এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষার পরীক্ষার্থীদের ফরম পূরণের টাকা বোর্ড থেকে নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে। এরপরও মাত্রাতিরিক্ত টাকা আদায় করছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো। বোর্ড নির্ধারিত ফি ১০৭০ থেকে ১১৬০ টাকা পর্যন্ত হলেও কোনো কোনো প্রতিষ্ঠান দেড় হাজার থেকে শুরু করে ৬-৭ হাজার টাকা পর্যন্তও আদায় করছে। অর্থাৎ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ইচ্ছেমাফিক আদায় করা হচ্ছে ফরম পূরণ ফি। ভুক্তভোগী শিক্ষার্থী ও তাদের অভিভাবকরা বলেছেন, করোনা মহামারীতে এমনিতেই তাদের অর্থনৈতিক অবস্থা খারাপ। এর ওপর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অতিরিক্ত টাকা দাবি যেন ‘মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা’।
জানা গেছে, গত ১ আগস্ট শিক্ষা বোর্ড কর্র্তৃপক্ষ ২০২১ সালের এইচএসসি পরীক্ষার্থীদের ফরম পূরণের ফি নির্ধারণ করে দেয়। সে অনুযায়ী এবার বিজ্ঞান বিভাগে ১ হাজার ১৬০ টাকা এবং মানবিক ও ব্যবসাশিক্ষা বিভাগে ১ হাজার ৭০ টাকা ফরম পূরণ ফি ধরা হয়েছে। নির্ধারিত ফির বাইরে অতিরিক্ত অর্থ আদায় করা হলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের ফরম পূরণ প্যানেল বন্ধসহ প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি)। অথচ বাস্তবে ওই ঘোষণার কোনো কার্যকারিতা দেখা যাচ্ছে না।
এ প্রসঙ্গে রাজধানীর একটি বেসরকারি কলেজের এইচএসসি পরীক্ষার্থী মুনতাহা মুনা বলেন, ‘আমার কলেজে যারা উপবৃত্তির টাকা পায়, শুধু তাদের কাছ থেকে ফরম পূরণের জন্য ১০৬০ টাকা নিচ্ছে কলেজ। আর যারা উপবৃত্তি পায় না তাদের থেকে বেশি টাকা নেওয়া হচ্ছে।’
ফরম পূরণে গলাকাটা ফি আদায়ের অভিযোগ করেছেন রাজধানীর আরেকটি বেসরকারি কলেজের এইচএসসি পরীক্ষার্থী তাসরিফা খান পুষ্প। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমার আগের বেতনসহ ফরম পূরণে ১৫ হাজার ৬০০ টাকা দাবি করেছে কলেজ। কিন্তু এত টাকা পরিশোধ করে আমার এইচএসসি পরীক্ষা দেওয়া সম্ভব হবে না।’
তিনি আরও বলেন, ‘বাড়তি টাকা আদায়ের বিষয়ে শিক্ষার্থীদের অভিযোগ জানাতে অনলাইনে ফরম পূরণের বিষয়ে অভিযোগের পাতাও আছে। সেখানে সে কত টাকা বেশি দিয়েছেন তা জানাতে বলা হয়েছে। তবে অভিযোগ করতে শিক্ষার্থীদের রোল ও নাম চাওয়া হয়েছে। যে কারণে অনেক শিক্ষার্থীই অভিযোগ করতে সাহস পাচ্ছেন না।’
শিক্ষা বোর্ড থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, করোনা পরিস্থিতির কারণে এ বছর (২০২১) কোনো নির্বাচনী বা টেস্ট পরীক্ষা হবে না। তাই টেস্ট পরীক্ষা সংক্রান্ত কোনো ফি নেওয়া যাবে না বলে উল্লেখ করা হয়েছে শিক্ষা বোর্ডের বিজ্ঞপ্তিতে। কোনো প্রতিষ্ঠান এসব আইন অমান্য করলে, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবে কর্র্তৃপক্ষ। কেবল বৈধ রেজিস্ট্রেশনধারী শিক্ষার্থীরা ফরম পূরণ করতে পারবেন। অননুমোদিত রেজিস্ট্রেশনধারী শিক্ষার্থীকে ফরম পূরণ করালে কোনো ধরনের যোগাযোগ ছাড়াই তা বাতিল করা হবে।
কিন্তু বোর্ডের এমন ঘোষণার পরও কিছু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান টেস্ট পরীক্ষা, অ্যাসাইনমেন্ট ও ফরম পূরণের নামে অবৈধভাবে অতিরিক্ত অর্থ নিচ্ছে। প্রতিষ্ঠান ভেদে যার পরিমাণ ৬-৭ হাজার টাকা পর্যন্ত। শিক্ষা বোর্ডে জমা দেওয়া অভিভাবকদের অভিযোগের ভিত্তিতে জানা যায়, ময়মনসিংহের এইচ এ ডিজিটাল স্কুল ও কলেজ শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে অ্যাসাইনমেন্ট ফি বাবদ ৫৫০ টাকা এবং ফরম পূরণের জন্য ৫ হাজার টাকা দাবি করেছে। নীলফামারীর মিরগঞ্জ হাট ডিগ্রি কলেজ অ্যাসাইনমেন্ট জমা দেওয়ার সময় শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে ৬৪০ টাকা করে বাড়তি নিয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। ঠাকুরগাঁওয়ের রানীশংকৈল ডিগ্রি কলেজ কর্র্তৃপক্ষও অ্যাসাইনমেন্ট ফির নামে শিক্ষার্থীদের থেকে বাড়তি টাকা নিয়েছে বলে তথ্য পাওয়া গেছে।
টাঙ্গাইলের পাকুটিয়া পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজ কর্র্তৃপক্ষ শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে অ্যাসাইনমেন্ট ফির নামে ৫০০ টাকা এবং টেস্ট পরীক্ষার নামে আরও বাড়তি ৫০০ টাকা করে নিয়েছে। নারায়ণগঞ্জের হাজী ইব্রাহিম আলমচান স্কুল অ্যান্ড কলেজ কর্র্তৃপক্ষ রেজিস্ট্রেশনের নামে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে ২ হাজার টাকা করে নিয়েছে। কুমিল্লার রয়েল ইন্টারন্যাশনাল কলেজ শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে রেজিস্ট্রেশন ফির নামে ৭ হাজার টাকা করে নিয়েছে। নরসিংদী সরকারি কলেজে ফরম পূরণের জন্য ৪ হাজার ১০০ টাকা করে নেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ এসেছে। এছাড়াও সেশন, রেজিস্ট্রেশন, অ্যাসাইনমেন্ট ফির নামে বাড়তি টাকা আদায়ের অভিযোগ আছে হাজী জসিম উদ্দিন ডিগ্রি কলেজ, শহীদ মুক্তিযোদ্ধা নজিবুল উদ্দিন খান কলেজ এবং সেন্ট্রাল ওমেনস কলেজসহ অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে আন্তঃবোর্ড সমন্বয়ক ও ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক নেহাল আহমেদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এমন অভিযোগ আমার কাছেও এসেছে। আমি শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের অনুরোধ করব ১২ আগস্টের আগে কোনো পরীক্ষার্থী ফরম পূরণ করতে যেন টাকা জমা না দেয়। আর কোনো প্রতিষ্ঠান বাড়তি টাকা দাবি করছে অভিযোগ পেলে কঠোর ব্যবস্থা নেব।’