‘আমি শোষিতের পক্ষে’

কী চমৎকার মুকুট মাথায় নিয়েছ প্রিয় নেতা আমার! ‘ফাদার অব দ্য নেশন-বঙ্গবন্ধু’, শেখ মুজিবুর রহমান। এভাবে তোমায় সম্বোধন না করলে, আত্মমর্যাদা প্রতিষ্ঠিত হয় না। কারণ তোমার মুকুটের গৌরব আমরাও বহন করি। যারা তোমায় এ নাম ঘরে ডাকে না তাদের মনোজগৎ আমরা সঙ্গে সঙ্গে শনাক্ত করতে পারি। এত আলো তোমার ঐ নামে।

তোমার যখন পূর্ণ যৌবন, আমরা তখন শিশু-কিশোর। ১৯৭১ সাল, বাংলাদেশের প্রসব যন্ত্রণা শুরু হয়ে গেছে। প্রচন্ড রক্তপাতের মধ্য দিয়ে এক অভূতপূর্ব জাতির উদ্বোধন হলো। ‘জয় বাংলা’ কণ্ঠের সবচেয়ে উচ্চৈঃস্বরে পৌঁছে আকাশ বাতাস কাঁপিয়ে উচ্চারণ করে দেখো এই সেøাগান, এখনো কেমন চঞ্চল হয়ে ওঠে রক্তস্রোত! ওঠে না? তবে তুমি ইতিহাস পড়োনি। পড়লেও ভুল ব্যাখ্যায় পড়েছ। আবার পড়ো, মনের সব ক’টা জানালা খুলে দিয়ে সংস্কারমুক্ত হয়ে পড়ো।

রাজনীতি নোংরা শুধু নয়, নৃশংসও। সে যেমন তখনো, এখনো। বঙ্গবন্ধু কি আর এসব জানতেন না? নিশ্চয় জানতেন। বাংলায় একটা শব্দ আছে, ‘পোড়-খাওয়া’। তিনি ছিলেন সেই রকম নেতা, তার সবই জানা ছিল। তরুণ মুজিবুর রহমান তখন কলকাতায় পড়তে গেছেন। চোখ-কান খোলা, সজাগ চৈতন্য তার। ধর্মনিরপেক্ষতার পক্ষে আরও পরে তিনি দেশকে জাগিয়ে তুলবেন, কিন্তু এখনই বুঝতে পারছেন, পিছিয়ে পড়া যে সমাজ থেকে তিনি উঠে এসেছেন সে সমাজের লোকেদের এগিয়ে নিতে হলে আরও সক্রিয়, রাজনীতিতে আরও সোচ্চার হতে হবে। তিনি ব্রিটিশ-ভারতে মুসলমানদের জন্য স্বতন্ত্র রাজনৈতিক সংগঠন ‘নিখিল ভারত মুসলিম লীগে’ যোগ দিলেন। এই পর্যন্ত পড়ে মনে একটা খটকা আসে, বঙ্গবন্ধু কেন দেশভাগকে সমর্থন করলেন? এটা বোঝার জন্য সে সময়টাকে বুঝতে হয়। জানতে হয় কী টালমাটাল ছিল ভারতবর্ষের রাজনৈতিক মানচিত্র আর ব্রিটিশদের শাসন, কুশাসন। কোনো ষড়যন্ত্র-তত্ত্বের দরকার হয় না, ইতিহাস থেকেই বেশ বোঝা যায়, সংবেদনশীল তরুণ মুজিব তখন দু’হাত দিয়ে এই মহাপ্রলয়কে ঠেকাতে চাইলেও পারতেন না। ভারত ভাগের পরপরই ১৯৪৮ সালে মুজিব জিন্নাহ’র চাতুরী দেখছেন, কোণঠাসা সোহরাওয়ার্দীকে দেখছেন, গদি আর ক্ষমতার জন্য ইঁদুর দৌড়ও দেখছেন। আর বুঝে গেছেন পূর্ববঙ্গের মুসলমানদের, বলা ভালো পূর্ববঙ্গীয়দের জাতীয়তাবাদের সংগ্রাম শেষ নয়, শুরু হলো মাত্র। তারপর কত ত্যাগে, কত বিচক্ষণতায়, ডান-বামের কত আন্তর্দেশীয় হিসাব কষে তাকে, মাতৃভূমিকে মুক্তির চরম শিখরে নিয়ে যেতে হয়েছে, ইতিহাস তা জানে। নয় মাস দেশবাসী যুদ্ধ করেছে তুমুল ঐক্যবদ্ধতায় কারাবন্দি সেই এক এবং অদ্বিতীয় নেতার নামে।

চলে যাই ৭ই মার্চ, ১৯৭১-এ। নেতা নয়, যেন কবি এসে ভাষণ নয়, কবিতা পড়বেন। সবাই হাজির সেই গণসমুদ্রে। কবি উচ্চারণ করলেন সেই অমোঘ বাণী, অমর কাবিতা: ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’ ‘ভায়েরা আমার’ বলে কবি যখন হুংকার দিলেন তা যে কেমন রাজনৈতিক ভারসাম্য ধরে রাখল, তখন তর্ক করলেও এখন আমরা সেটা বুঝি। ঐ সময় বঙ্গবন্ধুর একটি কথার এদিক-ওদিক হলে বাঙালি মুক্তিসেনাদের ‘বিচ্ছিন্নতাবাদী’, ‘সন্ত্রাসী’ তকমা দিয়ে পাকিস্তানি সেনাদের গণহত্যাকে হালাল করার চেষ্টা করা হতো।

