১৪ আগস্ট ১৯৭৫। আমার ছাত্রজীবনের শেষ দিন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার মাস্টার্সের ভাইভা পরীক্ষা ছিল সেদিন। পরের দিন সকাল ৮টায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আসবেন। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর তিনি আর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আসেননি। মাসব্যাপী এর প্রস্তুতি চলছে। আমাদের কলাভবনে লেগেছে নতুন রঙের আঁচড়। বাংলা বিভাগের প্রফেসর ড. মনিরুজ্জামান স্যার ঝকঝকে, পরিচ্ছন্ন কলাভবনের দিকে তাকিয়ে মনের আনন্দে বলে উঠলেন, ‘আরে! এতো দেখছি ইংল্যান্ডের বাকিংহাম প্যালেস!’ শিক্ষক, শিক্ষার্থী, কর্মচারী সব স্তরের মানুষের মধ্যে একটা উৎসবের আমেজ। স্বাধীনতার সূতিকাগার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে জাতির পিতা আসবেন। রেজিস্ট্রার ভবনটিও সুন্দর করে সাজানো হয়েছে। জাতির পিতার আগমনের বেশ কিছুদিন আগে থেকেই ভাইস চ্যান্সেলর ড. আব্দুল মতিন চৌধুরী স্যারের নেতৃত্বে শিক্ষকদের মহড়া চলছে। শিক্ষকরা সারিবদ্ধভাবে দাঁড়ান। ভিসি স্যার প্রতিদিন এসে শিক্ষকদের নির্দেশনা দিয়ে যান। প্রিয় নেতাকে অভ্যর্থনা জানাতে কী যে এক উত্তেজনা দেখেছি ভিসি স্যারের মধ্যে! আমাদের কাজ ছিল প্রতিদিন দোতলার বারান্দায় দাঁড়িয়ে এসব আয়োজন দেখা আর সেই কাক্সিক্ষত ক্ষণ গোনা।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে আমার অবশ্য আরও আগেই বিদায় বলার কথা ছিল। আমি ১৯৭৩ ব্যাচের মাস্টার্স পরীক্ষার্থী ছিলাম। মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ এবং একই কারণে সেশন জটে পড়ে ছাত্রত্ব দু’বছর দীর্ঘায়িত হয়েছে। তাতে লাভ যেটা হলো, জাতির পিতাকে অভ্যর্থনার বিশাল আয়োজনের প্রত্যক্ষদর্শী হওয়ার সুযোগ পেলাম। ভেতরে ভেতরে একটা উত্তেজনাও কাজ করল। প্রিয় নেতাকে যে আরেকবার খুব কাছ থেকে দেখার সুযোগ পাব! যদিও ভাইভা পরীক্ষার কারণে জাতির পিতার আগমন উৎসবে নিজেকে সেভাবে সম্পৃক্ত করতে পারিনি। আগামীকাল সকাল ৮টায় বিশ্ববিদ্যায়ের আঙিনায় মহান নেতার শুভ পদার্পণ ঘটবে। এই ক্ষণটি দেখার জন্য অধীর আগ্রহে উৎসুক হয়ে আছি। মহান এই নেতাকে একাধিকবার দূর ও কাছ থেকে দেখার বিরল সৌভাগ্যবানদের একজন আমি। ৭ই মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণ দিতে দেখেছি খুব কাছ থেকে। ঐ দিন সকাল ১০টায় ইকবাল হল থেকে মিছিল নিয়ে রেসকোর্স ময়দানের বক্তৃতা মঞ্চের খুব কাছে গিয়ে বসেছিলাম। মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে শুনেছি সেই মহান বাণী ‘তোমাদের যা কিছু আছে, তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবেলা করতে হবে।... এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম। এবারের সংগ্রাম, স্বাধীনতার সংগ্রাম। জয় বাংলা।’
দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১০ জানুয়ারি একইভাবে নেতার স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের দিনও মঞ্চের কাছাকাছি বসেছিলাম। শুনেছিলাম তার আবেগঘন ভালোবাসার বাণী। ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর বাংলাদেশ সফরের সময় রেসকোর্স ময়দানে নান্দনিক ইন্দিরা মঞ্চ তৈরি থেকে শুরু করে দুই নেতার ঐতিহাসিক ভাষণ শোনা পর্যন্ত সব আয়োজনের প্রত্যক্ষ সাক্ষী হয়েছিলাম আমি। ১৯৭৩ সালে আরেকবার নেতাকে খুব কাছ থেকে দেখার সুযোগ হয়েছিল। বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের জাতীয় সম্মেলনে প্রধান অতিথি হয়ে এসেছিলেন বঙ্গবন্ধু। রেসকোর্স ময়দানে হয়েছিল বিশাল প্যান্ডেল। আমি ছাত্র ইউনিয়নের কর্মী। ছাত্র নেতা
নূহ-উল-আলম লেনিনকে অনুরোধ করে গার্ড অব অনার দলে নাম লেখালাম। বঙ্গবন্ধুকে সামরিক কায়দায় গার্ড অব অনার দেওয়া হবে। আবার সুযোগ হবে নেতাকে কাছ থেকে দেখার। কিন্তু বাদ সাধল আমার দৈহিক গড়ন। আমি ছোটখাটো মানুষ। বাছাইয়ে তাই বাদ পড়ে গেলাম। এ কাজে লম্বা ও শক্ত সামর্থ্য ছাত্র দরকার। আমার যে কোনোটাই নেই। মনটা ভীষণ খারাপ হলো। তবে কি মহান নেতাকে কাছ থেকে দেখার সুযোগ হবে না? মন খারাপ নিয়েই এদিক ওদিক ঘুরছি। লেনিন ভাই ডেকে নিয়ে বললেন ভলান্টিয়ার দলে যোগ দিতে। নেতা যে পথ দিয়ে মঞ্চে উঠবেন, সে পথের ভিড় সামলানোই হবে আমার কাজ। কী সৌভাগ্য আমার! এ যে মেঘ না চাইতেই জল! মহান নেতা দৃপ্তপদে মঞ্চের দিকে এগিয়ে আসছেন। ধবধবে সাদা পায়জামা-পাঞ্জাবি পরিহিত শালপ্রাংশু দেহ। কাছাকাছি আসতেই ভয়ে ভয়ে হাতটা বাড়িয়ে দিলাম তার দিকে। আমাকে অবাক করে তিনি সহাস্যে হাতে হাত রাখলেন! আমার দেহে বিদ্যুতের শিহরণ খেলে গেল। সেটাই ছিল নেতাকে আমার প্রথম এবং শেষ স্পর্শ। প্রধান অতিথির ভাষণে বঙ্গবন্ধুর একটি কথা আজও স্পষ্ট মনে আছে, ‘আমার পরিণতি যদি চিলির সালভাদর আলেন্দের মতোও হয়, তবুও আমি সমাজতান্ত্রিক ন্যায়াদর্শ থেকে একচুল পরিমাণ বিচ্যুত হব না।’ কী দার্ঢ্য উচ্চারণ! তিনি চেয়েছিলেন সমাজের ছোট-বড় সব মানুষের সমান অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আমি ছিলাম বঙ্গবন্ধুর বড় ছেলে শেখ কামালের ইয়ার মেট। কামাল ছিলেন সমাজ বিজ্ঞানের ছাত্র। আমি বাংলার। তবে আমাদের সাবসিডিয়ারি বিষয় ছিল রাষ্ট্রবিজ্ঞান। সেই সুবাদে তার সঙ্গে কিছুদিন ক্লাস করাও হয়েছে। কলাভবনের দোতলার বড় হল রুমটায় সাবসিডিয়ারি ক্লাস নিতেন প্রফেসর মোজাফ্ফর আহমেদ চৌধুরী স্যার। ছাত্রদের মাঝে তিনি ‘ম্যাক’ স্যার নামে পরিচিত ছিলেন। বাংলাভাষার মতো করেই সহজ ইংরেজিতে লেকচার দিতেন ম্যাক স্যার। শেখ কামাল বন্ধু পরিবেষ্টিত হয়ে চলতেন। তবে স্যারের ক্লাসে দেখেছি এক মনোযোগী কামালকে। সবসময় মনোযোগ সহকারে ম্যাক স্যারের লেকচার শুনতেন। খুব আমুদে মানুষ ছিলেন কামাল। ছিলেন ক্রীড়ামোদী ও ক্রীড়া সংগঠক। তার এই খেলোয়াড়ি প্রতিভার যথাযথ সদ্ব্যবহার হয়েছিল ‘র্যাগ ডে’ অনুষ্ঠানে। ওই আয়োজনের মূল উদ্যোক্তা ছিলেন কামাল। অমন আনন্দমুখর ‘র্যাগ ডে’ আর কখনো দেখিনি। র্যাগ ডে-তে আমিও অংশ নিয়েছিলাম। অনুষ্ঠানের রং আমার গায়েও লেগেছিল। এক আনন্দময় অনুভূতি গ্রাস করেছিল আমার সত্তাকে। বঙ্গবন্ধুর বিশ্ববিদ্যালয়ে আগমনের আয়োজনেও বড় ভূমিকায় ছিলেন কামাল।
