পুরো প্রকল্পে ছয় বিঘা জমি। যেখানে ১৪ তলার পাঁচটি ভবনে তৈরি করা হয়েছে ৫৩৩টি আধুনিক ফ্ল্যাট। লিফট, জেনারেটর, সৌরবিদ্যুৎ, প্রশস্ত ওয়াকওয়ে, বিদ্যুতের সাবস্টেশন ও সৌন্দর্যবর্ধনের লাইটিংসহ আধুনিক নগর জীবনের জন্য প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থাই রয়েছে। দৃষ্টিনন্দন প্রধান ফটক দিয়ে প্রকল্প এলাকায় প্রবেশ করলেই বোঝা যাবে পরিকল্পিত ও আধুনিক আবাসনের ছোঁয়া লেগেছে রাজধানীর মিরপুরের ১১ নম্বর সেকশনে। এখানে ১৪৯ কোটি টাকা ব্যয়ে জাতীয় গৃহায়ন কর্র্তৃপক্ষের (জাগৃক) নিজস্ব অর্থায়নে তৈরি করা ফ্ল্যাটগুলো পাচ্ছে বস্তিতে বসবাসকারীরা। আগামী ৩ আগস্ট প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এসব ফ্ল্যাটের বরাদ্দপত্র বস্তিবাসীর মাঝে বিতরণ করবেন।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, স্বাধীনতার পর দীর্ঘ সময়ে বস্তিবাসীদের নিয়ে এমন উন্নত বাসস্থানের চিন্তা দেশে এটিই প্রথম। রাজধানী ঢাকায় নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য এটি হবে প্রথম আধুনিক বাসস্থানের ‘দলিল’।
এ প্রসঙ্গে গৃহায়ন ও গণপূর্ত সচিব মো. শহীদ উল্লা খন্দকার গতকাল বৃহস্পতিবার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘কয়েক বছর আগেও এখানে (প্রকল্প এলাকা) ঘিঞ্জি ঘরে বসবাস করত নিম্ন আয়ের মানুষ। “সবার জন্য আবাসন/কেউ গৃহহীন থাকবে না” সরকারপ্রধানের এমন ঘোষণার পর গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের অধীনে থাকা সংস্থা দিয়ে আমরা ব্যাপক কর্মযজ্ঞ হাতে নিই। এখানে বস্তিবাসীর জন্য সব আধুনিক সুযোগ-সুবিধা রেখে উন্নত আবাসনের ব্যবস্থা করা হয়েছে। ভাড়াভিত্তিক এ ফ্ল্যাট প্রকল্পটি ৩ আগস্ট মঙ্গলবার প্রধানমন্ত্রী উদ্বোধন করবেন।’
বস্তিবাসীদের জন্য ভাড়াভিক্তিক ফ্ল্যাট নির্মাণ প্রকল্প সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের চিন্তার ফসল জানিয়ে জাগৃকের চেয়ারম্যান (অতিরিক্ত সচিব) মো. দেলওয়ার হায়দার গতকাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সরকার মনে করেছে যেহেতু তারা ভাড়া দিয়ে একটি অস্বাস্থ্যকর ও ঘিঞ্জি পরিবেশে বসবাস করে, সে জায়গায় একই ভাড়ায় উন্নত আবাসন দেওয়া সম্ভব। আমরা এ যাত্রায় ৫৩৩টি ফ্ল্যাট প্রস্তুত করেছি। আরও এক হাজার ফ্ল্যাট নির্মাণের পরিকল্পনা হাতে রয়েছে।’
সংস্থাটির চেয়ারম্যান আরও বলেন, ‘বর্তমান সরকার ছিন্নমূল মানুষের আবাসন সংকট দূর করতে দেশের চিহ্নিত তিনটি পৌরসভা ও সিটি করপোরেশন (কুমিল্লা, সিরাজগঞ্জ ও নারায়ণগঞ্জ) এলাকায় বাসস্থান উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে কাজ করছে। বিশ্বব্যাংকের সাহায্যপুষ্ট প্রকল্পটিতে ৫ হাজার ৭০০ ইউনিট বাসস্থান নির্মাণের সংস্থান রাখা হয়েছে। এটি বাস্তবায়নে জাগৃক অত্যন্ত যতেœর সঙ্গে দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছে।’
