২২ শ্রাবণ রবীন্দ্র প্রয়াণ দিবস। বাংলাদেশের আর্থসামাজিক পরিবেশে, বাঙালির রাজনৈতিক অর্থনীতির আঙিনায় এখনো রবীন্দ্রনাথ খুবই প্রাসঙ্গিক। পরাধীন ভারতবর্ষে স্বাধিকার ও স্বয়ম্ভরতা অর্জনের আকাক্সক্ষায় সমকালে রবীন্দ্রনাথ ছিলেন অসম্ভব ধরনের অগ্রগামী। রবীন্দ্রভাবনায় বাঙালির আত্মশক্তির বিকাশ, অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতা লাভের উপায়, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সমবায়, কৃষিব্যবস্থাপনায় অবকাঠামোগত উন্নয়নের বিষয় বারবার ফিরে এসেছে। শিল্পবিপ্লবের বিপুল বিস্তারে গড়ে ওঠা নগর জীবনের যান্ত্রিকতার বহরে পল্লী তার সব শ্রী হারাতে বসেছে এটা দেখে তিনি বিচলিত হয়েছিলেন। রবীন্দ্রনাথ অনুভব করেছিলেন কেবল এক শ্রেণির মানুষ অর্থনৈতিক সম্পদে সমৃদ্ধ হলে বা কেবল শহরকেন্দ্রিক উন্নয়ন হলে দেশের উন্নতি হয় না। প্রয়োজন দেশের সামগ্রিক উন্নতির। পল্লীবাসীরা অর্থনৈতিক অধিকার থেকে বঞ্চিত থাকলে দেশের যথাযথ উন্নতি হয়েছে বলে তিনি মানতেন না। বেশ কিছুকাল আগে থেকেই বোঝা যাচ্ছিল সামাজিক ও মানবিক মূল্যবোধ সভ্যতা সংস্কৃতির নান্দীপাঠে নানান পরিবর্তনের ধারায়, পুঁজিবাদী বিশে্বর আশকারাতে দেশে দেশে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির স্বপ্ন ও বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া পদ্ধতি দ্রুতলয়ে পাল্টাচ্ছে, পাল্টাচ্ছে দৃষ্টি ও মনোভঙ্গিও।
আজকের দুনিয়ায় করোনা মহামারীর কালে সেসব পরিবর্তন আরও বহুমুখী ধারায় দৃশ্যমান হয়ে উঠছে। করোনার ভয়াল সংক্রমণ বাংলাদেশে কিছুদিন আগ পর্যন্তও নগর ও শহরাঞ্চলে সীমিত ছিল। ইদানীং করোনা গ্রামীণ সমাজ ও অর্থনীতির অন্দরমহলেও প্রবেশ করে ফেলেছে।
‘ছিন্নপত্র’-এর ৩৮ সংখ্যক চিঠিতে রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন; ‘‘আমার বোধহয় কলকাতা ছেড়ে বেরিয়ে এলেই মানুষের নিজের স্থায়িত্ব এবং মহত্ত্বের উপর বিশ্বাস অনেকটা হ্রাস হয়ে আসে। এখানে মানুষ কম এবং পৃথিবীটাই বেশি; চারিদিকে এমন সব জিনিস দেখা যায় যা আজ তৈরী করে কাল মেরামত করে পরশু দিন বিক্রি করে ফেলবার নয়, যা মানুষের জন্মমৃত্যু ক্রিয়াকলাপের মধ্যে চিরদিন অটলভাবে দাঁড়িয়ে আছে, প্রতিদিন সমানভাবে যাতায়াত করছে এবং চিরকাল অবিশ্রান্ত ভাবে প্রবাহিত হচ্ছে। পাড়াগাঁয়ে এলে আমি মানুষকে স্বতন্ত্র মানুষ ভাবে দেখিনে। যেমন নানা দেশ দিয়ে নদী চলেছে, মানুষের স্রোতও তেমনি কলরব সহকারে গাছপালা গ্রাম নগরের মধ্যে দিয়ে এঁকে বেঁকে চিরকাল ধরে চলেছে এ আর ফুরোয় না।’’
নাগর নদীর ঘাট কালিগ্রাম থেকে ৬ ডিসেম্বর ১৮৯৫ তারিখে লেখা ‘ছিন্নপত্র’-এর শেষ চিঠিতে আমরা অবহিত হই এই ভূখ-ের প্রকৃতি ও মানুষ নিয়ে রবীন্দ্রনাথের ভাবনার অন্ত ছিল না। তিনি মানুষের সামাজিক অবস্থানের কথা ভেবেছেন প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের পটভূমিতে, রাষ্ট্রব্যবস্থার পটভূমিতে এবং একই সঙ্গে শাস্ত্রের পটভূমিতেও।
১৮৯৫ সালের ২০ সেপ্টেম্বর দীঘাপতিয়ার জলপথে যাওয়ার পথে রবীন্দ্রনাথ দেখেন প্রবল বন্যায় ভেসে গেছে দেশ। দুর্দশাগ্রস্ত হয়ে পড়েছে মানুষের জীবন। তিনি লিখেছেন ‘‘গৃহস্থের মেয়েরা ভিজে শাড়ি গায়ে জড়িয়ে বাদলার ঠা-া হাওয়ায় বৃষ্টির জলে ভিজতে ভিজতে হাঁটুর উপর কাপড় তুলে জল ঠেলে ঠেলে সহিষ্ণু জন্তুর মতো ঘরকন্নার নিত্যকর্ম করে যায় তখন সে দৃশ্য কোন মতেই ভালো লাগে না। ঘরে ঘরে বাত ধরেছে, পা ফুলছে, সর্দি হচ্ছে, জ্বরে ধরেছে, পিলেওয়ালা ছেলেরা অবিশ্রাম কাঁদছে, কিছুতেই কেউ তাদের বাঁচাতে পারছে না এত অবহেলা অস্বাস্থ্য অসৌন্দর্য দারিদ্র্য মানুষের বাসস্থানে কি এক মুহূর্ত সহ্য হয়! সকল রকম শক্তির কাছে আমরা হাল ছেড়ে দিয়ে বসে আছি। প্রকৃতি উপদ্রব করে তাও সয়ে থাকি, রাজা উপদ্রব করে তাও সই, শাস্ত্র চিরদিন ধরে যে-সকল উপদ্রব করে আসছে তার বিরুদ্ধেও কথাটি বলতে সাহস হয় না।’’
একবার ভেবে দেখুন, সোয়া শত বছর আগে রবীন্দ্রনাথের এই লেখা এবং তার চিত্রিত দুরবস্থার উপস্থিতি এই করোনা মহামারীর কালেও কী ভীষণ প্রাসঙ্গিক মনে হয়।
এসব উপলব্ধির আলোকে আমজনতার উন্নয়নের জন্য অনেকগুলো উপায় উপলক্ষ আয়োজনের মধ্যে সমবায়ই গ্রামীণ অর্থনীতিতে প্রাণসঞ্চারের সর্বোত্তম উপায় হিসেবে প্রতিভাত হয় রবীন্দ্রনাথের কাছে। তিনি চেয়েছেন সবার সহযোগে সার্বিক উত্থান। কারও সম্পদ কেড়ে নিয়ে নয়, কাউকে ছোট করে নয়। তিনি মনে করতেন সেভাবে এগোলে বাস্তবে সঞ্চয়, বিনিয়োগ ও ব্যবস্থাপনায় তাৎক্ষণিক সংকটের আশঙ্কা প্রবল হয়ে উঠবে। অবকাঠামো যেখানে দুর্বল, প্রায় অস্তিত্বহীন, সেখানে একে অমূল্য বলা যায় না। তার আবেদন তাই স্থানীয় শিক্ষিত ও সম্পন্ন জনসমুদয়ের হৃদয়ানুভূতির কাছে তারা যেন আপন আপন গ্রাম থেকে মুখ ফিরিয়ে না রাখেন। সমবায় কাজে তারাও যেন যোগ দেন। অর্থ-বিত্ত-চিত্ত দিয়ে তারা যেন উৎপাদন ও উন্নয়নমুখী প্রতিষ্ঠান করে গড়ে তোলেন। ধনবৈষম্যকে রবীন্দ্রনাথ কখনো প্রশ্রয় দেননি।
