বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট লঘুচাপের প্রভাবে উপকূলীয় জেলা বরগুনায় গত ৪৮ ঘণ্টায় ৪৭৩ মি.মি. বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। টানা বর্ষণে প্লাবিত হয়েছে উপকূলীয় নিম্নাঞ্চল। প্রাথমিক ক্ষয়ক্ষতি নিরূপনে ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে মৎস্য ও কৃষিখাত। বেড়িবাঁধের বাইরে অবস্থিত কাঁচা বসতঘর ও আবাসন প্লাবিত হয়েছে। বসতঘর-রান্নাঘর তলিয়ে যাওয়ায় রান্না বন্ধ রয়েছে অধিকাংশ পরিবারে। খাদ্য সংকট দেখা দিয়েছে নিম্নআয়ের পরিবারগুলোর মধ্যে।
বরগুনা জেলা পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, মঙ্গলবার সকাল ৯টা থেকে বৃহস্পতিবার সকাল ৯টা পর্যন্ত বরগুনায় ৪৭৩ মি.মি. বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে।
অতিবর্ষণে বরগুনার পায়রা-বিশখালী ও বলেশ্বর এই তিনটি নদীর পানি স্বাভাবিকের চেয়ে তিন ফুট উচ্চতায় প্রবাহিত হচ্ছে। অতিবর্ষণের সাথে ঝড়ো হাওয়ায় সৃষ্ট ঢেউয়ে জেলার বন্য নিয়ন্ত্রণ বাঁধে তীব্র ভাঙন দেখা দিয়েছে। ২২টি পোল্ডারের ৮০০ কিলোমিটার বেড়িবাঁধের বেশ কিছু এলাকায় ভাঙনকবলিত হয়েছে। এতে উপকূলীয় নদী তীরবর্তী এলাকার লোকজন আতঙ্কিত হয়ে পড়েছেন।
বরগুনা সদর উপজেলার জয়ালভাঙা গ্রামের বাসিন্দা আনোয়ার হোসেন বলেন, টানা বৃষ্টিতে ঘরবাড়ি তলিয়ে গেছে। ঘরের মধ্যে পানি প্রবেশ করায় রান্নাবান্না করার কোনো উপায় নেই। তাই গতকাল থেকে শুকনো খাবার খেয়ে পরিবার-পরিজন নিয়ে ঘরের দোতলায় আশ্রয় নিয়েছি। নিজেদের খাদ্য সমস্যার পাশাপাশি গবাদিপশুরও খাদ্য সংকট দেখা দিয়েছে।
বরগুনা জেলা মৎস্যজীবী ট্রলার মালিক সমিতি সূত্রে জানা গেছে, ২৩ জুলাই মধ্যরাত থেকে সাগরে মাছ শিকারের নিষেধাজ্ঞা উঠে যাওযায় সাগরে গিয়ে উত্তাল সাগর আর ঝড়ের কবলে পড়ে শত শত মাছ ধরার ট্রলার সুন্দরবন সংলগ্ন, কচিখালী, কটকায় আশ্রয় নিয়েছে।
বরগুনা জেলা মৎস্যজীবী ট্রলার মালিক সমিতির সভাপতি গোলাম মোস্তফা চৌধুরী বলেন, নিষেধাজ্ঞা শেষে বরগুনার শত শত ট্রলার গভীর সমুদ্রে মাছ শিকারে যায়। কিছু কিছু ট্রলার বৈরী আবহাওয়ায় বিএফডিসি ঘাটে ফেরত আসতে পারলেও শত শত ট্রলার ঝড়ের কবলে পড়ে সুন্দরবন সংলগ্ন কচিখালী, কটকাসহ সুন্দরবনের বিভিন্ন স্থানে আশ্রয় নিয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত কোনো ট্রলার ডুবি কিংবা হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি।
বরগুনা জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, টানা বর্ষণে বরগুনার ৬টি উপজেলায় ৮ হাজার ৩শ হেক্টর আমনের বীজতলা পুরোটাই নষ্ট হয়ে গেছে। এছাড়াও ৪ হাজার ৭৫৬ হেক্টর আউশ ক্ষেতের মধ্যে ৩ হাজার ৩০৩ হেক্টর আউশের খেত নষ্ট হয়ে গেছে। ৪১৩ হেক্টর পানের বরজের মধ্যে ২১৫ হেক্টর পানের বরজ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এছাড়াও লাউ, কুমড়া, শসা, ঝিঙাসহ ১ হাজার ২৭০ হেক্টর মৌসুমী সবজি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
তালতলীর সওদাগর পাড়ার কৃষক শাহাদাত মাতুব্বর বলেন, তার গ্রামে একশ' একরের বেশি জমির সবজি সম্পূর্ণভাবে ক্ষতি হয়েছে। এর মধ্যে মরিচ, শসা, করলা এবং মিষ্টি কুমড়া বেশি ক্ষতি হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের ধারণা তাদের দেড় থেকে ২ কোটি টাকার সবজির ক্ষতি হয়েছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মো. আ. রশিদ বলেন, বৃষ্টিতে বরগুনায় কৃষি সেক্টরের অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছে। আমরা প্রাথমিকভাবে বেশকিছু সেক্টরের ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণ করেছি। আর্থিক ক্ষতিসহ পূর্ণাঙ্গ ক্ষতি নিরূপণে ২/৩ দিন সময় লাগবে বলেও তিনি জানান।
বরগুনা জেলা মৎস্য কর্মকর্তা বিশ্বজিৎ দেব বলেন, ভারী বর্ষণে বরগুনার ৬টি উপজেলায় প্রাথমিকভাবে ৫৮১টি পুকুর ও ১৫৩টি মৎস্য ঘের বৃষ্টির পানিতে ভেসে গেছে। তবে এখনো ৬ উপজেলার সম্পূর্ণ ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ জানা যায়নি। যে হারে বৃষ্টিপাত হচ্ছে তাতে এ ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ আরও বৃদ্ধি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
জেলা প্রশাসক হাবিবুর রহমান বলেন, টানা বর্ষণে বরগুনায় মৎস্য কৃষিখাতে ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া গেছে। আমি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাগনকে তাদের স্ব স্ব এলাকার খোঁজখবর রাখার জন্য বলেছি। অতিবর্ষণের কারণে সৃষ্ট প্লাবনের শিকার বাসিন্দাদের সরকারের পক্ষ থেকে যথাসম্ভব আশ্রয় ও খাদ্য সহায়তা দেয়া হবে।
ক্ষয়ক্ষতির সঠিক তালিকা নির্ণয় করে ক্ষতিগ্রস্তদের যথাসম্ভব সহায়তার আশ্বাস দেন জেলা প্রশাসক।