কাবার ইমাম শায়খ মাহির আল মুয়াইকিলি

কোরআনে কারিম তেলাওয়াতের মাধ্যমে বিশ্বে বিখ্যাত হয়েছেন অনেকেই। এ তালিকায় পবিত্র কাবার ইমাম শায়খ ড. মাহির বিন হামাদ বিন মুয়াক্বল আল মুয়াইকিলি অন্যতম। মসজিদে হারামের এই খতিব, ইসলামি স্কলার ও শিক্ষাবিদ হিসেবেও বিশ্বে ব্যাপকভাবে সমাদৃত। তিনি শায়খ মাহির আল মুয়াইকিলি নামে বেশি পরিচিত। চমৎকার উচ্চারণ আর অনবদ্য তেলাওয়াতে মুগ্ধ কোরআনপ্রেমীরা। নিয়মিত পবিত্র কাবা প্রাঙ্গণে জুমার খুতবা দেওয়াসহ তিনি নিয়মিত বিভিন্ন ওয়াক্তের নামাজের ইমামতি করেন। গত হিজরি সনে (১৪৪১ হিজরি) শায়খ মাহির মসজিদে হারামে ফজরের নামাজ ২১ দিন, জোহর ৩৬ দিন, আসর ৭৭ দিন, মাগরিব ৯৮ দিন, ইশা ৭২ দিন এবং ৭ দিন জুমার ইমামতি করেছেন।

জুমার নামাজের আগে দেওয়া শায়খ মাহিরের প্রদত্ত খুতবায় দিক-নির্দেশনাপূর্ণ আলোচনা শুনে নিজেদের পাথেয় সংগ্রহ করেন অনেকেই। হজ কিংবা ওমরাহ পালন করতে আসা বিশ্বের নানা প্রান্তের মুসলিমদের কাছে তিনি সুন্দর তেলাওয়াত ও খুতবার জন্য পরিচিত।

শায়খ মাহির ১৯৬৯ সালের ৭ নভেম্বর মদিনা নগরীর আল ওয়াজাহ নামক এলাকায় জন্মগ্রহণ করেছেন। অবশ্য তার মা-বাবা লোহিত সাগর তীরে সৌদির ইয়ানবু শহর থেকে সেখানে বসবাস শুরু করেন। মদিনা নগরীতে শৈশব ও কৈশোরের এক বর্ণাঢ্য জীবন কাটিয়েছেন তিনি। ধার্মিক পরিবারে বড় হওয়ায় ইসলামি অনুশাসনের পাশাপাশি ছোটবেলা থেকে পবিত্র কোরআন পাঠে অত্যধিক গুরুত্বারোপ করেন এবং খুব কম বয়সেই হেফজ শেষ করেন।

শায়খ মাহির মদিনা নগরীর টিচার্স ট্রেনিং কলেজে পড়াশোনা করেন। এরপর গণিতের শিক্ষক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। গণিতের জটিল অঙ্ক বুঝিয়ে ব্যাপক সুনাম কুড়ান। পাশাপাশি মদিনার বিভিন্ন মসজিদে ইমাম হিসেবে দায়িত্ব পালন করতেন। তাই তাকে নিয়মিত পবিত্র কোরআন তেলাওয়াতের চর্চা করতে হতো। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি চার সন্তানের জনক।

শায়খ মাহির মক্কা নগরীর বালাদ আশ শুহাদা স্কুলে শিক্ষকতা শুরু করেন। জনপ্রিয় বক্তা ও ইসলামের প্রচারক হিসেবে ব্যাপকভাবে সবার কাছে সমাদৃত। তিনি মক্কার প্রিন্স আবদুল মাজিদ স্কুলের স্টুডেন্টস কাউন্সিলর হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। মক্কার আবদুর রহমান আস সায়িদি মসজিদের ইমাম ছিলেন কিছুদিন।

শায়খ মাহির ২০০৪ সালে উম্মুল কুরা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ফিকাহ (ইসলামি আইনশাস্ত্র) বিষয়ে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন। স্নাতকোত্তরে তিনি ‘ইমাম আহমদ বিন হাম্বল (রহ.) -এর ফিকাহ চর্চা’ বিষয়ে গবেষণা করেন। ২০১২ সালে তিনি উম্মুল কুরা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি অর্জন করেন। পিএইচডি ডিগ্রিতে বিচার ও দণ্ডবিধি বিষয়ে ইমাম আল শিরাজি (রহ.) লিখিত ‘তুহফাতুন নাবিহ শরহুত তানবিহ’ বইয়ের একটি ব্যাখ্যাগ্রন্থ রচনা করেন।

একই সময় শায়খ মাহির উম্মুল কুরা বিশ্ববিদ্যালয়ের জুডিশিয়াল স্টাডিজ বিভাগের সহকারী অধ্যাপক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। এ ছাড়া উচ্চতর শিক্ষা ও গবেষণা বিভাগের সহকারী পরিচালকের দায়িত্ব পালন করেন। আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় সুললিত কণ্ঠে পবিত্র কোরআনের তেলাওয়াতের মাধ্যমে তিনি বিশ্বব্যাপী পরিচিতি পান।

শায়খ মাহির দুবছর মসজিদে নববিতে তারাবির নামাজের ইমামতি করেন। এরপর ২০০৬ সাল থেকে দুবছর তিনি ইমাম হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। ২০০৮ সালে তিনি মক্কার মসজিদে হারামে শায়খ আবদুর রহমান আল সুদাইসের সঙ্গে তারাবির নামাজের ইমামতি করেন। ওই বছরই তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে মসজিদে হারামের ইমাম হিসেবে নিয়োগ পান। প্রায় সময় তিনি ফজর ও মাগরিবের নামাজে ইমামতি করেন।

শায়খ মাহিরের মা পাকিস্তানি বংশোদ্ভূত নারী। পাকিস্তানি নারীকে বিয়ে করায় গোত্রের লোকেরা তার বাবা হামাদকে তিরস্কার করে। কিন্তু ওই পাকিস্তানি নারীর সব সন্তানই পরবর্তী সময়ে পবিত্র কোরআনের হাফেজ হন। এমনকি শায়খ মাহির পবিত্র কাবার ইমাম নিযুক্ত হওয়ার পর তার গোত্রের লোকেরা তাকে নিয়ে গর্ববোধ করতে থাকে। নম্র-ভদ্র এবং অমায়িক ব্যবহারের জন্য শায়খ মাহির সর্বমহলে ব্যাপকভাবে প্রশংসিত।