১৯৩৪ সালে শ্রীনিকেতনের বার্ষিক উৎসবে ‘উপেক্ষিত পল্লী’ শীর্ষক ভাষণে তিনি দ্ব্যর্থহীন ভাষায় বলেন, ‘‘বর্তমান সভ্যতায় দেখি এক জায়গায় একদল মানুষ উৎপাদনের চেষ্টায় নিজের সমস্ত শক্তি নিয়োগ করেছে, আর এক জায়গায় আর একদল মানুষ স্বতন্ত্র থেকে সেই অন্নে প্রাণধারণ করে। চাঁদের যেমন একপিঠে অন্ধকার, অন্য পিঠে আলো এ সেই রকম। একদিকে দৈন্য মানুষকে পঙ্গু করে রেখেছে, অন্যদিকে ধনের সন্ধান, ধন অভিযান, ভোগবিলাস সাধনের প্রয়াসে মানুষ উন্মত্ত। অন্নের উৎপাদন হয় পল্লীতে আর অর্থের সংগ্রহ চলে নগরে। অর্থ উপার্জনের সুযোগ ও উপকরণ যেখানেই কেন্দ্রীভূত, স্বভাব সেখানেই আরাম আরোগ্য ও শিক্ষার ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়ে অপেক্ষাকৃত অল্পসংখ্যক লোককে ঐশ্বর্যের আশ্রয় দান করে। পল্লীতে সেই ভোগের উচ্ছিষ্ট যা কিছু পৌঁছায়, তা যৎকিঞ্চিৎ। এই বিচ্ছেদের মধ্যে যে সভ্যতা বাসা বাঁধে তা বেশিদিন টিকতেই পারে না।’’
বলাবাহুল্য সার্ধশতবর্ষ পরেও, স্বাধীন সার্বভৌম দেশে ও সমাজে দারিদ্র্য, সংকোচের বিহ্বলতায় নিজের অপমানের অবস্থায়, দেখি বৈষম্য বরং বহাল তবিয়তে, বেশ কিছুটা আটঘাট বেঁধে বিদ্যমান।
দ্বারিক বিশ্বাস নামের একজন দোষী প্রজার বিরুদ্ধে ম্যানেজার জানকীনাথ রায়ের শাস্তির প্রস্তাব বিষয়ে নমনীয় থাকার পরামর্শ দিয়ে কবি লিখেছেন, ‘‘স্বার্থরক্ষার জন্য প্রবল ব্যক্তিও স্বভাবত চাতুরী অবলম্বন করিয়া থাকে। সে স্থানে দুর্বল পক্ষের বেলায় চাতুরী দেখা গেলে আমরা যে রাগ করি সে চাতুরীর প্রতি রাগ নহে, দুর্বলের প্রতিই রাগ। কারণ এই দ্বারিক বিশ্বাসই চতুরতার দ্বারা আমাদের কোনো কাজ উদ্ধার করিলে প্রশংসা ও পুরস্কারের পাত্র হয়। এমন স্থলে নিজের স্বার্থসাধনের উদ্দেশ্যে চাতুরী প্রয়োগ দেখিলে আমাদের রাগ করিবার কারণ নাই। আমার প্রজারা নিজের বৈষয়িক স্বার্থরক্ষার জন্য যখন তখন চতুরতা করে আমার মনে তখন রাগ হয় না। তাহাদের বেদনা ও ব্যাকুলতা বুঝিবার আমি চেষ্টা করি। তোমরা যেটা কর্তব্য বোধ করিবে, তাহাই করিবে। কেবলমাত্র দন্ড দিবার জন্য কিছুই করিবে না। দ্বারিক বিশ্বাস যদি প্রবল হইত তবে সে আমাকে দ- দিবার চেষ্টা করিত। আমি দৈবক্রমে প্রবল হইয়াছি বলিয়াই যে ক্রোধ পরিতৃপ্তির জন্য তাহাকে দন্ড দিব এবং সে তাহা অগত্যা বহন করিবে, এ আমি সংগত মনে করি না।’’
