ইরাক থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনী চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত প্রায় চূড়ান্ত। ইরাকে অবস্থানরত যুক্তরাষ্ট্রের অবশিষ্ট আড়াই হাজার সেনা চলতি বছরের শেষ নাগাদ চলে যাবে, এমন মর্মে একটি চুক্তি হয়েছে বাইডেন ও খাদিমির মধ্যে। গত সোমবার যুক্তরাষ্ট্র সফররত ইরাকি প্রধানমন্ত্রী মুস্তাফা আল খাদিমির হোয়াইট হাউজে প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের সঙ্গে বৈঠকে ওই চুক্তি হয় বলে জানিয়েছে একাধিক আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম। ওই চুক্তির পরিপ্রেক্ষিতে গতকাল মঙ্গলবার বিবিসি একটি বিশ্লেষণ প্রকাশ করেছে, সেখানে ইরাক থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সেনাদের প্রত্যাহারের ফলে আঞ্চলিক শক্তিধর দেশ ইরান লাভ হবে কিনা, সে বিষয়ে বিস্তারিত কিছু পয়েন্ট তুলে ধরা হয়েছে।
২০১১ সালে আরব বসন্তের পর থেকেই মূলত ইরান বনাম যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা দেশগুলোর ছায়াযুদ্ধ শুরু হয়। প্রথমে একটি দেশ থাকলেও ক্রমশ ছায়াযুদ্ধের পরিধি বাড়তে থাকে। সিরিয়ায় প্রথম ছায়াযুদ্ধে শক্তিমত্তা প্রকাশ করে ইরান। সরাসরি ইরানের অর্থায়নে সিরিয়ায় একাধিক পক্ষ যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থের বিপরীতে লড়াই শুরু করে। ইরানের সঙ্গে ওই লড়াইয়ে যুক্ত হয় রাশিয়া। যদিও রাশিয়া অন্য কোনো গোষ্ঠীকে অর্থায়নের চেয়ে নিজেই সক্রিয় অংশগ্রহণ করছে বেশি। ফলে ২০১৫ সাল নাগাদ সিরিয়ার পরিস্থিতি পাল্টাতে শুরু করে। পশ্চিমা শক্তি ক্রমশ নিষ্ক্রিয় হতে থাকে।
একই সময়ে ছায়াযুদ্ধ সিরিয়া ছাড়িয়ে ইরাক-ইয়েমেন-লেবানন-আফগানিস্তানে পৌঁছায়। আফগানিস্তানেও একাধিক গ্রুপকে অর্থায়ন ও সামরিক সহায়তা করতে থাকে ইরান। যদিও তালেবানরা বলছে তাদের সঙ্গে ইরানের কোনো সম্পর্ক নেই। তবে দেশটির আঞ্চলিক রাজনীতিকবিষয়ক একাধিক বিশ্লেষক বলছেন, তালেবানদের একাধিক গোষ্ঠীর মধ্যে সেই অর্থে কোনো চেইন অব কমান্ড নেই। কয়েকটি পক্ষ তেহরান সমর্থিত কিছু পক্ষ থেকে সহায়তা পেয়ে আসছে। তালেবানদের ওই পক্ষই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দোহায় আলোচনায় বসেছে, এমন কথাও বলছেন বিশ্লেষকরা।
ইরাকে অবস্থানরত মার্কিন সেনারা দেশটির নিরাপত্তা বাহিনীকে প্রশিক্ষণ, পরামর্শ ও সামরিক সহায়তা দিচ্ছেন। বছর কয়েক আগে ইসলামিক স্টেটকে (আইএস) ইরাক সরকার পরাজিত করার ঘোষণা দিলেও দেশটিতে এখনো জঙ্গিগোষ্ঠীটির উদ্বেগজনক তৎপরতা রয়েছে। বিভিন্ন সময় আইএসের চালানো রক্তক্ষয়ী হামলা তার প্রমাণ। ফলে ইরাকে অবস্থানরত মার্কিন সেনারা একদিকে যেমন আইএসের বিরুদ্ধে লড়ছেন, অন্যদিকে ইরাকি বাহিনীকে জঙ্গিবিরোধী লড়াইয়ে সক্ষম করে তুলছেন।
ইরাকে যুক্তরাষ্ট্রের সেনাদের উপস্থিতি নিয়ে সে দেশে জোর বিতর্ক রয়েছে। বিশেষ করে ইরান-সমর্থিত রাজনীতিক ও মিলিশিয়ারা চান, ইরাক থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সব সেনা দ্রুত চলে যাক। ২০২০ সালের জানুয়ারিতে ইরাকের রাজধানী বাগদাদের বিমানবন্দরে যুক্তরাষ্ট্রের ড্রোন হামলায় ইরানের অভিজাত রেভল্যুশনারি গার্ডসের কুদস ফোর্সের প্রধান মেজর জেনারেল কাসেম সোলাইমানি নিহত হন। একই হামলায় ইরাকের শিয়াপন্থি শীর্ষ মিলিশিয়া কমান্ডারও নিহত হন। এই ঘটনার পর ইরাক থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সেনা হটানোর ব্যাপারে ইরান-সমর্থিত রাজনীতিক ও মিলিশিয়ারা তাদের তৎপরতা জোরদার করে। ইরাকে যুক্তরাষ্ট্রের সেনা অবস্থান লক্ষ্য করে সম্প্রতি রকেট ও ড্রোন হামলার পরিমাণ বেড়ে যেতে দেখা গেছে। এই হামলার জন্য ইরান-সমর্থিত মিলিশিয়াদের দায়ী করছে যুক্তরাষ্ট্র। ইরাকের যেসব রাজনীতিক কোনো পক্ষে নেই, তারাও চান তাদের দেশ বিদেশি সেনামুক্ত হোক। বিদেশি সেনা উপস্থিতির বিষয়টি তারাসহ ইরাকের সাধারণ জনগণের মধ্যে ‘দখলদারি’ অব্যাহত থাকার মনোভাব তৈরি করেছে।