ২৬৪ জন করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন। এর মধ্যে সুস্থ হয়েছেন ১৫ হাজার ৭৫৪ জন এবং ৫৩৯ জন মারা গেছেন। বর্তমানে জেলায় ১ হাজার ৯৭১ জন করোনা আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসাধীন।