পাঁচ দিনের মাথায় ভেঙে পড়ল মন্দিরের পিলার

দিনাজপুরের হিলিতে ধর্ম মন্ত্রণালয়ের বরাদ্দের টাকায় নির্মাণাধীন স্বর্ণাকাক্সক্ষা কেন্দ্রীয় মাতৃমন্দির ভবনের নির্মাণকাজে বড় ধরনের অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। রাতের আঁধারে আরসিসি পিলার ঢালাইয়ের পাঁচ দিনের মাথায় সেই পিলারগুলো ভেঙে পড়ছে। এমন পরিস্থিতিতে মন্দির কমিটির অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে ভবনটির নির্মাণকাজ তদারকির দায়িত্বে থাকা প্রকৌশলী ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে ভেঙে পড়া পিলারগুলো নতুন করে নির্মাণের নির্দেশনা দিয়েছেন।

হিলির চুড়িপট্টিতে ধর্ম মন্ত্রণালয়ের ১০ লাখ টাকা বরাদ্দে স্বর্ণাকাক্সক্ষা কেন্দ্রীয় মাতৃমন্দিরের নতুন ভবনের নির্মাণকাজ করছে দিনাজপুরের সেতাবগঞ্জের মোজাফফর রহমান কনস্ট্রাকশন।

সম্প্রতি এই প্রতিবেদক স্বর্ণাকাক্সক্ষা কেন্দ্রীয় মাতৃমন্দিরে গেলে সেখানে কর্মরত শ্রমিকরা বলেন, নির্মাণাধীন ভবনের আরসিসি পিলারগুলোতে সমস্যা দেখা দেওয়ার কারণে তারা সেগুলো ভেঙে ফেলছেন। যেসব পিলারে ত্রুটি চিহ্নিত হয়েছে সেগুলো ভেঙে নতুন করে ঢালাই দিতে হবে।

মন্দিরের নির্মাণাধীন ভবনে কর্মরত এক শ্রমিক নাম প্রকাশ না করার শর্তে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা দেখেছি যে পিলারগুলো ঢালাইয়ের সময় সিমেন্টের পরিমাণ কম দিয়েছে, কাজটা নরমাল করেছে, যার কারণে এমনটি হয়েছে। এছাড়া তো এমন হওয়ার কথা না। আগে কোন মিস্ত্রি এ কাজ করেছে তা আমরা জানি না। আমাদের নতুন করে এ কাজে ঠিকাদার পাঠিয়েছে, সেজন্য আমরা আসছি।’

মন্দির ব্যবস্থাপনা কমিটির লোকজনের বাধা উপেক্ষা করে ঠিকাদারের লোকজন রাতের আঁধারে পিলার ঢালাইয়ের কাজ করে বলে অভিযোগ করেছেন স্বর্ণাকাক্সক্ষা কেন্দ্রীয় মাতৃমন্দির কমিটির সাধারণ সম্পাদক জনার্দন চন্দ্র রায়। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমাদের মন্দিরের নতুন ভবন নির্মাণের কাজ চলছে। বর্তমানে মন্দিরের আরসিসি পিলারগুলো ঢালাইয়ের কাজ চলছে। সর্বশেষ ঈদের এক দিন আগে পিলার ঢালাই দেয় মিস্ত্রি। আমরা সে সময় তাদের নিষেধ করেছিলাম, যেহেতু রাত হয়ে গেছে তাই রাতে না দিয়ে দিনে ঢালাই দেওয়ার জন্য। কিন্তু তারা আমাদের কথায় কোনো কর্ণপাত না করে রাত ১২টা পর্যন্ত ঢালাইয়ের কাজ করে চলে যায়। ঈদের চার দিন পর তারা আরসিসির কাঠের বক্সগুলো খুললে আমরা দেখি যে আরসিসি পিলারগুলো সম্পূর্ণ ড্যাম ও এমনিতেই খুলে পড়ছে।’

সদ্য ঢালাই দেওয়া পিলারগুলোর কিছু কিছু অংশ ভেঙে পড়তে দেখে নির্মাণকাজ তদারকির দায়িত্বে থাকা সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীকে খবর দেন জানিয়ে জনার্দন চন্দ্র আরও বলেন, ‘এরপর তিনি (প্রকোশলী) এসে হাতুড়ি দিয়ে সব আরসিসি পিলার পিটিয়ে দেখে ছয়টি পিলার ড্যাম দেখতে পান। সেগুলো তিনি লাল চিহ্ন দিয়ে দেন এবং ঠিকাদারকে সেগুলো ভেঙে দিয়ে নতুন করে করার নির্দেশনা প্রদান করেন। যেহেতু এটি একটি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, সব সম্প্রদায় ধর্মের প্রতি দুর্বল। তাই আমরা চাচ্ছিলাম যেন মন্দিরের কাজ সুন্দরভাবে ও সুষ্ঠুভাবে হোক।’

নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহারের অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে মন্দির ভবন নির্মাণের দায়িত্বে থাকা ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান মোজাফফর রহমান কনস্ট্রাকশন ফার্মের স্বত্বাধিকারী ইমরান হাবিব রিমন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমি চারটি মন্দিরের কাজ পেয়েছি, তার মধ্যে হিলির চুড়িপট্টিতে সর্বশেষ মন্দিরের নির্মাণকাজ চলছে, বাকিগুলোর কাজ শেষ হয়ে গেছে। ঈদের আগে আমি মিস্ত্রিকে সিমেন্টসহ অন্যসব প্রয়োজনীয় দ্রব্য দিয়ে বলেছিলাম যে কয়টি পিলার ঢালাই দিতে পারো সেগুলো সম্পূর্ণ করো। কিন্তু আমার কথা না শুনে তারা পাঁচটি পিলার ঢালাই দিয়েছে, এর আগে কিছু পিলার ঢালাই দেওয়া ছিল। পাঁচটি পিলার ঢালাই দেওয়ার পর মন্দির কমিটির লোকজন তাদের বলে সন্ধ্যা হয়ে গেছে আর ঢালাই না দেওয়ার জন্য। কিন্তু আমার ও মন্দির কমিটির কথা না শুনে তারা ঢালাই দেয়। পরে মন্দির কমিটির পক্ষ থেকে কাজ ভালো হয়নি মর্মে আমার কাছে অভিযোগ দেয়। পরে আমি নিজেও এসে কাজ ভালো হয়নি দেখতে পাই। এরপর ইঞ্জিনিয়ার এসে ছয়টি পিলারের কাজ খারাপ হয়েছে মর্মে লাল চিহ্ন দিয়ে যান এবং সেগুলো নতুন করে নির্মাণের কথা বলেন। পরে তার দেওয়া নির্দেশনা অনুযায়ী ছয়টি পিলার ভেঙে নতুন করে নির্মাণ করে দেওয়া হচ্ছে।’

এ প্রসঙ্গে ধর্ম মন্ত্রণালয়ের রংপুর বিভাগের দায়িত্বে থাকা প্রকৌশলী আমিনুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ওখানে কাজ নিম্নমানের হয়েছিল, সে কারণে তারা আমার কাছে রিপোর্ট করেছিল। একজন প্রকৌশলী হিসেবে আমার দায়িত্ব ছিল সেটি দেখার। আমি সেখানে গিয়ে কাজ খারাপ পেয়েছি, যার কারণে পিলারগুলো ভেঙে দিয়েছি এবং সেগুলো নতুন করে করার জন্য ঠিকাদারকে নির্দেশনা দিয়েছি। সে অনুযায়ী সেগুলো ভেঙে দিয়ে আবার নতুন করে নির্মাণ করছে।’