শুধু একাডেমিক নেতৃত্বের প্রশ্ন নয়

আপডেট : ১২ আগস্ট ২০২৬, ০১:৩৯ এএম

বাংলাদেশ শিশু একাডেমির মহাপরিচালক পদটি নিছক প্রশাসনিক পদ নয়। এটা দেশের শিশুদের সাহিত্য, সংস্কৃতি, সৃজনশীলতা, কল্পনাশক্তি ও বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশের জাতীয় প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্বের দায়িত্ব। ফলে এই পদে কে থাকবেন, সেটা কেবল একজন কর্মকর্তার নিয়োগের প্রশ্ন নয়, এর মধ্য দিয়ে রাষ্ট্র শিশুদের এবং তাদের সাংস্কৃতিক বিকাশকে কতটা গুরুত্ব দেয়, তারও বার্তা প্রকাশ পায়। এখন বাংলাদেশ শিশু একাডেমির মহাপরিচালকের দায়িত্বে আছেন প্রশাসন ক্যাডারের একজন যুগ্মসচিব পদমর্যাদার কর্মকর্তা। এর আগে এই পদে অতিরিক্ত সচিব পদমর্যাদার প্রশাসনিক কর্মকর্তাও দায়িত্ব পালন করেছেন। ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে প্রতিষ্ঠানটির নেতৃত্ব প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তাদের হাতেই রয়েছে।

প্রশ্নটি কোনো ব্যক্তি বা কোনো ক্যাডার সম্পর্কে নয়। প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তারা রাষ্ট্র পরিচালনার অপরিহার্য অংশ এবং তাদের প্রশাসনিক দক্ষতার প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য। তবে প্রশ্ন হলো বিশেষায়িত একটি সাংস্কৃতিক ও শিশুবিকাশমূলক প্রতিষ্ঠানের সর্বোচ্চ নেতৃত্বের জন্য রাষ্ট্র কি শুধু প্রশাসনিক দক্ষতাকেই প্রধান যোগ্যতা হিসেবে বিবেচনা করবে, নাকি প্রতিষ্ঠানের মূল কাজের সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত অভিজ্ঞতাকেও গুরুত্ব দেবে! শিশুদের সাহিত্যচর্চা, শিল্পবোধ, সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচয়, বিজ্ঞানমনস্কতা, সৃজনশীলতা, কল্পনাশক্তি ও মানবিক মূল্যবোধের বিকাশ এ সবই বাংলাদেশ শিশু একাডেমির কাজের কেন্দ্রে আছে। শিশুদের পাঠাভ্যাস গড়ে তোলা, নাটক, সংগীত, চিত্রাঙ্কন, বিজ্ঞানচর্চা ও বিভিন্ন সৃজনশীল কর্মকাণ্ডে যুক্ত করা এবং দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের শিশুদের সাংস্কৃতিক অংশগ্রহণের সুযোগ তৈরি করা এর জাতীয় দায়িত্বের অংশ। অতএব শিশু একাডেমির সাফল্য শুধু কয়টি প্রকল্প বাস্তবায়িত হলো, কত টাকা ব্যয় হলো কিংবা কতগুলো অবকাঠামো নির্মিত হলো তা দিয়ে মাপা যায় না। আরও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, কতজন শিশু বই পড়ছে! কতজন শিশু গ্রন্থাগারের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে প্রান্তিক অঞ্চলের শিশুরা কতটা সাংস্কৃতিক সুযোগ পাচ্ছে! মানসম্মত নতুন শিশুসাহিত্য ও অনুবাদ কতটা হচ্ছে! কতজন শিশু বিজ্ঞান, সংগীত, নাটক, চিত্রকলা কিংবা অন্যান্য সৃজনশীল কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে!

এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতে হলে শিশুর মনোজগৎ, সাহিত্য, সংস্কৃতি ও সৃজনশীল বিকাশ সম্পর্কে গভীর অভিজ্ঞতা প্রয়োজন। একজন প্রশাসক দক্ষতার সঙ্গে প্রতিষ্ঠান চালাতে পারেন, তবে একজন শিশুসাহিত্যিক, শিক্ষাবিদ বা শিশু-সংস্কৃতি বিশেষজ্ঞ প্রতিষ্ঠানটিকে কোন দিকে নিয়ে যেতে হবে, সেই প্রশ্নে অধিকতর বিষয়ভিত্তিক দৃষ্টিভঙ্গি দিতে পারেন। দুই ধরনের দক্ষতারই প্রয়োজন আছে, তবে নেতৃত্বের জায়গায় কোনটিকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে, সেটাই নীতিগত প্রশ্ন। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, বাংলাদেশ শিশু একাডেমির আইনেও মহাপরিচালক পদটি শুধু প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তাদের জন্য নির্ধারিত নয়। সরকার চাইলে যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে একজন স্বীকৃত শিশুসাহিত্যিক, শিক্ষাবিদ, সংস্কৃতিজন, শিশু অধিকারকর্মী বা শিশু বিকাশ বিশেষজ্ঞকে এই দায়িত্ব দিতে পারে। ফলে এটা কোনো আইনি বাধ্যবাধকতার প্রশ্ন নয়, রাষ্ট্রের নিয়োগদর্শন ও অগ্রাধিকারের প্রশ্ন। বর্তমান বাস্তবতায় এ ধরনের নেতৃত্বের প্রয়োজন আরও বেশি। মোবাইল ফোন, ডিজিটাল বিনোদন ও সামাজিক মাধ্যম শিশুদের অবসর ও মনোযোগের ধরন বদলে দিয়েছে। বই পড়ার অভ্যাস নানা প্রতিযোগিতার মুখে পড়েছে। একই সঙ্গে শহর ও গ্রামের শিশুদের সাংস্কৃতিক সুযোগের ব্যবধানও বড়। অনেক শিশুর কাছে মানসম্মত বই, গ্রন্থাগার, সংগীত, নাটক, চিত্রকলা কিংবা বিজ্ঞানচর্চার সুযোগ এখনো সহজলভ্য নয়। ফলে শিশু একাডেমির সামনে এখন শুধু নিয়মিত কর্মসূচি চালিয়ে যাওয়ার দায়িত্ব নেই, জাতীয় পর্যায়ে পাঠাভ্যাস ও সাংস্কৃতিক চর্চার নতুন পরিবেশ তৈরির চ্যালেঞ্জও আছে। প্রয়োজন মানসম্মত শিশুসাহিত্য প্রকাশ ও অনুবাদে উৎসাহ, জেলা-উপজেলায় শিশুদের সাংস্কৃতিক কার্যক্রম শক্তিশালী করা, গ্রন্থাগারকে শিশুদের কাছে আকর্ষণীয় করে তোলা, বিজ্ঞান ও সৃজনশীল চর্চার সুযোগ বাড়ানো এবং সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের মূলধারায় নিয়ে আসা।

