কৃষিঋণ নীতিমালা

গত বছর করোনাভাইরাসের কারণে কৃষকদের জন্য শতকরা ৪ ভাগ সুদে ৫ হাজার কোটি টাকার বিশেষ প্রণোদনা তহবিল ঘোষণা করেছিল বাংলাদেশ ব্যাংক। বিষয়টি সব মহলেই বেশ প্রশংসিত হয়েছিল। উপকৃত হয়েছিলেন দেশের অগণিত কৃষক। যারা করোনার এই কঠিন সময়ে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ক্ষেতে-খামারে অক্লান্ত পরিশ্রম করে ফসল ফলিয়ে বাঁচিয়েছেন আমাদের জীবন। পৃথিবীর অনেক দেশে খাদ্য সংকট দেখা দিলেও বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত খাদ্যের কোনো অভাব হয়নি। গত বোরো মৌসুমেও উৎপাদিত হয়েছে ২ কোটি মেট্রিক টনের বেশি চাল। চাল উৎপাদনে ইন্দোনেশিয়াকে পেছনে ফেলে বাংলাদেশের অবস্থান বিশ্বে তৃতীয়। শুধু চাল কেন? পাট উৎপাদনে বাংলাদেশ বিশ্বে দ্বিতীয়। সবজি উৎপাদনে তৃতীয়। ফসলের জাত উদ্ভাবনে প্রথম। আম ও আলু উৎপাদনে সপ্তম। পেয়ারা উৎপাদনে অষ্টম। এসব অর্জন সম্ভব হয়েছে আমাদের কর্মঠ কৃষকের অক্লান্ত পরিশ্রমের ফলে- এ কথা অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই। এ অর্জনকে আরও এগিয়ে নিতে হলে কৃষক ভাইদের উন্নত প্রযুক্তি, পরামর্শ, প্রশিক্ষণ ও সহজে স্বল্পসুদে সময় মতো কৃষিঋণ প্রদান করতে হবে। ফসলের উৎপাদন বৃদ্ধিতে গুণগত মানের বীজ, সুষম মাত্রায় সার, বালাইনাশক ও সেঁচের কোনো বিকল্প নেই। ফসল ফলাতে হলে কৃষককে এই সব উপকরণ সময়মতো সংগ্রহ করতে হয়। কিন্তু আমাদের কৃষকের হাতে ফসল উৎপাদনের সময় নগদ অর্থ থাকে না। আন্তর্জাতিক সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল ফুড পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট বলছে, এনজিও, আত্মীয়স্বজন, বেসরকারি ব্যাংক ও দাদন ব্যবসায়ীসহ বিভিন্ন বেসরকারি উৎস থেকে কৃষক ৮১ শতাংশের বেশি ঋণ গ্রহণ করেন। এই সব ঋণের সুদ ১৯ থেকে ৬৩ শতাংশ পর্যন্ত। দুঃখজনক হলেও সত্য, সরকারি কৃষি ব্যাংক ৯ শতাংশ সুদে মাত্র ৬ শতাংশ কৃষককে কৃষিঋণ প্রদান করে। করোনা ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের উদ্যোক্তাদের জন্য শতকরা ৪% সুদে দ্বিতীয় দফায় প্রণোদনা প্যাকেজের আওতায় ৩ হাজার কোটি টাকা ঋণ বরাদ্দ করেছে সরকার। কৃষকদের জন্য শতকরা ৪ ভাগ সুদে প্রণোদনা তহবিলের ঋণ বিতরণ ইতিমধ্যে শেষ হয়ে গেলেও চলতি ২০২১-২২ অর্থবছরে তাদের জন্য কোনো প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করা হয়নি। চলতি অর্থবছরে কৃষি খাতে ২৮ হাজার ৩৯১ কোটি টাকার ঋণ বিতরণের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এই ঋণের সুদের হার নির্ধারণ করা হয়েছে ৮ শতাংশ। গত ২৮ জুলাই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এক বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে ওই নীতিমালা ও কর্মসূচির কথা জানানো হয়।

