গ্রামে সর্দি-জ্বরের ওষুধের সংকট

করোনার সংক্রমণ রোধে দেশ জুড়ে চলমান ‘কঠোর বিধিনিষেধের’ মধ্যেও ভাইরাসটিতে আক্রান্ত ও মৃত্যু সংখ্যা দুটিই বেড়ে চলেছে। আগে শুধু ঢাকায় সংক্রমণ-মৃত্যু বেশি হলেও বর্তমানে দেশের সবকটি বিভাগীয় শহরে করোনা পরিস্থিতি ‘ভয়াবহ’ রূপ ধারণ করেছে। এমনকি ঢাকার হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসা নিতে আসা করোনা রোগীদের সিংহভাগই গ্রামাঞ্চল থেকে আসা। ভাইরাসটির ভারতীয় ডেল্টা ধরন ছড়িয়ে পড়ার পর থেকেই মফস্বলেও করোনা চোখ রাঙাচ্ছে। ঢাকার বাইরে সেসব এলাকার হাসপাতালগুলোতে করোনা পজিটিভ ও উপসর্গ নিয়ে আসা রোগী সংখ্যা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। তাছাড়া গ্রামাঞ্চলে সাধারণ সর্দি-জ্বরের প্রকোপও বেড়েছে। একই সঙ্গে বাড়ছে করোনা ও সর্দি-জ্বরের প্রচলিত ওষুধের সংকটও। গত কয়েক দিন ধরেই দেশের বিভিন্ন স্থানে প্যারাসিটামল ও সমগোত্রীয় ওষুধের সংকট দেখা যাওয়ার খবর পাওয়া গেছে। কোথাও কোথাও আবার করোনা পরিস্থিতিকে পুঁজি করে বাজারে প্যারাসিটামল জাতীয় ওষুধের কৃত্রিম সংকট তৈরি করা হয়েছে বলেও অভিযোগ পাওয়া গেছে।

চাঁদপুর সদর উপজেলার রাসেল নামে এক ক্রেতা জানান, তার দুই বছর বয়সী বাচ্চার জ¦র আসায় নাপা খাওয়াতে বলেন চিকিৎসক। কিন্তু শহরের অনেক ফার্মেসি ঘুরেও ওষুধ পাননি তিনি। সেখানকার আরও কয়েকজন ক্রেতা বলেন, পরিবারের সদস্যদের জ্বর থাকায় ডাক্তারের পরামর্শমতো প্যারাসিটামল ওষুধ কিনতে ফার্মেসিতে এসেছি। কিন্তু ‘নাপা’, নাপা এক্সটেন্ড বা প্রথম সারির কোনো কোম্পানির প্যারাসিটামলের ওষুধ পেলাম না।

বরগুনার বেতাগী পৌর শহরের তাজ ফার্মা অ্যান্ড সার্জিক্যাল ফার্মেসির মালিক হুমায়ূন কবির বলেন, ‘জ্বরের ওষুধ এইস, এইস প্লাস, এইচ এপ আর ট্যাবলেট, ফাস্ট, ফাস্ট এপ আর ওষুধেরও সংকট রয়েছে। কোম্পানি যে পরিমাণ ওষুধ সরবরাহ করে, তা চাহিদার তুলনায় একেবারে অপ্রতুল। প্রায় এক মাস ধরে এ সংকট চলছে।’

ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় কর্মরত স্কয়ার ফার্মার সিনিয়র এক কর্মকর্তা জানান, ওষুধ তাদের হাতে এসে পৌঁছলে সেগুলো সরবরাহ করছেন। বেক্সিমকো ফার্মার একই এলাকার রিজিওনাল ম্যানেজার বলেন, ‘এমনিতেই বর্তমান সময়টাতে ফ্লু বেশি হয়, তার ওপর করোনা পরিস্থিতির কারণে প্যারাসিটামল জাতীয় পণ্যের ব্যাপক চাহিদা। কিন্তু আমাদের উৎপাদন সহায়তার ওপর নির্ভর করে সরবরাহ চলছে। এ ক্ষেত্রে আমাদের পণ্যে সরবরাহে ঘাটতি রয়েছে।’

এ বিষয়ে নেত্রকোনা জেলা সিভিল সার্জন ডা. মো. সেলিম মিয়া জানান, করোনাভাইরাসের প্রকোপ ও সেই সঙ্গে জ্বর, সর্দি, কাশি বৃদ্ধি পাওয়ায় প্যারাসিটামলের চাহিদা বাড়ছে। অতিরিক্ত দামে ওষুধ বিক্রির বিষয়টি তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।

