হাসেম ফুডে নিহত স্বজনদের ক্ষোভ

মালিকরা ফিরে পান কারখানা আমরা পাই কয়লা হওয়া লাশ

নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জের কর্নগোপ এলাকার সজীব গ্রুপের অঙ্গ-প্রতিষ্ঠান হাসেম ফুড কারখানায় অগ্নিকাণ্ডে পুড়ে কয়লা হওয়া শ্রমিকদের মধ্যে ২৪ জনের লাশ হস্তান্তর করা হয়েছে। ঘটনার ২৬ দিন পর গতকাল বুধবার দুপুর ২টার দিকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের (ঢামেক) মর্গ থেকে স্বজনদের কাছে লাশগুলো হস্তান্তর করা হয়। এসময় নিহত শ্রমিকদের স্বজনদের কান্না আর আহাজারিতে ভারী হয়ে ওঠে মর্গ এলাকার বাতাস। কাঠের কফিনে স্বজনের পোড়া লাশ দেখে অনেকেই অচেতন হয়ে পড়েন। কারও কারও মধ্যে স্বজন হারানোর বেদনা ক্ষোভ হয়ে প্রকাশিত হয় এ সময়। কাউকে বলতে শোনা যায়, ‘আগুন লাগলে মালিকরাতো ঠিকই বের হতে পারেন, শ্রমিকরা পারেন না। তারা ঠিকই কারখানা ফিরে পান, আর শ্রমিকদের স্বজনরা পান কয়লা হওয়া লাশ।’

হাসেম ফুড কারখানায় ভয়াবহ আগুনে পুড়ে কয়লা হওয়া ৪৮টি লাশের মধ্যে ৪৫টির পরিচয় শনাক্ত করেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। এর থেকেই ঢামেকে থাকা ২৪ লাশ গতকাল হস্তান্তর করা হয়। শনাক্ত হওয়া বাকি লাশগুলো হস্তান্তর করা হবে আগামী শনিবার। আর এখনও যে তিনটি লাশের পরিচয় শনাক্ত হয়নি সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত হবে পরে। 

সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার (ফরেনসিক) রুমানা আক্তার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আগুনে পোড়া ৪৮টি লাশের পরিচয় শনাক্ত করতে নিহতদের পরিবারের ৬৬ জনের ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করা হয়। ডিএনএ মিলিয়ে ৪৫ জনের লাশ শনাক্ত করেছি। এখনো তিনটি লাশের ডিএনও প্রোফাইলিংয়ের কাজ চলমান আছে। খুব দ্রুতই ডিএনএ প্রোফাইলিংয়ের কাজ সম্পন্ন হবে।’

গতকাল যে ২৪টি লাশ হস্তান্তর করা হয়েছে তার মধ্যে আছে, নোয়াখালীর এনায়েত হোসেনের ছেলে মো. আয়াত হোসেন (১৯), গাইবান্ধার হাসানুজ্জামানের মেয়ে নুসরাত জাহান টুকটুকি, নেত্রকোনার কবির মিয়ার মেয়ে হিমা আক্তার, নেত্রকোনার আজমত আলীর মেয়ে তাকিয়া আক্তার, নরসিংদীর জসিম উদ্দিনের মেয়ে রিয়া আক্তার (৩০)। পাবনার শাহাদত খানের ছেলে মোহাম্মদ আলী, কিশোরগঞ্জের নিজাম উদ্দিনের মেয়ে সাহানা আক্তার (১৮), একই জেলার খোকনের স্ত্রী জাহানারা বেগম (৩৮), ঝর্না আক্তারের মেয়ে ফারজানা (১৪), সুজনের মেয়ে ফাতেমা আক্তার (১৫), গিয়াস উদ্দিনের ছেলে মুন্না (১৬), স্বপন মিয়ার মেয়ে সাগরিকা সায়লা, আব্দুল কাইয়ুমের মেয়ে খাদিজা আক্তার (১৬), মাহতাব উদ্দিনের স্ত্রী সাহানা আক্তার (৪৪), তাহের উদ্দিনের ছেলে নাঈম ইসলাম, নারায়ণগঞ্জের বেলাল হোসেনের মেয়ে মিতু আক্তার, একই জেলার সুমাইয়া আক্তারের মা ফিরোজা (৩৬), বগুড়ার নয়ন মিয়ার মেয়ে নাজমা খাতুন, হবিগঞ্জের আব্দুল মান্নানের মেয়ে ইসরাত জাহান তুলী, ডেমরার নাজমুল হোসেনের মা নাজমা বেগম (৩৫), নোয়াখালীর আবুল কাসেমের ছেলে রাশেদ (২৫), একই জেলার বাশারের ছেলে তারেক জিয়া (১৫), ভোলার কবির হোসেনের ছেলে রাকিব হোসেন (২১) এবং গাজীপুরের লিলি বেগমের ছেলে রিপন মিয়া (১৮)।

