একটি সরকারি প্রতিষ্ঠানের কিছু যন্ত্রপাতি ক্রয় প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে কথিত প্রি-শিপমেন্ট (প্রাক-জাহাজীকরণ) দেখতে যুক্তরাষ্ট্রে যান তিন কর্মকর্তা। বিদেশ সফরে যাওয়া এই কর্মকর্তাদের দাপ্তরিক কাগজপত্রে যন্ত্রপাতি সরবরাহ করা প্রতিষ্ঠানটি যুক্তরাষ্ট্রের ক্যারোলিনায় অবস্থিত বলে উল্লেখ করা হয়। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে জাহাজ মেরামতের জন্য এসব উপকরণ যে প্রতিষ্ঠান থেকে কেনা হয়েছে তা সিঙ্গাপুরের একটি কোম্পানির। ফলে প্রি-শিপমেন্ট পরিদর্শন সিঙ্গাপুরেই হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু প্রকৃত তথ্য গোপন করে সিঙ্গাপুরের বদলে যুক্তরাষ্ট্র সফরে যাওয়ার এমন কর্মকাণ্ডে সরকারের আর্থিক ক্ষতি হয়েছে ২৪ লাখ টাকা। ঘটনাটি ঘটেছে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের অধীন প্রতিষ্ঠান চট্টগ্রাম বন্দর কর্র্তৃপক্ষে (চবক)। বিল অব এন্ট্রি এবং শিপিং ডকুমেন্টস সংক্রান্ত কাগজপত্র ঘেঁটে এমনই তথ্য পায় খোদ সরকারেরই দায়িত্বশীল আরেকটি সংস্থা।
তবে এখানেই শেষ নয়। মাইক্রোবাস ভাড়ার বিল পরিশোধের ক্ষেত্রেও বন্দর কর্র্তৃপক্ষের অনিয়মের বিস্তর অভিযোগ তুলে ধরেছে সরকারি ওই সংস্থাটি। সরকারের নিয়মের ব্যত্যয় ঘটিয়ে তিন বছরে ৪৪টি মাইক্রোবাস ভাড়ার নামে ২০ কোটি ৪১ লাখ ৩৫ হাজার ২৭৫ টাকা পরিশোধ করেছে চবক। এরমধ্যে ১০ কোটি ৯০ লাখ ৯৫ হাজার ২৯৫ টাকাই নিয়মের বাইরে গিয়ে পরিশোধ করা হয়েছে।
সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, চট্টগ্রাম বন্দর কর্র্তৃপক্ষের মেরিন প্রকৌশল বিভাগ থেকে নিউমুরিং লঞ্চ-১-এর ডকিং মেরামতের জন্য কিছু যন্ত্রপাতি কেনা হয়। সিঙ্গাপুরের কামিনস লিমিটেড থেকে এসব উপকরণ কেনা হয়। সেই হিসেবে সিঙ্গাপুরের ওই কোম্পানির কারখানাতে এসব মালামাল দেখতে যাওয়ার কথা কর্মকর্তাদের। কিন্তু তারা সেখানে যাননি। ৭ দিনের জন্য ৩ কর্মকর্তা কাগজপত্রে গিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রে। ‘যুক্তরাষ্ট্র পরিদর্শনকারী’ দল তাদের প্রতিবেদনে বলেছে, মেইন ইঞ্জিন ও আনুষঙ্গিক যন্ত্রাংশের প্রাক-জাহাজীকরণ পরিদর্শন ইঞ্জিন প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান যুক্তরাষ্ট্রের নর্থ ক্যারোলিনায় অবস্থিত কামিনস কারখানায় অনুষ্ঠিত হয়। নিয়ম অনুযায়ী সেসব যন্ত্রপাতির প্রাক-জাহাজীকরণ দেখতে তিনজন কর্মকর্তার যুক্তরাষ্ট্র ভ্রমণের সব ব্যয়ভার বহন করা হয়েছে সরকারের কোষাগার থেকে।
