করোনা নিয়ন্ত্রণে দেশে দফায় দফায় দেওয়া লকডাউনের সুফল মিলতে শুরু করেছে। সর্বশেষ গত ১ জুলাই থেকে ১০ আগস্ট পর্যন্ত দুই দফায় ৩৩ দিন লকডাউন দেয় সরকার। এর ফলে সংক্রমণ কমে এসেছে। রোগী ও মৃত্যুর সংখ্যাও কমেছে; বিশেষ করে পরীক্ষা অনুপাতে শনাক্তের হার গত ২৪ ঘণ্টায় গত দুই মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে চলে এসেছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, প্রতিবার লকডাউনের কারণে সংক্রমণের ঊর্ধ্বগতি রোধ করা গেছে। পরে লকডাউন শিথিল হওয়ায় সংক্রমণ কিছুটা বাড়লেও সংক্রমণের গতি ছিল ধীর। এতে করোনায় মৃত্যুসহ ক্ষয়ক্ষতি কিছুটা হলেও কমানো গেছে। তবে প্রতিবারই লকডাউন শিথিলের পর স্বাস্থ্যবিধি না মানার কারণে আবারও সংক্রমণ বেড়েছে।
সর্বশেষ টানা ১৯ দিনের কঠোর লকডাউন শেষ হয় ১০ আগস্ট। এ সময় অন্য যেকোনো সময়ের চেয়ে মানুষ বিধিনিষেধ বেশি মেনেছে। সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে এর সুফলও মিলতে শুরু করেছে।
১৬ দিন ধরে লকডাউন শিথিল করা হয়েছে। এ সময় ১০ আগস্ট শেষ হওয়া ১৯ দিনের লকডাউনের তুলনায় রোগী, মৃত্যু ও শনাক্তের হার আশাব্যঞ্জক হারে কমেছে। ১৯ দিনের লকডাউন চলাকালে যেখানে দৈনিক রোগী শনাক্ত হয়েছে ১২ হাজারের ওপরে; সেখানে শেষ ১৬ দিনে দৈনিক রোগী শনাক্ত কমে প্রায় অর্ধেকে, অর্থাৎ ৬ হাজারে এসে দাঁড়িয়েছে। একইভাবে ১৯ দিনের লকডাউনের সময় যেখানে দৈনিক ২৩৬ জন করে মারা গেছে; গত ১৬ দিনে দৈনিক মৃত্যু কমে দাঁড়িয়েছে ১৬১ জনে; বিশেষ করে দৈনিক শনাক্তের হার ২৮ থেকে কমে ১৮ শতাংশে এসেছে।
সংক্রমণ কমে আসাকে লকডাউনের সুফল বলে মনে করছেন সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) উপদেষ্টা ও সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. মুশতাক হোসেন। তিনি গতকাল বৃহস্পতিবার রাতে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘লকডাউনের প্রভাব এখন দেখা যাচ্ছে। শেষ লকডাউনের সময় আগের যে শিথিলতা ছিল, সেটার প্রভাব পড়েছিল ও সংক্রমণ বেড়েছে। এখন লকডাউনের সুফল দেখতে পাচ্ছি। এখন সংক্রমণ ও মৃত্যু নিম্নমুখী। এই মাসের শেষের দিকে মৃত্যুর সংখ্যা আরও কমে যাবে। সংক্রমণও কমবে। কিন্তু এখন যে শিথিল সময় চলছে, এটার কারণে সংক্রমণ বাড়ে কি না, তা আগামী মাসের প্রথম দিকে বোঝা যাবে।’
এই বিশেষজ্ঞ বলেন, ‘বিধিনিষেধের মধ্য দিয়ে আমরা যদি দেশের বিভিন্ন স্থানের গুচ্ছ সংক্রমণ বা সংক্রমণের ক্লাস্টারগুলো ধ্বংস করতে পারি, তাহলে সেখান থেকে সংক্রমণ ধীরে ধীরে বাড়বে। ক্লাস্টার ভাঙলে এক-দুজন করে রোগী পাওয়া যাবে। কিন্তু ক্লাস্টার থাকলে ওই এলাকায় একসঙ্গে অনেক মানুষ আক্রান্ত হবে। যেমন ৫০ থেকে ১০০ জন, ১০০ থেকে ২০০ জন, দ্রুত জ্যামিতিক হারে বেড়ে যায়। আর যেখানে ক্লাস্টার থাকে না, সেখানে খুবই অল্পসংখ্যক, যেমন একজন থেকে একজন বা দেড়জন সংক্রমিত হয়। এভাবে বাড়তে বাড়তে বিপদমাত্রায় উঠতে সময় লাগে। কিন্তু একসঙ্গে যদি অনেক মানুষ আক্রান্ত হয়, তখন হাসপাতালের ওপর চাপ বাড়ে। মৃত্যুও বাড়ে।’
ডা. মুশতাক হোসেন আরও বলেন, বিধিনিষেধের মধ্য দিয়ে যদি গুচ্ছ গুচ্ছ সংক্রমণ বা ক্লাস্টার নিয়ন্ত্রণ হয়ে থাকে, তাহলে সংক্রমণ ধীরে ধীরে বাড়বে। আর যদি ক্লাস্টার নিয়ন্ত্রণ করা না যায়, তাহলে সংক্রমণ দৃশ্যমানভাবেই বাড়বে।
শেষ হওয়া বিধিনিষেধের মধ্য দিয়ে গুচ্ছ সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ করা গেছে কি না, জানতে চাইলে এই বিশেষজ্ঞ বলেন, ‘সব জায়গায় ক্লাস্টার নিয়ন্ত্রণ করতে পারিনি। কোনো কোনো জায়গায় হয়েছে। কিন্তু অনেক জেলায় গুচ্ছ সংক্রমণ দৃশ্যমান, সেটা ওই জেলার সংক্রমণ হার দেখলেই বোঝা যায়।’
এই বিশেষজ্ঞ পরামর্শ দিয়ে বলেন, ‘সংক্রমণের নিম্নগতি অব্যাহত রাখতে এখন যেখানেই সংক্রমণ পাওয়া যাবে, সেখানেই স্বাস্থ্য বিভাগকে আগুন নেভানোর মতো নিয়ন্ত্রণে ঝাঁপিয়ে পড়তে হবে। আমাদের এখানে জেলাভিত্তিক যেন সংক্রমণ আর না বাড়ে ও যে জেলাগুলোয় সংক্রমণ বেশি, সেগুলোকে চিহ্নিত করে সেসব জেলায় দ্রুত র্যাপিড রেসপন্স টিম পাঠিয়ে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। এখন টার্গেট করে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে যেতে হবে। কিছুতেই গুচ্ছ সংক্রমণ বাড়তে দেওয়া যাবে না। গুচ্ছ সংক্রমণ ভেঙে দিতে হবে।’
গুচ্ছ সংক্রমণ ভাঙতে হলে জনবল দরকার বলে মনে করেন এই বিশেষজ্ঞ। তিনি বলেন, ‘স্বাস্থ্য বিভাগের জনবলের পাশাপাশি প্রচুর ভলান্টিয়ার নিতে হবে। তাহলে আমরা নিরাপদ থাকতে পারব। এরপর সংক্রমণ কিছুটা বাড়লেও মৃত্যুটা বাড়বে না।’
দুই দফার লকডাউন শেষে সংক্রমণ কমেছে : দেশে শেষ ৩৩ দিনের দুই দফায় লকডাউনের কারণে করোনা সংক্রমণ কমেছে। প্রথম লকডাউন হয় গত ১-১৪ জুলাই টানা দুই সপ্তাহ। আগের শিথিলের কারণে এই ১৪ দিনে সংক্রমণ বাড়ে। তখন গড়ে দৈনিক রোগী শনাক্ত হয়েছে ১০ হাজার ৪৪৯ জন করে এবং মারা গেছেন ১৮২ জন করে। এ সময় দৈনিক গড় শনাক্তের হার ছিল ৩০ শতাংশ।
পরে ১৫-২২ জুলাই আট দিন কোরবানি ঈদের কারণে লকডাউন শিথিল করা হয়। এ সময় আগের দুই সপ্তাহের লকডাউনের সময়ের চেয়ে দৈনিক রোগী ও শনাক্তের হার কমে। কিন্তু মৃত্যু বেড়ে যায়। এই আট দিনে দৈনিক গড়ে রোগী শনাক্তের সংখ্যা ছিল ১০ হাজার ৮৩, দৈনিক গড় মৃত্যু ছিল ২০৪ জন ও শনাক্তের হার ছিল ২৬ শতাংশ।
কোরবানির ঈদের জন্য আট দিন শিথিল করার কারণে পরে সংক্রমণ আরও বেড়ে যায়। শেষ দফায় গত ২৩ জুলাই থেকে ১০ আগস্ট পর্যন্ত একটানা ১৯ দিন লকডাউন চলে দেশে। কিন্তু এ সময় সংক্রমণ অন্য যেকোনো সময়ের চেয়ে বেড়ে যায়। তখন দৈনিক গড় রোগী শনাক্তের সংখ্যা ছিল ১২ হাজার ৪২৭ ও মৃত্যু ছিল ২৩৬। আগের চেয়ে দৈনিক গড় শনাক্তের হার বেড়ে ২৮ শতাংশ হয়।