কিছু অকৃতজ্ঞ রাজাকার, আলবদরদের কথা এখন না লিখলেই নয়। বঙ্গবন্ধু এভাবে স্বাধীনতার ডাক না দিলে বাঙালিদের হয়তো এখনো কাশ্মীরী কিংবা প্যালেস্টাইনিদের মতো অকাতরে প্রাণ বিলিয়েই যেতে হতো। ভাবতে অবাক লাগে এখনো পঙ্গপালেরর মতো এত এত অকৃতজ্ঞরা রয়ে গেল কী করে? যারা নিজ দেশের নেতাকে চেনে না, মানে না, স্বীকার করে না। যারা এখনো কুতর্ক করে মুজিব বাকশাল করেছে, একনায়কতন্ত্র করেছে, কেন করেছে ইত্যাদি, ইত্যাদি। অথচ, নিমকহারামের মতো আমরা তো প্রিয় নেতার স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের মাত্র আড়াই বছরের মাথায় ১৯৭৫-এর ১৫ই আগস্ট তার শোবার ঘরে ঢুকে তাকে সপরিবারে মেরে ফেললাম।

শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশের কাদামাটি থেকে তৈরি হওয়া একজন বিশ^নেতা। মানুষের মুক্তি চাইতেন বলেই তিনি সমাজতন্ত্র বুঝতেন। বাম-রাজনীতির ফ্যাশনের দিকটি ধরতে পেরে কত আগেই সেটা খারিজ করে দিয়েছিলেন। দেশের মানুষকে, সমাজ আর সংস্কৃতিকে কত ভালো চিনেছিলেন তিনি সেটা স্পষ্ট হয় তার প্রতিটি ভাষণে, তার লেখা বইগুলোতে। আন্তর্জাতিক মঞ্চে নতুন বাংলাদেশেকে তিনি দাঁড় করালেন ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র হিসেবে। ‘সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে শত্রুতা নয়’ এই হলো বাংলার জীবনদর্শন থেকে পাওয়া শেখ মুজিবের বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক সম্পর্কের নীতি। শেখ মুজিবের অগ্রসর চিন্তায় আস্থা রেখে মুসলিম বিশ্ব, পরাশক্তির বাইরে থাকা তৃতীয় বিশ্ব তাকে নেতা মানলেন। মুজিব পরিষ্কার দেখলেন পৃথিবীতে মানুষের মধ্যে দুটো ভাগ আছে: একটা শোষকদের, অন্যটা শোষিতদের। কই তিনি তো বলেননি, একটা মুসলিমদের, অন্যটা অমুসলিমদের, একটা সাদাদের অন্যটা কালোদের। তিনি সঠিক জায়গায় অঙ্গুলি নির্দেশ করলেন, শোষক আর শোষিতের দিকে। ধর্ম, বর্ণ, জাত, পাত, ডান, বাম সব ময়লা সরিয়ে পোড়-খাওয়া সত্যাদর্শী এই নেতা বললেন: ‘আমি শোষিতের পক্ষে’। কেঁপে উঠল সাম্রাজ্যবাদী শক্তি। কিছুতেই শোষিতের পক্ষের অকুতোভয় এই নেতাকে আর বাড়তে দেওয়া যায় না। আন্তর্জাতিক মুরব্বিদের ভাড়াটে গু-ার কাজটি করল দেশীয় দালালরা। আমাদের প্রিয় নেতাকে এরা হত্যা করল। শয়নকক্ষ থেকে ঘুম ভেঙে উঠে এসে সিঁড়ির গোড়ায় দাঁড়িয়ে তিনি খুনিদের জিজ্ঞেস করলেন, ‘কী চাস তোরা’? সেই বজ্রকণ্ঠে থমকে যাওয়ার আগেই মন্ত্রপড়া খুনির দল ব্রাশফায়ার করল। পিঠে নয়, বুকে গুলি নিয়ে ঐ সিঁড়িতে, ৩২ নম্বরের সিঁড়িতে লুটিয়ে পড়ল বঙ্গবন্ধুর দেহ। আর কলঙ্কের লাল দাগে দাগি হয়ে রইল বাঙালি।

কিন্তু মুজিব কি মরে? মুজিবদের কি মেরে ফেলা যায়? মুজিব মিশে আছে বাঙালির আত্মায়। প্রাণ চলে যায়, দেহ ক্ষয় হয়, কিন্তু আত্মা অবিনশ্বর। সে আর কেউ না জানুক, সবচেয়ে ভালো জানে মুজিব-বিরোধীরা। মুজিবের সংগ্রাম ছিল শোষিতের পক্ষে, এই মূল সত্যটি বুঝে ভবিষ্যতের বাংলাদেশকে এগিয়ে নিতে হবে। সামরিক, বেসামরিক, রাজনৈতিক, অরাজনৈতিক সব শক্তির জন্য বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সম্মান জানানোর এটিই শ্রেষ্ঠ প্রেরণা : ‘আমরা শোষিতের পক্ষে’।

লেখক : সাংবাদিক