রিপনের লাশ নিতে এসেছিলেন তার বড় ভাই ইসমাইল হোসেন। ইসমাইল জানান, রিপনের এবারের মাধ্যমিক (এসএসসি) পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করার কথা ছিল। করোনা ও লকডাউনের প্রভাবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় কাজ করতে গিয়েছিলেন কর্ণগোপ এলাকার হাসেম ফুডে।

 বাগেরহাট মোরেলগঞ্জ উপজেলার সানকি ভাঙা গ্রামের আফজাল হোসেনের স্ত্রী নাজমা বেগম আগুনে পুড়ে মারা যান। তিনি দুই সন্তানকে নিয়ে থাকতেন রূপগঞ্জের হাসেম ফুডস কারখানার পেছনের এলাকায়।

গতকাল বুধবার তার লাশ নিতে আসেন পরিবারের সদস্যরা। এসময় আহাজারি করতে দেখা যায় তার বড় বোন মমতাজ বেগমকে।

তিনি বলেন, ‘আগুন লাগলেই দেখি শ্রমিকরা আটকা পড়ে, পুইড়া মারা যায়। কিন্তু মালিকরা ঠিকই বাইরাইয়া আসে। শ্রমিকরা আসতে পারে না ক্যান? তাদেরও তো ছেলেমেয়ে আছে, তারা কার কাছে যাইব। মালিক তো জেল থেকে ছাড়া পাইল, সে এখন শ্রমিকগোরে ফিরাই দিক।’

এতদিন পর মায়ের লাশ বুঝে পাওয়ার পর সাহানা আক্তারের ছেলে জাকির বলেন, এতগুলো মানুষ মারার পরও মালিকরে ছাইড়া দিলো, এত মানুষ মরার পরও মালিক কেমনে জামিন পায়, মনরে কীভাবে সান্ত¡না দেব। আমরা টাকা-পয়সা জরিমানা কিছু চাই না। আমরা মালিকের বিচার চাই। তার বিচার হলেই আমরা মনকে একটু সান্ত¡না দিতে পারব।

এদিকে নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে হাসেম ফুডস কারখানায় অগ্নিকাণ্ডের ঘটনাটি বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিট থেকে ঘটেছে। বুধবার দুপুরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল মর্গে নিহতদের লাশ পরিবারের কাছে হস্তান্তরের সময় এ কথা জানান সিআইডির অ্যাডিশনাল ডিআইজি ইমাম হোসেন।

অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় আসামি জামিনে রয়েছেন। এতে ঘটনা তদন্তে কোনো ব্যাঘাত ঘটবে কিনাএমন প্রশ্নের জবাবে সিআইডির এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, জামিনের বিষয়টি সম্পূর্ণ বিচার বিভাগীয় এখতিয়ার। তবে এখানে আমরা আমাদের কাজ করে যাচ্ছি। আগুন লাগার কারণ কী তা আমরা তদন্তে খুঁজে পেয়েছি।  বৈদ্যুতিক উৎস থেকে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে বলে আমরা তদন্তে পেয়েছি। খুব দ্রুত আমরা তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে পারব বলে আশা করছি। এ ঘটনায় কারও অবহেলা ছিল কিনা তা তদন্তে আরও সময় লাগবে।

এদিকে নারায়ণগঞ্জে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (শিক্ষা ও আইসিটি) এসএম মাহফুজুর রহমান বলেন, জেলা প্রশাসকের পক্ষ থেকে ২৪টি লাশের জন্যই পরিবারের কাছে দাফনকাফনের জন্য ২৫ হাজার টাকা করে সহায়তা দেওয়া হয়েছে।