গ্রামীণ চাষিসমাজের সবচেয়ে বড় সমস্যা মহাজনের কাছ থেকে টাকা ধার নেওয়া। চড়া সুদে এই ধার তারা ফেরত দিতে না পেরে সর্বস্বান্ত হতো। এই সমস্যার হাত থেকে পরিত্রাণের জন্য কবি গ্রামীণ ব্যাংকও প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, কিন্তু সীমিত মূলধনের সে-ব্যাংক চাষিদের খুব বেশি ঋণ দিতে সক্ষম ছিল না। ১৯১৩ সালে নোবেল প্রাইজের এক লাখ আট হাজার টাকা পতিসর কৃষি ব্যাংকে ডিপোজিট করা হয় শান্তিনিকেতন বিদ্যালয়ের নামে। এতে বিদ্যালয়েরও কিছু আর্থিক সুবিধা হলো আর কৃষিজীবীদের ঋণের পরিমাণও কিছুটা বেড়ে গেল। পরে অবশ্য ‘রুরাল ইনডেটেড’ সংক্রান্ত আইন পাস হওয়ার পর প্রজাদের ধার দেওয়া টাকা আদায়ের পথে নানা প্রতিবন্ধকতা তৈরি হয়।
কৃষি ব্যাংক নোবেল প্রাইজের আসল টাকা বিশ্বভারতীকে আর ফেরত দিতে পারেনি।
১৩০০ বঙ্গাব্দের ২৩ ফাল্গুন রামপুর বোয়ালিয়ায় বসে রবীন্দ্রনাথ লিখলেন তার সেই অমর কবিতা ‘এবার ফিরাও মোরে’। যেখানে নগর সভ্যতার স্ফীতমেদ মাদকতার বিভ্রান্তি থেকে মূঢ় মলিন মুখ অবহেলিত আমজনতার কাতারে শামিল হওয়ার জন্য সেখানে ফিরে যাওয়ার তার আকুতি পেল প্রকাশ। ইচ্ছা প্রকাশের সেই কবিতা রচনার ১২৮ বছর পর রবীন্দ্রনাথকে এখনো আমাদের চেতনায় আলোড়ন তোলার অবকাশে পাই এজন্য যে সাধারণ আর অসাধারণে, নগর ও গ্রামীণ জীবন যাপনে, সার্বিক দূরত্ব বাড়ছে বই কমছে না। শোষণ-বঞ্চনার অবসান প্রত্যাশা পূরণে প্রতিশ্র“তি ক্রিয়া প্রক্রিয়ায় প্রচুর পরিবর্তন এলেও ব্যবধান বিস্তৃত হয়েছে। ভেদবুদ্ধির বিকারসমূহ শান্তির সুবাতাসকে বিষাক্ত করে তুলছে। অনেক উন্নতি সত্ত্বেও অবনতির খতিয়ান প্রসারিত হচ্ছে।
করোনাকালে সমাজ দেশ ও অর্থনীতিতে যে অস্থিরতা বিরাজ করছে, গ্রামীণ অর্থনীতিতে ঘূর্ণিঝড়, বন্যা, প্রাকৃতিক দুর্যোগ যেভাবে তার শান্ত ও শান্তিময় পরিবেশকে বিপন্ন করে চলেছে সেখানে রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে সঙ্গে আমাদেরও ‘এবার ফিরাও মোরে’র আকিঞ্চন আকাক্সক্ষায় উদ্বেলিত হওয়ার প্রয়োজনীয়তা অসংগত মনে হয় না।
লেখক সরকারের সাবেক সচিব এবং এনবিআর-এর প্রাক্তন চেয়ারম্যান
mazid.muhammad@gmail.com