এদেশে যারা বৈশাখ থেকে শুরু করে ভাদ্র-আশ্বিন মাস পর্যন্ত গরমের তীব্রতা প্রতিনিয়ত সহ্য করেন শুধু তারাই বোঝেন গরমের জ্বালা। ঋতু যেটাই হোক না কেন, খুব ভোরে উঠে গ্রামের সাধারণ কৃষকদের ক্ষেতের কাজে যেতে হয়। দুপুর গড়িয়ে প্রায় বিকেল পর্যন্ত মাঠে থাকার পুরোটা সময় রোদে পুড়তে থাকে তাদের শরীর। অনেক সময় ক্ষেত থেকেই ফসল তুলে হাটে যেতে হয় বিক্রির জন্য। হাটে যাওয়ার সময় ভ্যানেও অন্তত ৬ জন একসঙ্গে যান। নসিমন-ভটভটির নতুন বিকল্প হিসেবে প্রচুর ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা এখন গ্রামাঞ্চলে। হাটে দল বেঁধে বেচাকেনা শেষে আবার দল বেঁধে বাড়ি ফেরেন এই কৃষিজীবী মানুষেরা।
গ্রামের বউ-ঝিরাও প্রায়ই দল বেঁধেই অনেক কাজ করেন। অনেক সময় ৩/৪টি পরিবারের নারীরা একটি উঠানে একত্রে বসেই কাজ করেন। সেসব উঠোনে প্রায়ই পেঁয়াজটা, মরিচটা দেওয়া-নেওয়ার মাধ্যমে গরমের মধ্যেই উঠোনে লাকড়ির চুলায় চলে রান্না; সঙ্গে চলে এর-ওর ঘর-সংসারে কী হলো সেসব গল্প-আড্ডা। এরপর মাথায় তেল দেওয়া বা গাছের নিচে বসে বাতাস খাওয়ার জন্যও চলে দল বেঁধে আড্ডা। মাঠে গরু-ছাগল চরানোর জন্যও বাড়ির পুরুষের পাশাপাশি নারীরাও মাঠে যান। মাথার ওপরে থাকে গনগনে রোদের তেজ। আবার অনেক বাড়িতে ঢোকার মুখে বসার জন্য বাঁশের টং-মাচাং বানানো থাকে। সেখানে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বড়, ছোট নানা বয়সীদের চলে ধুন্দুমার লুডু বা কড়ি খেলা কিংবা নিখাঁদ আড্ডা। গরমের দিনগুলোতে শরীর জুড়োতে গ্রামের পুকুর, খাল-বিলে যে কেউ যখন-তখন ঝাঁপ দেয়।
বাংলাদেশের গাঁও-গেরামের এমন আটপৌরে চিত্র থেকে একটা বিষয় খুবই স্পষ্ট। পুরুষই হোক কিংবা নারী অথবা ছোট ছেলেমেয়ে কিংবা কিশোর-কিশোরী গ্রামাঞ্চলের মানুষদের দৈনন্দিন জীবনযাপনের অনেকটা সময় অন্তত কয়েকজন মিলেমিশে একত্রেই কাটে তাদের অনেকটা সময়।
আজকাল গ্রাম হয়ে গেছে না গ্রাম না শহর। গ্রামের ঘরে ঘরে এখন স্যাটেলাইট টিভি দেখার ডিশ-অ্যান্টেনা। দেদার চলছে হিন্দি চ্যানেল। হাতে হাতে স্মার্ট ফোন, আছে ইন্টারনেট। সেখানে টিকটকের চল বেশি। ফেইসবুকেও পাল্লা দিয়ে চলে নানারকম স্ট্যাটাস, পোস্ট। কিন্তু এসব অনেক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে গ্রামের সমাজজীবনের চালচিত্রের অনেক কিছুই বদলে গেলেও চিন্তা-চেতনার পরিবর্তন কতটুকু হয়েছে সেটা দীর্ঘ আলোচনার বিষয় বটে। গ্রামীণ সংস্কৃতিতে নানান রক্ষণশীলতা আর কুসংস্কারের চলের যেসব কথা শহুরে মানুষরা বলেন সেসব কতটুকু বদলেছে আসলে? নারীর প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি যে খুব একটা বদলায়নি সেটা বোঝাই যায়। বাল্যবিয়ে যেমন কমেনি উল্টো করোনাকালে আরও বেড়ে গেছে। যেকোনো অজুহাতে বউ-ঝিদের গায়ে হাত তোলার প্রবণতা আগের মতোই রয়েছে। দুই একটি ব্যতিক্রমে হয়তো কোথাও বিয়ে ভেঙে যায়, যা কেবল উদাহরণেই সীমাবদ্ধ। মেয়েদের এত পড়াশোনা করে কী হবে এমন চিন্তা কমলেও দূর যে হয়নি সেটা বলাই বাহুল্য। আবার চিকিৎসা সেবার সুযোগ যেমন কম তেমনি অসুখ-বিসুখ নিয়ে সচেতনতাও খুবই কম। যে অসুস্থতাই হোক না কেন গ্রাম্য ডাক্তার বা কোনো ফার্মেসিতে গিয়ে ‘দুইডা বড়ি দেন’ স্টাইলে এখনো চলছে নিজেদের মতো করে নিজের চিকিৎসা। ঝাড়ফুঁকের চলও উঠে যায়নি। অনেক কুসংস্কার আছে বহাল তবিয়তেই।
এসব বিষয়ে মোটামুটি একটা ধারণা সবারই কমবেশি আছে। কিন্তু অন্য অনেক সময়ের মতোই করোনাকালেও দেখা যাচ্ছে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা কিংবা করোনা বিষয়ে সচেতনতা না থাকা নিয়ে অনেকেই গ্রামের মানুষদের দোষারোপ করে যাচ্ছেন। রাজধানীর পথে ফিরতে থাকা মানুষের উপচেপড়া ভিড়ের ছবি, ফেরির ছবি, ঘাটের ছবি ফেইসবুকে ভাসতে থাকে। আর ক্যাপশনে কমেন্টে চলতে থাকে বিষোদগার। গ্রামের মানুষ, সাধারণ মানুষদের সমালোচনা আর নিন্দা। কিন্তু বিবেচনা করা হয় না যে, এই শ্রমজীবী মানুষরা নিতান্ত বাধ্য হয়েই গাদাগাদি ভিড় করে রাজধানী ঢাকা আর সারা দেশের বড় শহরগুলোতে ভিড় জমান। অন্যদিকে, ঢাকার এসি রুমে গাদাগাদি আড্ডার ছবি কোথাও মিলবে না। এসি গাড়িতে গাদাগাদি করে কোনো পর্যটন কেন্দ্রে কিংবা দূর কোনো নিভৃত গ্রামাঞ্চলের বাংলোবাড়িতে বেড়াতে যাওয়ার ছবি কখনো ফেইসবুকে মিলবে না। এমন কোনো ছবি নিয়ে কোনো সমালোচনা তো দূরে থাক আলোচনার সাহসও কেউ পায় না।
সব দোষ সাধারণ মানুষের! গ্রামের মানুষের! এমন দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে কথা বলার আগে কিছু বিষয় নিয়ে ভাবতে বসা জরুরি বটে। গ্রীষ্মের প্রচ- রোদে ক্ষেত, খামার, হাটবাজার, দোকানপাটে কিংবা বাড়ির উঠানে লাকড়ির চুলায় রান্না, পুকুর ঘাট/কলপাড়ে কাপড় ধোয়ার সময় মাস্ক পরে থাকা কতটা অসহ্য হতে পারে সেটা কি আমরা শহুরে মানুষরা কল্পনা করতে পারি? তাই, আমপাকা, কাঁঠালপাকা বা তালপাকা গরমের যে ধরনই আমরা দেখি না কেন তাতে মাস্ক পরে থাকা আর নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে যাওয়া প্রায় সমান কথাই হওয়ার কথা। গ্রামে শহরের মতো এত রিকশা, সিএনজি, উবার, পাঠাও নেই। নিজের মতো করে একলা চলার সুযোগও নেই। প্রচ- রোদ-গরমে ভ্যান, নসিমন, অটোরিকশা, বাসে গাদাগাদি করেই চলাফেরা করতে হয় সবাইকে। কল্পনা করুন এ সময়গুলোতে মাস্ক পরে থাকাটা কতটা স্বস্তির?