করোনাভাইরাস মহামারীর কারণে সৃষ্ট আর্থিক সংকট মোকাবিলায় এবং সরকারের কৃষি ও কৃষিবান্ধব নীতির সঙ্গে সংগতি রেখে নতুন কৃষিঋণ নীতিমালা ও কর্মসূচি প্রণয়ন করা হয়েছে। নতুন ঋণ নীতিমালা এবং কর্মসূচিতে পল্লী অঞ্চলে পর্যাপ্ত কৃষিঋণের প্রবাহ বাড়ানোর মাধ্যমে কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধিতে জোর দেওয়া হয়েছে। যাতে দারিদ্র্য বিমোচন, ক্ষুধা মুক্তি ও গ্রামীণ অর্থনীতির উন্নয়ন ত্বরান্বিত হয়। বাংলাদেশ ব্যাংক চলতি ২০২১-২২ অর্থবছরের জন্য ২৮ হাজার ৩৯১ কোটি টাকার ঋণ বিতরণের যে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে তা সদ্যবিদায়ী ২০২০-২১ অর্থবছরের তুলনায় ৭ দশমিক ৯৮ শতাংশ বেশি। বিদায়ী বছরে ২৬ হাজার ২৯২ কোটি টাকা লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে ব্যাংকগুলো ২৫ হাজার ৫১১ কোটি টাকা কৃষিঋণ বিতরণ করেছে। এই ঋণ পেয়েছেন ৩০ লাখ ৫৫ হাজার ১৬৬ জন কৃষক। এর মধ্যে ব্যাংকগুলো সরাসরি যেমন ঋণ বিতরণ করেছে, তেমনি এনজিওর মাধ্যমেও বিতরণ করা হয়েছে। ঋণ গ্রহীতাদের মধ্যে ১৬ লাখ ৫ হাজার ৯৪৭ জন নারী প্রায় ৯ হাজার ২৮৮ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছেন। ২২ লাখ ৪৫ হাজার ৫১২ জন ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক চাষি বিভিন্ন ব্যাংক থেকে প্রায় ১৭ হাজার ৬৪০ কোটি টাকা এবং চর, হাওর প্রভৃতি অনগ্রসর এলাকার ৭ হাজার ৭৯৬ জন কৃষক প্রায় ৩৪ কোটি টাকা কৃষিঋণ পেয়েছেন।

পরিবেশবান্ধব ও টেকসই কৃষি ব্যবস্থা গড়ে তুলে জনসাধারণের খাদ্য নিরাপত্তা ও পুষ্টি নিশ্চিতে কৃষকের কাছে কৃষি ঋণ সহজলভ্য করার লক্ষ্যে বর্তমান নীতিমালা ও কর্মসূচিতে বেশ কিছু নতুন বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এ নীতিমালার নতুন বিষয়গুলো হচ্ছে সোনালি মুরগি, মহিষ এবং গাড়ল পালনের জন্য ঋণ দেওয়া; কৃষি ঋণের সুদ হার ৯ শতাংশ থেকে হ্রাস করে ৮ শতাংশ করা; একরপ্রতি ঋণসীমা কৃষকদের প্রকৃত চাহিদা ও বাস্তবতার নিরিখে ১৫ শতাংশ কমানো ও বাড়ানোর সুযোগ; মাছ চাষে একরপ্রতি ঋণসীমা বাড়ানো; ব্যাংক কর্র্তৃক বিতরণকৃত ঋণের তদারকি অধিকতর জোরদার করা ইত্যাদি। ৩৪ বছর চাকরি জীবনে কোটি কোটি টাকা কৃষিঋণ বিতরণ ও আদায়ের সঙ্গে যুক্ত ছিলাম। অভিজ্ঞতার আলোকে দেখেছি- প্রকৃত কৃষক কখনো ঋণখেলাপি হন না। তারা ঋণের অর্থ সময়মতো উৎপাদন বৃদ্ধির কাজে ব্যবহার করে ফলন বৃদ্ধি করেন। ফসল ওঠার সঙ্গে সঙ্গেই সবার আগে ঋণ পরিশোধ করেন। এবার করোনা মহামারীকালেও দেশের অন্নদাতা কৃষকরা সময়মতো কৃষিঋণ পরিশোধ করে এক বিরল দৃষ্টান্তই স্থাপন করলেন। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুয়ায়ী, সদ্য বিদায়ী ২০২০-২১ অর্থবছরে প্রথম সাত মাসে (জুলাই-জানুয়ারি) ১৬ হাজার ৫৬ কোটি টাকার ঋণ শোধ করেছেন কৃষকরা। আগের অর্থবছরের একই সময়ের চেয়ে আদায় বেড়েছে প্রায় দুই হাজার ৫২৮ কোটি টাকা। ২০১৯-২০ অর্থবছরে একই সময়ে আদায় হয়েছিল ১ হাজার ৫২৮ কোটি টাকা। এক বছরের ব্যবধানে কৃষিঋণ আদায় বৃদ্ধি পেয়েছে আড়াই হাজার কোটি টাকার বেশি, ফলে খেলাপি ঋণও কমেছে প্রায় হাজার কোটি টাকার মতো। যখন করোনা মহামারীতে পুরো অর্থনীতি বিপর্যস্ত, ঋণ পরিশোধে বাড়তি সময় চাচ্ছেন ব্যবসায়ীরা, বিভিন্ন ছাড়েও আদায় হচ্ছে না ঋণ, এ নিয়ে ব্যাংকগুলো দিশেহারা, ঠিক তখনই ঋণ পরিশোধে অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করলেন দেশের অন্নদাতা কৃষকরা। তাদের এই দৃষ্টান্ত জাতিকে অন্ধকারে আলোর পথ দেখাবে। উন্নয়নের ধারাকে গতিশীল ও বেগবান করবে এটাই আমাদের প্রত্যাশা।

