অনলাইনে পণ্য বিক্রির প্রতিষ্ঠান ইভ্যালি তার দেনার পরিমাণ ও প্রতিষ্ঠানের আর্থিক বিবরণী প্রদানে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের কাছে আরও ছয় মাস সময় চেয়েছে। সম্প্রতি বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের দেওয়া কারণ দর্শানোর নোটিসের জবাবে এক চিঠিতে এ বাড়তি সময় চেয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। ওই চিঠিতে প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে, এখন থেকে বিপুল পরিমাণ ডিসকাউন্ট দিয়ে পণ্য বিক্রি বন্ধ রাখবে তারা। একই সঙ্গে পণ্য ডেলিভারির সব তথ্য প্রতি ১৫ দিন অন্তর মন্ত্রণালয়কে সরবরাহ করার কথাও জানিয়েছে ওই চিঠিতে।
ইভ্যালির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ রাসেল স্বাক্ষরিত চিঠিতে বলা হয়েছে, ইভ্যালির মোট সম্পদ, দেনার পরিমাণ, মার্চেন্টদের কাছে মোট দেনার পরিমাণ, মার্চেন্টদের কাছ থেকে চুক্তি অনুযায়ী ক্রেডিট লাইনের যাবতীয় বিবরণ প্রদান করতে ছয় মাস সময় লাগবে।
চিঠির বিষয়ে জানতে ইভ্যালির ব্যবস্থাপনা পরিচালকের সঙ্গে যোগাযোগ করা যায়নি। প্রতিষ্ঠানটির মিডিয়া উইংয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করলেও তারা কোনো বক্তব্য দিতে পারেননি। তবে ইভ্যালি নোটিসের জবাবে বলছে, গত ১৯ জুলাই কারণ দর্শানোর নোটিস পাই। এই নোটিসে ইভ্যালির অতীতের ব্যবসার কার্যপদ্ধতি এবং এর ফলশ্রুতিতে ব্যবসায়ের শুরু হতে উল্লিখিত ১৫ জুলাই পর্যন্ত গ্রাহকের বকেয়া পণ্য এখনো সরবরাহ করা হয়নি। সরবরাহকারীর কাছে মোট দেনার তথ্য এবং ভবিষ্যতে কীভাবে উক্ত অর্থ এবং পণ্য পরিশোধ করা হবে তার পরিকল্পনা সরবরাহ করতে বলা হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের গত ১৬ জুন প্রদত্ত প্রতিবেদন হতে আপনারা (বাণিজ্য মন্ত্রণালয়) ইতিমধ্যে জানতে পেরেছেন যে, বাংলাদেশ ব্যাংকের তদন্ত দল বিভিন্ন হিসাব ইভ্যালির কাছ থেকে চেয়েছিল, যা ওই সময়ে সময় স্বল্পতা এবং তাদের প্রদত্ত ফরম্যাট অনুযায়ী সম্পূর্ণরূপে সরবরাহ করা সম্ভব হয়নি। এরই ফলশ্রুতিতে প্রদত্ত তথ্যের ভিত্তিতে যে ঘাটতিগুলো উঠে এসেছে তা প্রকৃত চিত্র সম্পূর্ণ প্রকাশ করে না। এ অবস্থায় আমরা একটি তৃতীয় নিরপেক্ষ নিরীক্ষক দ্বারা আমাদের সম্পূর্ণ আর্থিক হিসাব বিবরণী এবং কোম্পানির ভ্যালুয়েশনসহ উপস্থাপন করার জন্য এবং উক্ত পত্রের দ্বিতীয় অধ্যায়ে বর্ণিত ২ এর ‘ক’ হতে ‘ঙ’ পর্যন্ত বিষয়ে কোম্পানির অবস্থান এবং সংশ্লিষ্ট তথ্যাদি উপস্থাপনের জন্য ন্যূনতম আরও ৬ মাস সময় প্রয়োজন।
চিঠিতে বলা হয়েছে, ইভ্যালির সবচেয়ে জনপ্রিয় ক্যাম্পেইন ‘সাইক্লোন’ যেখানে ভোক্তাদের কথা মাথায় রেখে বিভিন্ন পণ্যে প্রচুর ডিসকাউন্ট প্রদান করা হতো সেই ক্যাম্পেইন বন্ধ করা হয়। গত ২ জুলাই হতে ‘টি১০’ ক্যাম্পেইন শুরু করা হয়। এ ক্ষেত্রেও প্রতিটি পণ্যে ডিসকাউন্ট প্রদান করে যে বিক্রয় মূল্য নির্ধারণ করা হচ্ছে তা আমাদের ক্রয় মূল্যের তুলনায় বেশি বিধায় ‘টি১০’ ক্যাম্পেইনে ইভ্যালি লাভ করছে।