ভাইভা পরীক্ষা শেষ করে হলে না ফিরে নারায়ণগঞ্জের বাড়িতে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিই। অনেক দিন বাবা-মাকে দেখি না। রুমমেট শৈলেনকে বললাম, ‘তুমি হলে চলে যাও। আমি রাতটা বাড়িতে কাটিয়ে আসি। ভোর ৬টা ১০-এর ট্রেন ধরে সময় মতো চলে আসব। তুমি চিন্তা কোরো না।’ তীব্র উত্তেজনায় রাতে ভালো ঘুম হলো না। ভোর ৫টায় বিছানা ছাড়লাম। মা আমাকে বাসি ভাত খেতে দিলেন। তৈরি হয়ে যেই খেতে বসেছি, দেখি আমাদের দোকানের কর্মচারী আলতাফ হন্তদন্ত হয়ে ছুটে আসছে। এসেই আমাকে বলল, ‘কাকা ঢাকায় গিয়া করবেন কী? শেখ সাহেব তো আর নাই। তার আন্ডা-বাচ্চা সবই খতম।’ আলতাফের বলা কথাগুলো বুলেট হয়ে বিঁধল আমার বুকে। ভাতের থালা সরিয়ে উঠে দাঁড়ালাম। ওর কথাগুলো বিশ্বাস হচ্ছে না। কাউকে কিছু না বলে ছুটলাম চাষাড়া রেল স্টেশনের দিকে। চড়ে বসলাম ঢাকাগামী ট্রেনে। রেল কামরায় যাত্রীরা সব বসে আছেন। কারও মুখে রা-শব্দটি নেই। বজ্রাহত মৃত মানুষ যেমন ঠায় দাঁড়িয়ে থাকে, তেমন। উদ্বিগ্ন আমি তখনো অবিশ্বাস্যের দৃষ্টিতে চেয়ে আছি মুখগুলোর দিকে। ফতুল্লা স্টেশন ছাড়িয়ে গে-ারিয়া স্টেশনে পৌঁছতেই আর্মিরা ট্রেন থামিয়ে দিল। যাত্রীরা ভয়ে চলচ্ছক্তিহীন স্থাণু হয়ে কামরায় বসে রইলেন। আমি হিতাহিত জ্ঞানশূন্য হয়ে নেমে পড়লাম। আমাকে যে প্রাণপ্রিয় নেতার আগমন অনুষ্ঠানে যোগ দিতেই হবে। রিকশায় চেপে বসে রিবশাওয়ালাকে বললাম, ‘জোরে চালাও।’
আমার বোন নুরজাহানও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজ বিজ্ঞান বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রী। সে থাকে শামসুননাহার হলে। দীর্ঘদিন যাবৎ সে রিউমেটিক ফিভারে ভুগছিল। গত সপ্তাহে তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করিয়েছি। আমার রিকশা শহীদ মিনারের কাছে পৌঁছাতেই আর্মিরা পথরোধ করল। জানিয়ে দিল, কলাভবনে যাওয়া যাবে না। অগত্যা আমি চলে এলাম হাসপাতালে বোনের কাছে। আমাকে দেখে নুরজাহান হাউমাউ করে কেঁদে উঠল। বলল, ‘ভাইয়া, সবাই শেষ। কেউ আর বেঁচে নেই। মর্গে গিয়ে দেখে এসো।’ উ™£ান্ত অবস্থায় মর্গে গিয়ে জানালা দিয়ে যা দেখলাম, তার জন্য একেবারেই প্রস্তুত ছিলাম না। দেখি আব্দুর রব সেরনিয়াবাতের রক্তাক্ত লাশ। পাশে কন্যা বেবী সেরনিয়াবাতের নিথর দেহ। আমার চোখ খুঁজতে লাগল পিতাকে। পাশের একজন যখন বললেন, তাকে আনা হয়নি এখানে। তখনই আমার সম্বিত ফিরে এলো। কঠিন বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে উপলব্ধি করলাম, নগ্ন, নির্মম কালো হাত রাতের অঁাঁধারে ট্রিগার টিপে পিতার বুক ঝাঁঝরা করে দিয়েছে। তাকে অভ্যর্থনার সব আয়োজন পণ্ড হয়ে গেছে। পিতা আসেননি। তিনি আর কোনো দিন আসবেন না।
লেখক : সাহিত্যিক ও সভাপতি, বঙ্গবন্ধু পরিষদ, লৌহজং