এদিকে ঢাকার বাইরে বিভাগ, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে গত ২৪ ঘণ্টায় করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ও মৃত্যুর খবরাখবর দেশ রূপান্তরের ব্যুরো, নিজস্ব প্রতিবেদক, প্রতিনিধি ও সংবাদদাতাদের পাঠানো তথ্যে

খুলনা বিভাগে করোনায় মৃত্যু কমলেও শনাক্ত বেড়েছে। গত রবিবার দুপুর ১২টা থেকে গতকাল দুপুর ১২টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় করোনায় আক্রান্ত হয়ে ২৬ জনের মৃত্যু হয়েছে। এ সময়ে করোনা শনাক্ত হয়েছে ১ হাজার ৩৭৩ জনের। এ পর্যন্ত বিভাগে মোট শনাক্ত ৯৫ হাজার ১৮৫ জন।

সিলেট বিভাগে গত রবিবার সকাল ৮টা থেকে গতকাল সকাল ৮টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় করোনায় আরও ১৪ জনের মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে সিলেট বিভাগে করোনায় ৭১৬ জনের মৃত্যু হলো। এদিকে গত এক দিনে বিভাগে নতুন আরও ৮৫৩ জনের শরীরে করোনাভাইরাস শনাক্ত হয়েছে।

বরিশাল বিভাগে করোনায় সংক্রমণ ও মৃত্যু আবারও বেড়েছে। গতকাল সকাল পর্যন্ত বরিশাল বিভাগে এক দিনে ৩১ জনের মৃত্যু হয়েছে। আর এটিই বিভাগে এক দিনে সর্বোচ্চ মৃত্যুর রেকর্ড। মৃতদের মধ্যে ১৩ জন করোনা পজিটিভ ও ১৮ জন উপসর্গ নিয়ে মারা গেছেন। গত ২৪ ঘণ্টায় শনাক্ত হয়েছে ৭৯৮ জন।

রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালের করোনা ইউনিটে এক দিনে ১৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। গত রবিবার সকাল থেকে গতকাল সকালের মধ্যে তাদের মৃত্যু হয়। এর মধ্যে করোনা আক্রান্ত হয়ে সাত ও উপসর্গে নিয়ে আটজন মারা গেছেন। এ সময়ে নতুন করে করোনা শনাক্ত হয়েছে ২২২ জনের।

ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ (মমেক) হাসপাতালের করোনা ইউনিটে গত এক দিনে নতুন করে আরও ২৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে করোনায় আক্রান্ত হয়ে ৭ ও উপসর্গ নিয়ে ১৬ জন মারা গেছেন। গত ২৪ ঘণ্টায় ১ হাজার ৬১৭টি নমুনা পরীক্ষার বিপরীতে ৮৯৫ জনের শরীরে করোনা শনাক্ত হয়েছে।

কুষ্টিয়া ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট করোনা ডেডিকেটেড হাসপাতালে গত রবিবার সকাল ৮টা থেকে গতকাল সকাল ৮টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় ৯ জনের মৃত্যু হয়েছে। এ সময়ে ৪৮০ জনের শরীরে নতুন করে করোনাভাইরাস শনাক্ত হয়েছে। এ নিয়ে জেলায় মোট মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়াল ৫৭৬ জনে।

বগুড়ায় তিনটি হাসপাতালের করোনা ইউনিটে ২৬ জনের মৃত্যু হয়েছে। গত রবিবার সকাল ৮টা থেকে পরবর্তী ২৪ ঘণ্টায় তাদের মৃত্যু হয়। এর মধ্যে করোনা আক্রান্ত হয়ে ১৮ এবং উপসর্গ নিয়ে ৮ জন মারা গেছেন। এ সময়ে জেলায় ৪৭৮টি নমুনা পরীক্ষায় ১২৬ জনের করোনা শনাক্ত হয়েছে।

চট্টগ্রামে গত এক দিনে করোনা আক্রান্ত হয়ে ১১ জনের মৃত্যু হয়েছে। এ সময়ে নতুন করে ৯৮৫ জনের শরীরে করোনা শনাক্ত হয়েছে। এ নিয়ে চট্টগ্রামে করোনায় মোট আক্রান্ত হয়েছে ৮৩ হাজার ৮৭১ এবং মারা গেছেন ৯৮৪ জন।