এসব উদ্যোগের জন্য শুধু প্রশাসনিক পরিকল্পনা যথেষ্ট নয়, প্রয়োজন শিশুদের মন ও সংস্কৃতির ভাষা বোঝে এমন নেতৃত্ব। এমন নেতৃত্ব শিশুকে কেবল কোনো সরকারি কর্মসূচির ‘উপকারভোগী’ হিসেবে দেখবে না, বরং একজন মানুষ, অধিকারসম্পন্ন ব্যক্তি এবং সম্ভাবনাময় সৃজনশীল সত্তা হিসেবে দেখবে। একজন শিশুসাহিত্যিক বা শিশু-সংস্কৃতি ব্যক্তিত্ব এই দৃষ্টিভঙ্গি প্রতিষ্ঠানের নীতি ও কর্মসূচিতে আরও দৃঢ়ভাবে নিয়ে আসতে পারেন। জুলাই-পরবর্তী বাংলাদেশে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর নেতৃত্ব ও চরিত্র নতুন করে ভাবার যে সুযোগ তৈরি হয়েছে, শিশু একাডেমির ক্ষেত্রেও সেই সুযোগ কাজে লাগানো দরকার। এটা কোনো ব্যক্তি বা ক্যাডারের সঙ্গে সম্পর্কিত নয়, এটা একটি বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠানের চরিত্রের সঙ্গে তার নেতৃত্বের যোগ্যতার সামঞ্জস্য নিশ্চিত করার দাবি। বাংলাদেশের কবি-সাহিত্যিক, শিশুসাহিত্যিক, শিল্পী, শিক্ষাবিদ, সাংস্কৃতিক সংগঠন ও শিশু অধিকারকর্মীদেরও তাই এ বিষয়ে কথা বলা দরকার। সরকারের উচিত দেশের যোগ্য ব্যক্তিদের মধ্য থেকে এমন একজন সৃজনশীল, দূরদর্শী ও শিশুবান্ধব মানুষকে বেছে নেওয়া, যিনি প্রশাসনিক কাঠামোর সঙ্গে সমন্বয় রেখে শিশু একাডেমির মূল সাংস্কৃতিক চরিত্রকে আরও শক্তিশালী করতে পারবেন।

যেকোনো জাতির ভবিষ্যৎ শুধু অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বা অবকাঠামোগত উন্নয়নের ওপর নির্ভর করে না; নির্ভর করে তার শিশুদের কল্পনাশক্তি, পাঠাভ্যাস, মানবিকতা, সৃজনশীলতা ও জ্ঞানচর্চার ওপরও। আজকের শিশুর হাতে আমরা কী বই দিচ্ছি, তার কল্পনাকে কতটা স্বাধীনতা দিচ্ছি, তাকে কতটা সাহিত্য, শিল্প, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতির সঙ্গে যুক্ত করছি তার ওপরই আগামী দিনের সমাজের চরিত্র অনেকটা নির্ভর করবে।সেই বিবেচনায় শিশু একাডেমির নেতৃত্বের প্রশ্নটি শুধু একটি পদে কে বসবেন এত ছোট করে দেখার সুযোগ নেই। এটা আদতে আমরা কেমন শিশু চাই এবং কেমন বাংলাদেশ চাই, সেই প্রশ্নের সঙ্গেও যুক্ত। প্রশ্নটি এড়িয়ে যাওয়ার নয়। প্রশ্নটি খুব স্পষ্ট বাংলাদেশ শিশু একাডেমির নেতৃত্বে কি একজন শিশুসাহিত্যিক, শিক্ষাবিদ বা শিশু-সংস্কৃতি বিশেষজ্ঞকে ফিরিয়ে আনার সময় আসেনি?

লেখক : গবেষক ও শিশুসাহিত্যিক।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত