বেশ কিছুদিন ধরে ভারতীয় টেলিভিশন চ্যানেলগুলোতে একটা বিজ্ঞাপন দেখা যায়। শপিংমল, পাড়ার দোকান, পাড়ার রক থেকে শুরু করে সর্বত্র মানুষের জিজ্ঞাসা ‘এখন কী চলছে’। উত্তরে শোনা যায় ‘ফগ’ চলছে। আর কী চলছে জানতে চাইলে কিছুক্ষণ ভাবার পর আবার শোনা যায় ‘ফগ-ই’ চলছে। আমাদের দেশের সাধারণ মানুষকে যদি জিজ্ঞাসা করা হয় দেশে কী চলছে তাহলে এক কথায় জবাব দেবে, ‘দুর্নীতি চলছে’। বিজ্ঞাপনের মতো যদি আবার জিজ্ঞাসা করা হয় তবে কোনো চিন্তা না করেই আবার বলবে, ‘দুর্নীতি-ই চলছে’। ভারতীয় ওই ‘বডি স্প্রে’র সুগন্ধ ও ক্ষমতার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাংলাদেশের দুর্নীতির বিস্তৃতিও কোনো অংশে কম না। বাধাহীনভাবে যেভাবে চলমান দুর্নীতির গন্ধ চারপাশে ছড়িয়ে পড়ছে তাতে তা যে পৃথিবীর যেকোনো গন্ধকেই যেন হার মানাতে সক্ষম।
কিন্তু দেশের সাধারণ মানুষ সবকিছুর মধ্যে দুর্নীতি দেখতে পেলেই তো হবে না! রাষ্ট্রীয় আইনে দুর্নীতির সংজ্ঞা জানতে হবে। এটা না জেনেই শুধু চিৎকার করলে ধমক খেতে হবেই। সাংবাদিক রোজিনাদের জেলে যেতে হবে। মন্ত্রীরা ধমক দেবে, তাদের ঠিকাদার সন্তানরা ধমক দেবে, তৃণমূল পর্যায়ের সরকারি দলের নেতাকর্মীরাও ধমক দেবে। আর প্রশাসন প্রতিবাদী মানুষজনকে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে জেলে ভরে রাখবে। অন্যদিকে, ভুক্তভোগী সাধারণ জনগণ দেখছে, প্রশাসনের দায়িত্ব এখন শুধু দোষী চিহ্নিত করা আর নিজেকে নির্দোষ প্রমাণের জন্য সব দায় ‘দোষী’র তকমা পাওয়া মানুষটার ঘাড়ে বর্তানো।
ছেলেবেলায় পড়েছি মহাপুরুষদের বাণী। বিশ্বাস হয়ে গিয়েছিল যে মহাপুরুষরাই শুধু বাণী দেন। এখন আর মিডিয়ার দৌলতে তা মনে হয় না। দেশের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্তাব্যক্তিরা প্রতিনিয়ত সাধারণ মানুষের উদ্দেশ্যে বাণী দিয়ে যাচ্ছে। পরিস্থিতি পরিবেশ এমন হয়ে গেছে যেন তাদের দায়িত্ব শুধু বাণী দেওয়া পর্যন্তই সীমিত। দৃষ্টিপাত করি ৪ মে ২০২১ জাতীয় দৈনিক ‘সংবাদে’ প্রকাশিত বিআরটিসি নিয়ে একটি সংবাদে ‘বিআরটিসিকে লোকসানি প্রতিষ্ঠানের ধারা থেকে বেরিয়ে লাভজনক প্রতিষ্ঠানে রূপ দিতে হবে। এত গাড়ি থাকার পরও বিআরটিসির কেন লোকসান হয়, এটি দেখতে হবে। সরকারকে বারবার ভর্তুকি দিতে হয়। একটি লোকসানি প্রতিষ্ঠানকে বারবার শুধু টাকা দেওয়া। বিআরটিসির জন্য টাকা চাইতে লজ্জা লাগে। এত গাড়ি হলো, তারপরও বিআরটিসির লাভজনক ধারায় ফিরে আসা অধরা রয়ে গেল।’ একই তারিখের একই দৈনিকের আরেকটি সংবাদে দেখা যাচ্ছে ‘নির্মাণকাজের এক বছরের মধ্যে ঢাকা-চট্টগ্রাম ও নবীনগর-চন্দ্রার রাস্তা নষ্ট হয়ে গেছে। এ রকম রাস্তা করার চেয়ে না করাই ভালো। নকশার ত্রুটিগুলো আমাদের দেখা উচিত, এটা কিন্তু যথাযথভাবে দেখা হচ্ছে না। নকশার ত্রুটির কারণে বিভিন্ন জায়গায় রাস্তার কাজ সঠিকভাবে হচ্ছে না বলে অভিযোগ আসছে। যুক্তিসংগত কারণ ছাড়া কোনো ঠিকাদার নির্মাণকাজে দেরি করলে কার্যাদেশ বাতিল করুন, প্রয়োজনে তাদের কালো তালিকাভুক্ত করতে হবে।’ দেশের সাধারণ মানুষ প্রতিদিনই কর্তাব্যক্তিদের এমন বাণী শুনে চলেছে। কিন্তু বিআরটিসিকে লাভজনক ধারায় ফিরিয়ে আনার দায়িত্ব কার? রাস্তার জীবনকাল নিশ্চিত করার দায়িত্ব কার? নকশার ত্রুটি দেখার দায়িত্ব কার?
এমন সব বাণীতে দেশ ও দশের কী উপকার হবে? দেশের সব প্রকল্পই যেন ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতা রক্ষা করে চলেছে। শুধু মেগা প্রকল্প নয়, সাধারণ প্রকল্প হলেও নির্ধারিত প্রাক্কলিত ব্যয় ও সময়ের মধ্যে সেসব শেষ করার কোনো দৃষ্টান্ত কি দেশে আছে? অতীতে বঙ্গবন্ধু সেতু, চট্টগ্রাম সারকারখানা, তিস্তা ব্যারেজ ইত্যাদি কোনো প্রকল্পই নির্ধারিত ব্যয় ও সময়ে শেষ করা যায়নি। বঙ্গবন্ধু সেতুটি ৪২০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার ব্যয় নির্ধারণ করে শেষ করা হয় ৯৬৭ মিলিয়ন মার্কিন ডলারে। জিয়া সারকারখানা ৬৯ কোটি টাকার প্রকল্প ছিল, শেষ করা হয় ১০৫০ কোটি টাকায়। চট্টগ্রাম ইউরিয়া ফার্টিলাইজার ফ্যাক্টরি ৬৫০ কোটি টাকায় শেষ করার কথা থাকলেও ১৬৫০ কোটি টাকায় শেষ করা হয়। স্ব-অর্থায়নে পদ্মা সেতু ১০ হাজার ১৬১ কোটি টাকায় শেষ করার কথা থাকলেও এখন ব্যয় ধরা হয়েছে ৩০ হাজার ১৯৩ কোটি টাকা। ঢাকা-চট্টগ্রাম চারলেন প্রকল্প ২ হাজার ১৬৮ কোটি টাকায় শেষ করার কথা থাকলেও এখন তার ব্যয় ৩ হাজার ৮১৬ কোটি টাকা। অতীত ও বর্তমানের এমন শত শত প্রকল্প আছে সরকারি অনুমোদন পেয়ে যার ব্যয় ও সময় বৃদ্ধি ঘটেছে। বড়দের কাছ থেকে ছোটরা শিক্ষা নেয়। তাই বোধ করি মেগা প্রকল্পের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করেই অন্য সব প্রকল্পও একই পথে চলছে। এতে সাধারণ মানুষের মনে এই বিশ্বাস আরও দৃঢ় হয়েছে যে, সর্বত্র দুর্নীতিরই জয়জয়কার।
দেশের সাধারণ মানুষের কাছে এখন সবচেয়ে বেশি শোনা এমনই একটি বাণী হচ্ছে ‘দোষী যেই হোক না কেন তাকে শাস্তি পেতেই হবে।’ কিন্তু শাস্তি নিশ্চিত করতে প্রমাণ প্রয়োজন। দায়িত্বপ্রাপ্তরা নিজেরা বিরোধী রাজনৈতিক দলের ভিন্ন অন্য কারও দোষ খুঁজে পায় না। কিন্তু মিডিয়ায় দুর্নীতির কথা প্রকাশ হলে সাধারণভাবে তাদের কোনো ‘রা’ শোনা যায় না। বেশি হইচই হলে প্রমাণ চাওয়া হয়। বিদেশে অর্থ পাচারের কথা প্রকাশ হলে প্রমাণ চাওয়া হয়। বিদেশে সেকে- হোমের কথা প্রকাশ হলে তালিকা চাওয়া হয়। শেয়ারবাজারে জালিয়াতির কথা প্রকাশ হলে বলেন, সমালোচকরা শেয়ারবাজারই বোঝেন না। চার হাজার কোটি টাকার ব্যাংক জালিয়াতির ঘটনায় শুনতে হয় একটা দেশের জন্য এ টাকা সামান্য। খুব বেশি হলে ভারী দেখে একটা তদন্ত কমিশন গঠন করে দেওয়া হয় যার কোনো হদিস কেউ কোনোদিন পায় না। এমন উদাসীনতার ফলে দেশের প্রায় প্রতিটা ক্ষেত্রে এক অদ্ভুত পরিবেশ পরিস্থিতি বিরাজ করছে। যে পরিস্থিতিতে দেশে একদল মানুষ ‘উন্নয়ন ও অগ্রগতি’ ত্বরান্বিত করতে ঝাঁপিয়ে পড়েছে। এই অবস্থায় ক্ষেত্রবিশেষে স্থানীয় বাজারের থেকে একশগুণ বেশি মূল্যে পণ্য ক্রয় করা বা প্রকল্প ব্যয় তিন-চার-পাঁচ গুণ বাড়ানো সাধারণ মানুষের বিবেচনায় দুর্নীতি বলে প্রতীয়মান হলেও কোনো লাভ নেই। সাদা চোখে সবকিছু দেখলে হয় না।
তবুও দেশের মানুষ শুনছে, দেশ এখন উন্নত বিশ্বের কাতারে শামিল হওয়ার দৌড়ে আছে। দায়িত্ব নেওয়া মানুষরা দেশটাকে প্যারিস, লস এঞ্জেলেস, ভেনিস, সিঙ্গাপুরের মতো গড়ে তোলার ব্রত নিয়েছেন। জগৎ বিখ্যাত এসব শহরে বাস করতে হলে মানসিক প্রস্তুতি প্রয়োজন, দেশের দায়িত্বপ্রাপ্তরা সাধারণ জনগণের জন্য সেই প্রস্তুতিই গ্রহণ করেছেন। একজন বাঙালি যদি লস এঞ্জেলেসে বাস করে এক ডলার ব্যয় করে ৮০ টাকা হিসাব করে তবে তো ঘুমাতে পারতেন না। তাই স্থানীয় বাজারের ২৫০ টাকার সুই ২৫০০০ টাকায় ক্রয় করে জনগণকে অভ্যস্ত করে তোলার কাজ হাতে নেওয়া হয়েছে। এখানে ভারতীয় বডি স্প্রে ফগের মতো দুর্নীতির গন্ধ পেলে হবে না। বরং ফগের সুগন্ধ উপভোগ করতে হবে।
লেখক : প্রাবন্ধিক। সাবেক সভাপতি, ইনস্টিটিউশন অব ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স, বাংলাদেশ।
khairulumam1950@gmail.com