জাগৃক থেকে পাওয়া তথ্যমতে, ২০১৮ সালের জানুয়ারিতে রাজধানীর মিরপুরের ১১ নম্বর সেকশনে বস্তিবাসীর জন্য ভাড়াভিত্তিক ৫৩৩টি আবাসিক ফ্ল্যাট নির্মাণ প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়। ১৪৯ কোটি ব্যয়ে এ প্রকল্পে মোট ছয় বিঘা জমির ওপর ১৪ তলার পাঁচটি ভবন নির্মাণ করা হয়। যার মধ্যে চারটি ভবনে ৬৭৩ বর্গফুটের ৪৬৮টি এবং আরেকটি ভবনে আরও ৬৫টি ফ্ল্যাট রয়েছে। প্রতিটি ফ্ল্যাটে বসবাসের কক্ষের পাশাপাশি রান্নাঘর, বেসিন, টয়লেট ও আলাদা গোসলখানা রয়েছে।
জাগৃকের সদস্য (প্রকৌশল ও সমন্বয়) কাজী ওয়াসিফ আহমাদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বস্তিবাসীর এ প্রকল্পের সীমানা প্রাচীর, প্রশস্ত রাস্তা, সৌন্দর্যবর্ধনের জন্য ওয়াকওয়ে, প্রতিটি ভবনের জন্য লিফট, প্রতিটি ভবনে ৪০ কেভিএ জেনারেটর, ২৫০ কেভিএ সাবস্টেশন, অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা এবং লাইটিং ও দৃষ্টিনন্দন প্রধান ফটকসহ সব ভবনের জন্য সৌরবিদ্যুৎ প্যানেল বসানো হয়েছে।’
গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় থেকে পাওয়া তথ্যমতে, বস্তিবাসীর ফ্ল্যাট প্রকল্প ছাড়াও সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য রাজধানীর মতিঝিল, আজিমপুর, মিরপুর, মালিবাগ ও তেজগাঁও এলাকায় পাঁচটি আবাসন প্রকল্প উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী। একই সঙ্গে মাদারীপুরে একটি সমন্বিত সরকারি অফিস ভবনও উদ্বোধন করবেন। এ উদ্বোধনী অনুষ্ঠান হবে রাজধানীর বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে। আগামী ৩ আগস্ট সকাল সাড়ে ১০টায় অনুষ্ঠানে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী যুক্ত হবেন। অনুষ্ঠানস্থলে গৃহায়ন ও গণপূর্ত প্রতিমন্ত্রী মো. শরীফ আহমেদ, গণপূর্ত সচিব মো. শহীদ উল্লা খন্দকার, পূর্ত অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী মো. শামীম আখতার, জাগৃকের চেয়ারম্যান মো. দেলওয়ার হায়দার উপস্থিত থাকবেন।
সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পাঁচ আবাসন প্রকল্প : রাজধানীতে বসবাসরত সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য নির্মিত ২ হাজার ৪১৬টি ফ্ল্যাটের প্রকল্প উদ্বোধন করবেন সরকারপ্রধান। আজিমপুর, মিরপুর, মতিঝিল ও মালিবাগ এলাকায় অবস্থান এসব প্রকল্পের। এর মধ্যে আজিমপুর সরকারি কলোনিতে রয়েছে ১৭টি ২০ তলা ভবনে ১ হাজার ২৯২টি ফ্ল্যাট, মিরপুর ৬ নম্বর সেকশনে ২৮৮টি ফ্ল্যাট, মালিবাগে চারটি ২০ তলা ভবনে ৪৫৬টি ফ্ল্যাট এবং মতিঝিলে পাঁচটি ২০ তলা ভবনে ৩৮০টি ফ্ল্যাট। এছাড়াও উদ্বোধনের তালিকায় রয়েছে রাজধানীর তেজগাঁওয়ে আটতলার দুটি আবাসিক ভবন। এ দুটি ভবন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে কর্মরত সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।
গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী মোহাম্মদ শামীম আখতার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আগামী ৩ আগস্ট প্রধানমন্ত্রী মোট সাতটি প্রকল্পের উদ্বোধন করবেন। এর মধ্যে গণপূর্ত অধিদপ্তরের ছয়টি প্রকল্প রয়েছে। উদ্বোধনের জন্য আমরা সব বিষয়ে প্রস্তুতি ইতিমধ্যে সম্পন্ন করেছি।’