ভালো নেই ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলায় মৃত্যুর দুয়ার থেকে ফিরে আসা মাহাবুবা পারভীন। ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের দ্রুত আইনের আওতায় এনে ফাঁসি কার্যকর করার দাবি জানিয়েছেন তিনি।
মাহবুবা পারভীনের শরীরের অবস্থাও বেশি ভালো নয়। এক পাশ ফিরে শুয়ে থাকতে হয়। বেশিরভাগ সময় তাকে বিছানায় শুয়ে কাটাতে হয়। এখনো চিকিৎসা চলছে।
গ্রেনেড হামলায় আহত হওয়ার পর থেকেই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিয়মিত তার খোঁজ-খবর নেন। তাকে চিকিৎসা ভাতা প্রদান করা হয়েছে।
মাহাবুবা পারভীন বলেন, ‘গ্রেনেড হামলায় আহত হয়ে যখন আমি পড়েছিলাম, সবাই ভেবেছিল মাহাবুবা বেঁচে নেই। কিন্তু আমার নেত্রী বঙ্গবন্ধু-কন্যা শেখ হাসিনা বোর্ড বসিয়ে আমার চিকিৎসার ব্যবস্থা করেছেন। উন্নত চিকিৎসার জন্য তিনি আমাকে বিমানে করে কলকাতার পিয়ারলেস হাসপাতালে পাঠিয়েছেন। এরপর দেশে ফিরলে ২০১৩ সালেও সিএমএইচ হাসপাতালে পুরো শরীর চেকআপ করিয়েছেন।’
তিনি বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রতিনিয়ত আমার খোঁজ-খবর নেন। আমার নেত্রী খোঁজ-খবর নিয়েছে বলেই এখনো বেঁচে আছি; না হলে কবেই হার্ট অ্যাটাক করে মারা যেতাম।’
‘তিনি (প্রধানমন্ত্রী) আমাকে চলার জন্য এককালীন ১০ লাখ টাকার পারিবারিক সঞ্চয়পত্র করে দিয়েছেন। এরপর আবারও গণভবনে ডেকে ১০ লাখ টাকার চেক দিয়েছেন। পাশাপাশি থাকার জন্য মিরপুরে ১৪০০ স্কয়ার ফিটের একটি ফ্ল্যাট উপহার দিয়েছেন’ যোগ করেন তিনি।
তবে মাহাবুবা পারভীনের দুঃখ স্থানীয় সংসদ সদস্য কিংবা দলীয় নেতৃবৃন্দ তার কোনো খোঁজ-খবর নেন না। এমনকি কোনো মিটিং-মিছিলেও তাকে ডাকেন না। অসুস্থ হয়ে ঘরে শুয়ে-বসে থাকলে ভালো না লাগায় এখনো দলীয় বিভিন্ন কর্মসূচির খবর শুনলেই তিনি ছুটে যান সেখানে যোগ দিতে।
তবে তার ভাষায়, বর্তমানে আওয়ামী লীগের সুসময়ের কোকিলেরা তার মতো ত্যাগী কর্মীকে বসার জন্য স্টেজে একটি চেয়ারও দেয় না।
এ সময় গ্রেনেড হামলা মামলায় দণ্ডিতদের রায় কার্যকরের দাবি জানিয়ে মাহাবুবা পারভীন বলেন, ‘কালকে যদি তারেক জিয়ার ফাঁসি হয়, আমার মনে হয় আমি সুস্থ হয়ে যাবো।’
তিনি বলেন, ‘২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার মামলায় আমি বাবর, আব্দুস সালামসহ জড়িতদের বিরুদ্ধে সাক্ষী দিয়েছি এবং আদালতে বলেছি- এই হামলার মূল হোতা তারেক জিয়া কোথায়? আমি তার ফাঁসি চাই। মৃত্যুর আগে এই হামলাকারীদের ফাঁসি দেখে যেতে চাই।’
গ্রেনেড হামলায় মাহবুবা পারভীনের শরীরে ‘১৮০০ স্প্লিন্টার বিদ্ধ হলেও পরবর্তীতে পায়ের চিকিৎসা করানোর সময় তিনটি স্প্লিন্টার বের করা হয়েছে। এখনো তার ঘাড়, মাথাসহ বিভিন্ন স্থানে বাকি স্প্লিন্টার রয়ে গেছে।
তিনি বলেন, গ্রেনেড হামলায় আহত হলে হার্ট অ্যাটাক হয়। প্রায় ৭২ ঘণ্টা আইসিইউতে ভর্তি ছিলাম আমি। এরপর থেকেই শরীরের বাম পাশ প্যারালাইজড হয়ে যাওয়ায় দীর্ঘদিন ধরে হুইল চেয়ারে চলাফেরা করেছি। বর্তমানে সেই অবস্থার উন্নতি হওয়ায় লাঠিতে ভর দিয়ে চলাচল করলেও এখনো বাম পায়ের হাঁটুতে মাঝে মধ্যে কট করে শব্দ হওয়ায় মনে হয় ভেঙে যাবে। এছাড়া শুয়ে থাকলে কাত কিংবা চিৎ হতে পারি না।
কান্নাজড়িত কণ্ঠে আহত মাহাবুবা পারভীন বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আমাকে তার কন্যার মতো ভালোবাসেন। তিনি দুইবার ১০ লাখ করে ২০ লাখ টাকা অনুদান দিয়েছেন। প্রতি মাসে চিকিৎসার জন্য ১০ হাজার করে টাকা দেন।’
তিনি বলেন, ‘বর্তমানে আমি ঢাকা জেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের সহ-সভাপতি। বিভিন্ন মিটিং-মিছিল ও দলীয় কর্মকাণ্ডে অংশ নেওয়ার জন্য আমাকে ঢাকা যেতে হয়। সাভারের নেতাকর্মীদের অনেকেরই একাধিক গাড়ি থাকলেও আমার কোনো গাড়ি নেই। তাদের কাছে আমি এতই অবহেলিত যে কেউ আমার খবর নেয়নি এবং কোনো ফান্ড তৈরি করেনি। অথচ অসুস্থ হওয়ার আগে দলীয় সকল কর্মকাণ্ডে আমি সবার আগে ছিলাম।’
মাহবুবা পারভীন বলেন, আত্মীয়-স্বজনদের কাছ থেকে টাকা ধার নিয়ে বাড়ির কাজে হাত দিয়েছি। ৬তলা বিল্ডিংয়ের ফাউন্ডেশন দিলেও বর্তমানে একতলা কোনোভাবে করে নিজে থাকছি। একটি লিফট হলে আমার চলাচলে সুবিধা হতো। কিন্তু সেটাতো পরের বিষয়, টাকার জন্য সিঁড়িতে টাইলস এবং রেলিং লাগাতে পারিনি। তাই দেয়াল ধরে ধরে আমাকে নামতে হয়।
তিনি বলেন, বিভিন্ন দোকান থেকে বাকিতে মালামাল এনেছি। তারা টাকার জন্য ফোন করে। আমি যাতে ঋণগুলো পরিশোধ করতে পারি, সেজন্য দলের সিনিয়র নেতাকর্মীদের কাছে সহযোগিতা চাই।
উল্লেখ্য, ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট ঢাকার বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউয়ে আওয়ামী লীগের সভানেত্রী ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সমাবেশে নজিরবিহীন গ্রেনেড হামলা চালানো হয়। এতে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীসহ ২৪ জন নিহত হন। আহত হন কয়েকশ’ নেতাকর্মী এবং সাধারণ মানুষ।