অবশ্য শেষ দফার লকডাউনের কারণে ১৬ দিন ধরে সংক্রমণ কমতে শুরু করেছে। এই ১৬ দিনে দৈনিক গড়ে রোগী শনাক্ত হয়েছে আগের চেয়ে অর্ধেক, অর্থাৎ ৬ হাজার ৬৪৪ জন করে এবং দৈনিক গড় মৃত্যু কমে ১৬১ জনে নেমে এসেছে; বিশেষ করে দৈনিক গড় শনাক্তের হার কমে দাঁড়িয়েছে ১৮ শতাংশে।
সংক্রমণ কমে আসছে বিভিন্ন জেলায় : স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যমতে, দেশের ৪ জেলায় সংক্রমণ ৫ শতাংশের নিচে নেমে এসেছে। এগুলো হলো নীলফামারী, জয়পুরহাট, নওগাঁ ও বান্দরবান।
সংক্রমণ ১০ শতাংশের নিচে নেমে এসেছে ৬ জেলায়। এগুলো হলো নেত্রকোনা, সিরাজগঞ্জ, বগুড়া, মেহেরপুর, চুয়াডাঙ্গা ও সাতক্ষীরা।
সংক্রমণ ১৫ শতাংশের নিচে নেমে এসেছে ২৫ জেলায়। এগুলো হলো গোপালগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ, মানিকগঞ্জ, রাজশাহী, শেরপুর, কক্সবাজার, খাগড়াছড়ি, ফেনী, কুমিল্লা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নাটোর, পাবনা, লালমনিরহাট, দিনাজপুর, গাইবান্ধা, খুলনা, মাগুরা, নড়াইল, বরিশাল, পটুয়াখালী, ভোলা, সিলেট ও সুনামগঞ্জ।
অবশ্য এখনো ১৫ শতাংশের বেশি সংক্রমণ ২১ জেলায়। এগুলো হলো গাজীপুর, মাদারীপুর, নারায়ণগঞ্জ, নরসিংদী, শরীয়তপুর, টাঙ্গাইল, ময়মনসিংহ, চট্টগ্রাম, রাঙ্গামাটি, নোয়াখালী, লক্ষ্মীপুর, চাঁদপুর, পঞ্চগড়, কুড়িগ্রাম, ঠাকুরগাঁও, বাগেরহাট, ঝিনাইদহ, কুষ্টিয়া, পিরোজপুর ও ঝালকাঠি।
দুই মাসে সর্বনিম্ন মৃত্যু : গত ২৪ ঘণ্টায় দেশে করোনায় আরও ১০২ জনের মৃত্যু হয়েছে। সর্বশেষ ২৬ জুন এরচেয়ে কম ৭৭ জনের মৃত্যু হয়েছিল। এ নিয়ে মোট মৃত্যু হয়েছে ২৫ হাজার ৭২৯ জন।
এ সময় মৃত্যুর সংখ্যার পাশাপাশি শনাক্ত রোগীর সংখ্যাও কিছুটা কমে এসেছে। গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন রোগী শনাক্ত হয়েছে ৪ হাজার ৬৯৮ জন। সব মিলিয়ে দেশে এ পর্যন্ত করোনা শনাক্ত হয়েছে মোট ১৪ লাখ ৮২ হাজার ৬২৮ জন ।
গত ২৪ ঘণ্টায় ৩৩ হাজার ৬৪০ জনের নমুনা পরীক্ষা করে দেশে ৪ হাজার ৯৬৬ জনের মধ্যে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ধরা পড়েছে। মৃত্যু হয়েছে ১১৪ জনের। তাতে দৈনিক শনাক্তের হার ছিল ১৪ দশমিক ৭৬ শতাংশ, যা ১৫ জুনের পর সর্বনিম্ন। সেদিন ২৩ হাজার ২৬৫ জনের নমুনা পরীক্ষা করে ৩ হাজার ৩১৯ জনের মধ্যে সংক্রমণ ধরা পড়েছিল। শনাক্তের হার ছিল ১৪ দশমিক ২৭ শতাংশ। তারপর জুলাই মাসের বেশিরভাগ সময় এই হার ৩০ শতাংশের আশপাশে ছিল। পরে ১ আগস্ট থেকে করোনার সংক্রমণের হার কমতে শুরু করে। এর আগের দিন ৩১ জুলাই পরীক্ষা অনুপাতে রোগী শনাক্তের হার ছিল ৩০ দশমিক ২৪ শতাংশ। পরদিন তা কিছুটা কমে দাঁড়ায় ২৯ দশমিক ৯৭ শতাংশ। এরপর থেকেই দৈনিক শনাক্তের হার কমতে থাকে। সর্বশেষ গত ২৪ ঘণ্টায় এই হার আরও কমে ১৪ দশমিক ৭৬ শতাংশে নেমে আসে; অর্থাৎ গত ১০ সপ্তাহে সংক্রমণের হার ১৫ শতাংশের নিচে নামল।