 আমাদের মনে রাখতে হবে, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীনতার পর ১০ লাখ কৃষককে পাকিস্তান আমলে দায়ের করা সার্টিফিকেট মামলা থেকে অব্যাহতি দেন এবং তাদের সমুদয় ঋণ সুদসহ মওকুফ করে দেন। অপ্রাতিষ্ঠানিক ঋণের উচ্চ সুদ হার থেকে কৃষকদের মুক্তি এবং কৃষি উন্নয়ন ও প্রয়োজনীয় অর্থায়নের জন্য তার সময়ে ১৯৭৩ সালের বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক আদেশের মাধ্যমে একটি বিশেষায়িত সরকারি ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করা হয়। গ্রাম-বাংলার অর্থনৈতিক উন্নয়নের লক্ষ্যকে সামনে রেখে কৃষির সার্বিক উন্নয়নের মাধ্যমে দেশের খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের জন্যই এ ব্যাংকের সৃষ্টি। আবার কৃষকরা যাতে ঋণগ্রস্ততার চক্র থেকে বেরিয়ে আসতে পারেন, সে লক্ষ্যে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ১৮৯৪ সালে শিলাইদহে কৃষি সমবায় ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করেন। আমাদের কথা, যদি নিয়মনীতি মেনে প্রকৃত কৃষকের মধ্যে ঋণ বিতরণ করা হয় এবং সেই ঋণের অর্থ যদি উৎপাদন বাড়ানোর কাজে সময় মতো ব্যবহার করা হয় তা হলে ফলন বৃদ্ধির ফলে কৃষক যেমন লাভবান হবেন, তেমনি জাতিও উপকৃত হবে বহুলাংশে। টেকসই হবে খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তা। সাশ্রয় হবে কষ্টার্জিত বৈদেশিক মুদ্রা। তাই জাতীয় স্বার্থে কৃষিঋণ নীতিমালায় নিম্নে উল্লিখিত বিষয়গুলো গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করা উচিত বলে আমরা মনে করি ।

১. নির্দিষ্ট ফসল রোপণের আগেই কৃষিঋণ কৃষকের হাতে পৌঁছে দিতে হবে।

২. ঋণ বিতরণে ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকদের অগ্রাধিকার দিতে হবে।

৩. যে কাজের জন্য ঋণ প্রদান করা হবে, ঋণের অর্থ ওই কাজে ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে।

৪. ঋণ প্রদানের ক্ষেত্রে কোনো প্রকার দুর্নীতির আশ্রয় নেওয়া যাবে না।

৫. জমি বন্ধক নয়; ফসল বন্ধকীকরণ চুক্তির মাধ্যমে প্রকৃত কৃষকের মধ্যে কৃষিঋণ প্রদান করতে হবে।

৬. কৃষিঋণ নীতিমালা এমন ভাবে প্রণয়ন করতে হবে যাতে ব্যাংক ও কৃষকের মাঝখানে কোনো মধ্যস্বত্বভোগী বা দালালের অস্তিত্ব না থাকে।

৭. ঋণ অনাদায়ের সঙ্গে সঙ্গে তদন্ত করে সঠিক কারণ উদ্ঘাটন পূর্বক প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে।

৮. প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে কৃষিঋণ অনাদায়ী হলে, সে ক্ষেত্রে কৃষককে পুনরায় ঋণ প্রদানপূর্বক বকেয়া ঋণ আদায়ের ব্যবস্থা নিতে হবে।

৯. নদী ভাঙনপ্রবণ এলাকায় কৃষিঋণ প্রদানকে নিরুৎসাহিত করতে হবে।

১০. কৃষিকাজের সঙ্গে জড়িত নয় এমন লোককে কোনো অবস্থাতেই কৃষিঋণ প্রদান করা যাবে না।

১১. কৃষিঋণের বার্ষিক সুদ শতকরা ৪ থেকে ৫% এর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকা উচিত।

লেখক সাবেক মহাব্যবস্থাপক (কৃষি) বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য শিল্প করপোরেশন

netairoy18@ yahoo.com