করোনা মহামারীর নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলছেই। করোনার স্বাস্থ্যবিধি শিষ্টাচার সবাইকে মানতে হবে। ঘরে বাইরে সবখানেই। তাহলে প্রশ্ন হচ্ছে, সারা দেশে মাস্ক পরা কর্মসূচিকে সফল করতে সরকার যে নির্দেশনা দিচ্ছে তা কি কোনো কাজে লাগছে? জ্বর, সর্দি, কাশি, হাঁপানি, যক্ষ্মা, বাতের ব্যথা থেকে শুরু করে শরীরের যাবতীয় ব্যথায় ‘দুইটা বড়ি’ এখনো অনেকেরই ভরসা। গ্রামের লাখ লাখ মানুষের যেকোনো অসুখেই কয়েকদিন বিছানায় পরে থাকার পুরনো অভ্যাস আজও বিদ্যমান। খাবারের স্বাদ, গন্ধ পেল কি পেল না সেসব তারা গায়ে মাখে না। তাহলে গ্রামের মানুষদের জন্য করোনা থেকে সতর্কতার জন্য করণীয় কী?
একটু ভেবে দেখেন, ঘরে ঘরে ডিশ-অ্যান্টেনা, প্রতি পরিবারেই প্রায় একটি করে স্মার্ট ফোন এবং তাতে নেট সংযোগ। অন্তত গড়ে একটি পরিবারে কেউ না কেউ চাকরি করছে বা কোনো উন্নয়ন প্রকল্পের কাজে নিয়োজিত। সরকারের প্রতিটি নির্দেশ মিডিয়ার মাধ্যমে তাদের পাওয়ার কথা। তারা পাচ্ছেও বটে। কিন্তু তাতে থোড়াই কেয়ার। কেন? আমরা কি সেসব ভেবেছি?
রাস্তাঘাট, ব্রিজ, কালভার্ট, বড় বড় ভবন তৈরিকে আমরা উন্নয়ন বলছি। অথচ আমরা এদেশের মানুষের বোধ তৈরি করতে পারিনি। কুসংস্কার আর নানা পুরনো ধ্যান-ধারণা থেকে বের করতে পারিনি। ডিশ লাইনে জি-বাংলা, স্টার প্লাস, ভুল তথ্যের ধর্মীয় ওয়াজ বিপুল সংখ্যক মানুষকে পুরোপুরি প্রভাবিত করছে। এই করোনা মহামারীতে মরে যাচ্ছে তবু অনেকেই টিকা নিতে রাজি হচ্ছেন না।
এই পরিস্থিতির পেছনে দেশের গ্রামাঞ্চলে শিক্ষাদীক্ষার বিস্তার এবং সাংস্কৃতিক চর্চার অনগ্রসরতার বিষয়টি আলোচনায় না এনে কেবল একতরফা দোষারোপ করে কোনো লাভ হবে না। গ্রামের মানুষের হাজারো বঞ্চনার অব্যক্ত ধ্বনি-প্রতিধ্বনি প্রতিদিন বাতাসে মিলিয়ে যায়। রাজধানীর এসির বাতাসে বসে সেই আওয়াজ আমরা শুনতে পাই না। অথচ গ্রামের মানুষগুলোর শ্রমে-ঘামেই ঘুরছে শহরের তথাকথিত উন্নয়নের চাকা। আর আজ গ্রামের মানুষরা উপেক্ষিত ও সমালোচনার পাত্র। আসলে আমাদের মতো করে বোঝতে চাইলে তারা বুঝবেন না। গ্রামের মানুষদের কাছে যেতে হবে, বোঝাতে হবে তাদের মতো করেই। এই সত্য না বুঝলে গ্রামাঞ্চলে করোনা নিয়ন্ত্রণ কিংবা অন্য কোনো পরিকল্পনাই কাজে আসবে না।
লেখক : সাংবাদিক