প্রতিষ্ঠানটি বলেছে, বর্তমানে ইভ্যালি ডিজিটাল কমার্স পলিসি ২০২০ (সংশোধিত) এবং ডিজিটাল কমার্স পরিচালনা নির্দেশিকা ২০২১ এর সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সব কার্যক্রম পরিচালনা করছে। এরই মধ্যে ১ হাজার কোটি টাকার একটি বিনিয়োগ চুক্তি সম্পাদন করেছি। যার মধ্যে প্রাথমিকভাবে ২০০ কোটি টাকা এবং পর্যায়ক্রমিকভাবে বাকি অর্থ বিনিয়োগ সম্পাদন করা হবে। বিনিয়োগকৃত এই অর্থ ইভ্যালির বর্তমান আলোচ্য ঘাটতি পুরোপুরি নিরসনে সহায়ক ভূমিকা রাখবে।
চিঠিতে বলা হয়, ইভ্যালি পূর্বের প্রতিশ্রুত পণ্যের ডেলিভারি ক্রমান্বয়ে সমাপ্ত করার সর্বাত্মক চেষ্টা করবে এবং প্রতি ১৫ দিন অন্তর ডেলিভারির অগ্রগতি সংক্রান্ত রিপোর্ট মন্ত্রণালয়ে পাঠাবে।
এর আগে ইভ্যালির চেয়ারম্যান শামীমা নাসরিন এবং ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মোহাম্মদ রাসেলের কাছে পাঠানো কারণ দর্শানোর নোটিসের সঙ্গে ছয়টি বিষয় আবশ্যিকভাবে জানানোর কথা বলা হয়েছিল।
তাতে বলা হয়েছিল, গ্রাহকের কাছ থেকে অগ্রিম অর্থ নিয়ে যথাসময়ে পণ্য সরবরাহ না করার পাশাপাশি মার্চেন্টদের কাছ থেকে পণ্য নিয়েও অর্থ পরিশোধ করছে না ইভ্যালি। এতে বিপুলসংখ্যক ক্রেতা এবং বিক্রেতার আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বলা হয়েছিল, গত ১৪ মার্চ পর্যন্ত গ্রাহক ও মার্চেন্টদের কাছে মোট ৪০৭ কোটি টাকা দায়ের বিপরীতে ইভ্যালির কাছে মাত্র ৬৫ কোটি টাকার চলতি সম্পদ কেন? বাকি টাকা ইভ্যালির কাছে থাকলে বিস্তারিত তথ্য দিতে হবে, না থাকলে দিতে হবে পরিপূর্ণ ব্যাখ্যা।
এছাড়া গত ১৫ জুলাই পর্যন্ত গ্রাহক ও মার্চেন্টদের কাছে দায় এবং তা পরিশোধের বর্তমান অবস্থা ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা, ব্যবসা শুরুর পর থেকে গ্রাহকদের কাছ থেকে ইভ্যালি কত টাকা নিয়েছে, মার্চেন্টদের কত টাকা পরিশোধ করেছে এবং প্রশাসনিক ও অন্যান্য খাতে কত ব্যয় করেছে, তার পূর্ণাঙ্গ বিবরণ জানানোর কথা বলা হয়েছিল। বর্তমান অবস্থা থেকে উত্তরণের পরিকল্পনা ও নীতিমালা এবং নির্দেশিকার সঙ্গে সামঞ্জস্যহীন ব্যবসা পদ্ধতি জানানোর কথাও বলা হয়েছিল ইভ্যালিকে।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের ডব্লিউটিও সেলের মহাপরিচালক ও অতিরিক্ত সচিব মো. হাফিজুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, এর আগে ইভ্যালিকে কারণ দর্শানোর নোটিস করা হয়েছিল। ইভ্যালি তার জবাব দিয়েছে। চিঠিতে তারা ছয় মাস সময় চেয়েছে। এছাড়া আরও ছয়টি বিষয়ে কোয়ারি ছিল, সেগুলোর ব্যাখ্যা দিয়েছে। আমরা এ চিঠির জবাব পর্যালোচনা করে দেখব। গ্রাহকদের স্বার্থে যেটা উত্তম হয়, মন্ত্রণালয় সে সিদ্ধান্তই নেবে।’