টিকা কূটনীতিতে নতুন সংকট

করোনাভাইরাস মহামারীর সংক্রমণ থেকে সুরক্ষা দিতে নিজ নিজ দেশের নাগরিকদের জন্য করোনার টিকা নিশ্চিত করা নিয়ে পৃথিবীর সব রাষ্ট্রই একরকম প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়েছে। চাহিদার তুলনায় সময়মতো টিকার জোগানে ঘাটতি থাকায় ইতিমধ্যেই ‘টিকা জাতীয়তাবাদ’ ও ‘টিকা কূটনীতি’ বহুল আলোচিত বিষয়ে পরিণত হয়েছে। যেসব দেশ নিজেরা টিকা উৎপাদন করছে এবং যারা টিকা কেনার ক্ষেত্রে এগিয়ে আছে তারাই এক্ষেত্রে সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে। বাংলাদেশের মতো দেশগুলো, যারা নিজেরা টিকা উৎপাদন করতে পারছে না, কিন্তু টিকা কিনে নিয়ে নাগরিকদের টিকাকরণের কর্মসূচি এগিয়ে নিচ্ছে। কিন্তু চলমান এই মহামারী বিশ^ব্যাপী বিস্তৃত থাকায় টিকাকরণের প্রশ্নটিও আর স্থানীয় পর্যায়ে সীমিত নয়। টিকার বিষয়টিও বৈশি^ক। কেননা, এক দেশ থেকে আরেক দেশে যাতায়াতের ক্ষেত্রেও এখন যাত্রীরা কোন কোম্পানির টিকা নিয়েছেন সেই প্রশ্নও বড় হয়ে উঠছে। কারণ সব দেশ সব টিকার অনুমোদন দেয়নি। এটাই এখন টিকা কূটনীতির ক্ষেত্রে একটি নতুন সংকট হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।

সোমবার দেশ রূপান্তরে ‘সিনোফার্মের টিকা নিয়ে বিপাকে সৌদিগামী বাংলাদেশিরা’ শিরোনামে প্রকাশিত প্রতিবেদনে নতুন এই সংকটের কথা তুলে ধরা হয়েছে। প্রতিবেদন থেকে জানা গেছে, সৌদি আরবে ভ্রমণ বা অভিবাসনের ক্ষেত্রে দেশটির সরকার শুধু ফাইজার, মডার্না, অ্যাস্ট্রাজেনেকা ও জনসন অ্যান্ড জনসনের টিকাই অনুমোদন দিয়েছে। ফলে উল্লিখিত চারটি টিকা ছাড়া অন্য টিকা নেওয়া থাকলেও কেউ সৌদি আরবে যেতে পারবেন না। এ নিয়ম যেমন সৌদি আরবে যেতে ইচ্ছুক বাংলাদেশি শ্রমিকদের জন্য প্রযোজ্য হবে তেমনি ওমরাহ বা হজ পালনের জন্য দেশটিতে যেতে ইচ্ছুকদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হবে। এদিকে, বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত যারা টিকা নিতে পেরেছেন তাদের উল্লেখযোগ্য অংশই চীনের তৈরি সিনোফার্মের টিকা নিয়েছেন। কিন্তু চীনের তৈরি সিনোফার্ম বা অন্য কোনো টিকাই সৌদি আরবের অনুমোদিত টিকার তালিকায় নেই। ফলে, ওমরাহ ও হজ পালনে কিংবা শ্রমিক হিসেবে দেশটিতে যেতে আগ্রহীরা সংকটের মধ্যে পড়ছেন। এই পরিস্থিতিতে দ্রুত সৌদি সরকারের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে সিনোফার্মের টিকার অনুমোদন দিতে দেশটিকে রাজি করানোর জন্য তাগিদ দিয়েছে হজ এজেন্সিজ অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (হাব)। রবিবার ভার্চুয়ালি অনুষ্ঠিত এক সেমিনারে এ আহ্বান জানানো হয়েছে। সেমিনারে যুক্ত হয়ে জেদ্দায় বাংলাদেশ হজ কাউন্সেলর মো. জহিরুল ইসলাম আশাবাদ ব্যক্ত করেন যে, এখনই বিষয়টি নিয়ে উদ্যোগী হলে সিনোফার্মের টিকার বিষয়ে সৌদি সরকার ইতিবাচক সিদ্ধান্ত নিতে পারে।

রবিবার বার্তা সংস্থা বাসসের খবরে বলা হয়েছে, দেশে এ পর্যন্ত করোনার টিকার ২ কোটি ২৪ লাখ ডোজ প্রয়োগ করা হয়েছে। এর মধ্যে প্রথম ডোজ নিয়েছেন ১ কোটি ৬৬ লাখ ৬১ হাজার ৪১২ জন এবং দ্বিতীয় ডোজ নেওয়া সম্পন্ন করতে পেরেছেন মোট ৬৫ লাখ ৭৫ হাজার ৪৭৩ জন। অন্য এক হিসাব থেকে জানা যায়, গত ১৩ আগস্ট পর্যন্ত বাংলাদেশে চীনের তৈরি সিনোফার্মের টিকা এসেছে মোট ১ কোটি ৪৫ লাখ ৭০ হাজার ডোজ। প্রাপ্যতা বেশি থাকায় এখন দেশে সিনোফার্মের টিকাই বেশি প্রয়োগ করা হচ্ছে। ফলে এই সংকটের সুরাহা করতে সৌদি আরব এবং চীনসহ সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সঙ্গে কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদার করা দরকার বাংলাদেশের। সময়মতো এটা করা না গেলে হজ-ওমরাহ কিংবা অভিবাসন প্রত্যাশী শ্রমিকদের জন্য সৌদি সরকার নির্ধারিত ফাইজার, মডার্না, অ্যাস্ট্রাজেনেকা, জনসন অ্যান্ড জনসন এসবের যেকোনো একটি টিকা দেওয়ার বিশেষ উদ্যোগ নিশ্চিত করতে হবে।

নির্দিষ্ট একটি টিকার বিষয়ে সৌদি আরবের অনুমোদন থাকা না থাকা নিয়ে এই সংকটটি সামনে এলেও এই সংকটের সম্ভাব্য সবদিক নিয়ে গুরুতর পর্যালোচনা প্রয়োজন। কেননা, দেশে এখন পর্যন্ত দেওয়া টিকা এবং আগামীতে দেওয়া হবে এমন টিকার মধ্যে বেশিরভাগই চীনের তৈরি। ফলে শুধু সৌদি আরব গমনেচ্ছুদের বেলায় নয়, চীনের টিকা অনুমোদন করেনি এমন দেশগুলোতে যেতেও সমস্যায় পড়তে পারেন বাংলাদেশিরা। এমতাবস্থায় দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ নাগরিকদের টিকাকরণে টিকা সংগ্রহ ও টিকা প্রয়োগের প্রচেষ্টায় বিভিন্ন দেশের অনুমোদনবিষয়ক সংকটের বিষয়টি মাথায় রাখা প্রয়োজন। উল্লেখ্য, রবিবার মন্ত্রিপরিষদের বৈঠকে দেশে গণটিকাকরণের কাজ এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে দুই ডোজ টিকার ব্যবধান কমিয়ে আনার উপায় খোঁজার নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। একই দিনে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন, আপাতত আর কোনো গণটিকা কর্মসূচি হচ্ছে না, টিকার প্রাপ্যতা সাপেক্ষে আগাম নিবন্ধন করেই টিকা নিতে হবে আগ্রহীদের। স্বাস্থ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন, সেপ্টেম্বরের মধ্যেই ফাইজারের ৬০ লাখ টিকা দেশে আসবে এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মাধ্যমে আরও সাড়ে ১০ কোটি টিকা কেনার অর্ডার ইতিমধ্যেই দেওয়া হয়ে গেছে। স্বাস্থ্যমন্ত্রী আশা প্রকাশ করেছেন, এসব টিকা হাতে এলে আগামী জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি নাগাদ সাত থেকে আট কোটি মানুষকে টিকার আওতায় আনা যাবে। হার্ড ইমিউনিটি গড়ে তোলার লক্ষ্যে এই গণটিকাকরণের আলোচনায় টিকা কূটনীতির প্রাসঙ্গিক বিষয়গুলো নিয়েও ভাবতে হবে।