রাজধানীর মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ের ইন্দিরা মাঠের কোনায় কয়েকটি চায়ের দোকান খোলা। তিনজন আলাপে মশগুল, তাদের জন্য তৈরি হচ্ছে চা। ঘড়ির কাঁটায় তখন দুপুর ১২টা ৫৫ মিনিট। প্রচণ্ড রোদে ক্লান্ত রিকশাচালকরা বিশ্রাম করছেন। অ্যাপভিত্তিক মোটরসাইকেল বন্ধ থাকলেও যাত্রীর অপেক্ষায় তিন চালক। কয়েক মিনিট বাদেই আসেন একজন। দরাদরি করে তিনি চেপে বসেন মোটরসাইকেলে।
করোনার সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে সরকারি বিধিনিষেধের ১৬তম দিনে গতকাল শনিবার ইন্দিরা মাঠের খণ্ড চিত্রই বলে দেয়, বহু মানুষ যে যার মতো ছুটছেন। ভেঙে পড়েছে ‘লকডাউন’। গতকাল নগরীর বিজয় সরণিতে ট্রাফিক সিগন্যালেও বেশ খানিক সময় থামতে হয় নগরবাসীকে। এদিন প্রাইভেট কার, মোটরসাইকেল, সিএনজিচালিত অটোরিকশা, পণ্যবাহী গাড়িসহ সাধারণ মানুষের উপস্থিতি ছিল অনেক বেশি। পাড়া-মহল্লার সব দোকান ছিল খোলা।
নগরীর কাটাবন, নীলক্ষেত, বাটা সিগন্যাল, ধানমণ্ডি, কারওয়ান বাজার, মোহাম্মদপুর, ফার্মগেটসহ বেশ কয়েকটি এলাকার প্রধান সড়কসংলগ্ন মার্কেট ও দোকান খোলা দেখা যায়। বরাবরের মতো সড়কগুলো ছিল রিকশার দখলে। গিত দিনগুলোয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তল্লাশিচৌকি থাকলেও গতকাল খুব একটা দেখা মেলেনি।
রামপুরার বাসিন্দা মীর হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘লকডাউন বলতে এখন কিছুই নেই। বাস বাদে সবই চলছে। দ্বিতীয় দফায় লকডাউন বাড়ানো ঠিক হয়নি। সরকারের অব্যবস্থাপনায় মানুষের ভোগান্তি হচ্ছে।’
গাবতলী বাস টার্মিনাল এলাকায় দেখা যায়, অসংখ্য মানুষ পরিবার-পরিজন নিয়ে শহরে ঢুকছেন। আমিন বাজার ব্রিজে ছিল দীর্ঘলাইন। তাদের কাউকে পুলিশের জেরায় পড়তে দেখা যায়নি। আমিন বাজার ব্রিজের আগে পুলিশের তল্লাশিচৌকি চোখে পড়ে। দু-একটি গাড়ি থামিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ শেষে ছেড়ে দেওয়া হয়। রাজধানীর আরেকটি প্রবেশপথ বছিলা ব্রিজের ওপরে সারি সারি সিএনজিচালিত অটোরিকশা দেখা যায়। সেখান থেকে সামনে এগিয়ে পুলিশ চেকপোস্ট দেখা গেলেও দায়িত্বরত কাউকে পাওয়া যায়নি।
সংসার চালাতে কষ্ট হচ্ছে জানিয়ে পরীবাগের দোকানি জসিম হোসেন বলেন, ‘১২ দিনের বেশি দোকান বন্ধ ছিল। তিন দিন ধরে খুলছি। মেলা দেনা হইছে। ঘরভাড়া বাঁধছে। দোকান না খুইলা কী করমু? কয়ডা টাকা তো বেচাকেনা হয়।’
লকডাউনে যত দিন যাচ্ছে, রাস্তাঘাটে মানুষ বাড়ছে। জীবিকার তাগিদে মানুষ কোনো বিধিনিষেধই মানছেন না। বছিলার ওয়াশপুরের বাসিন্দা শরীফুল ইসলাম বলেন, ‘এখন ১০ টাকার রিকশা ভাড়া ২০ টাকা। কষ্ট করে মানুষ হেঁটে যাতায়াত করছে। অনেকে সাইকেল ব্যবহার করছেন।’
দৌলতদিয়া ঘাটে যাত্রীর ভিড় : রাজবাড়ীর দৌলতদিয়া ফেরিঘাটে গতকাল সকাল থেকে ঢাকামুখী মানুষের ভিড় দেখা যায়। মানিকগঞ্জের পাটুরিয়া ঘাট থেকে ছেড়ে আসা ফেরিগুলোয় যানবাহন এবং যাত্রী ছিল চোখে পড়ার মতো।
সোহেল রানা নামে এক যাত্রী বলেন, ‘টাকার কাছে করোনা কিছু না, আমি বাড়ির বড় ছেলে সব দায়িত্ব আমার। টাকা ইনকাম করতে হলে অফিস করতেই হবে। পরশু অফিস শুরু হবে, তাই আজ ঢাকা যাচ্ছি।’
বিআইডব্লিউটিসি দৌলতদিয়া কার্যালয়ের ব্যবস্থাপক শিহাব উদ্দিন জানান, গত কয়েক দিনের তুলনায় আজ (গতকাল) দৌলতদিয়া ঘাটে ভিড় বেশি ছিল। আটটি ফেরিতে যাত্রী ও পরিবহন পারাপার করা হচ্ছে।
গাজীপুরে ৩৭টি বাস জব্দ : গাজীপুরের কালিয়াকৈরে বিধিনিষেধ উপেক্ষা করে ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কে চলাচল করায় ৩৭টি বাস জব্দ করেছে সালনা থানার হাইওয়ে পুলিশ। গতকাল সকালে উপজেলার চন্দ্রা বাসস্টেশনে এ অভিযান চালানো হয়।
হাইওয়ে পুলিশ জানিয়েছে, উত্তরবঙ্গ থেকে ঢাকাগামী বাসগুলো তিন-চার গুণ বেশি ভাড়া নিয়ে রাতের বেলা চলাচল করছে। চেকপোস্ট অতিক্রমের সময় গাজীপুর রিজিওনের পুলিশ সুপার আলী আহমেদ খানের নির্দেশে বাসগুলো জব্দ করা হয়। পরে সালনা হাইওয়ে থানা পুলিশ একটি মামলা করে।
সালনা হাইওয়ে থানার ওসি মীর গোলাম ফারুক জানান, কিছু অসাধু বাসচালক মাত্রাতিরিক্ত ভাড়ার লোভে রাতে যাত্রী বহন করছে। বিধিনিষেধ অমান্য করে বাস চালানোয় তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। গত শুক্রবারও উত্তরবঙ্গ থেকে আসা ৪৭টি বাস জব্দ করেছিল গাজীপুর হাইওয়ে পুলিশ।
প্রতিবেদনটি তৈরিতে সহায়তা করেছেন গাজীপুর ও রাজবাড়ী প্রতিনিধি।