কিন্তু বিল অব এন্ট্রি এবং শিপিং ডকুমেন্টস সংক্রান্ত কাগজপত্রে দেখা যায়, কামিনস মেরিন প্রোপালসন ইঞ্জিন, গিয়ার বক্স, প্রোপেলার মিব্রল মালামালগুলো সিঙ্গাপুর থেকে শিপমেন্ট হয়েছে। এতে প্রমাণিত হয় সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের প্রি-শিপমেন্ট প্রতিবেদন সঠিক নয়। ফলে সিঙ্গাপুর থেকে শিপমেন্ট হওয়া যন্ত্রপাতি পরিদর্শনের জন্য যুক্তরাষ্ট্র ভ্রমণের বিল দেওয়ার সুযোগ নেই। অথচ ইতিমধ্যে এই খাতে যন্ত্রপাতি সরবরাহকারী ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান মেসার্স আরডেন্ট মেরিন লিমিটেডকে ২৪ লাখ টাকা বিল পরিশোধ করা হয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, মিথ্যা ঘোষণা দিয়ে এ ধরনের ভ্রমণের ফলে সরকারের রাজস্ব ক্ষতি হয়েছে। সেই সঙ্গে জেনারেল ফিন্যান্সিয়াল রুলস বিধি ১০(২) লঙ্ঘন করে প্রয়োজনের অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করা হয়েছে। চুক্তির সুনির্দিষ্ট শর্ত (পিসিসি) এর ১.১ ধারার ব্যত্যয় হয়েছে। এছাড়া সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা আদৌ যুক্তরাষ্ট্র ভ্রমণ করেছেন কি না তা নিয়েও যথেষ্ট সন্দেহ আছে।
এদিকে চবকের মাইক্রোবাস ভাড়ার বিল পরিশোধের ক্ষেত্রেও বিস্তর অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। নথিপত্র ঘেঁটে দেখা যায়, গত ৩ বছরে চট্টগ্রাম বন্দর কর্র্তৃপক্ষ নিয়মের ব্যত্যয় ঘটিয়ে কার ও মাইক্রোবাস ভাড়া বাবদ বাড়তি ১০ কোটি ৯০ লাখ ৯৫ হাজার ২০০ টাকা বিল পরিশোধ করেছে। গত তিন বছরে অর্থাৎ ২০১৭-১৮ অর্থবছর থেকে ২০১৯-২০ অর্থবছর পর্যন্ত মোট ৪৪টি মাইক্রোবাসের জন্য ২০ কোটি ৪১ লাখ ৩৫ হাজার ২৭৫ টাকায় চুক্তি করা হয়েছে। কিন্তু সরকার নির্ধারিত চট্টগ্রামের জন্য প্রতি মাসে ৬০ হাজার এবং ঢাকার জন্য প্রতি মাসে ৯০ হাজার টাকা হিসেবে ৩ বছরে ভাড়া বাবদ ব্যয় হওয়ার কথা মোট ৯ কোটি ৫০ লাখ ৪০ হাজার টাকা। এক্ষেত্রে তিন বছরে ১০ কোটি ৯০ লাখ ৯৫ হাজার ২৭৫ টাকা বেশি পরিশোধ করা হয়েছে। এর মধ্যে ২০টি মাইক্রোবাসের ভাড়ার জন্য ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ২ কোটি ৩১ লাখ ১২ হাজার ২৪০ টাকা, ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ২ কোটি ৪৭ লাখ ৭৮ হাজার ৮৪৯ টাকা ও ২০১৯-২০ অর্থবছরে ৩ কোটি ৩৮ লাখ ২৪ হাজার ৭৮০ টাকা অর্থাৎ মোট ৮ কোটি ১৭ লাখ ১৫ হাজার ৮৬০ টাকার চুক্তি করা হয়েছে। বাস্তবে এ তিন বছরে ২০টি মাইক্রোবাসের জন্য সরকারি নিয়ম অনুযায়ী ৬০ হাজার টাকা করে ৪ কোটি ৩২ লাখ টাকা ব্যয় করা যায়। এক্ষেত্রে ৩ কোটি ৮৫ লাখ ১৫ হাজার ৮৬০ টাকা বেশি খরচ করা হয়েছে। আবার আরেকটি চুক্তির মাধ্যমে ১৬টি মাইক্রোবাসের ৩৬ মাসের ভাড়া হিসেবে ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ৩ কোটি ২৯ লাখ ৬ হাজার ৭০ টাকা, ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ২ কোটি ৪৭ লাখ ৩৪ হাজার ২৬০ টাকা ও ২০১৯-২০ অর্থবছরে ২ কোটি ৯৮ লাখ ২৭ হাজার ৮৮৫ টাকা অর্থাৎ মোট ৮ কোটি ৭৪ লাখ ৬৮ হাজার ৮২৫ টাকার চুক্তি করা হয়েছে। প্রকৃতপক্ষে সরকারি বিধিমতে এক্ষেত্রে ৬০ হাজার টাকা মাসিক হিসেবে মোট ভাড়া ৩ কোটি ৪৫ লাখ ৬০ হাজার টাকা হওয়ার কথা। কিন্তু অতিরিক্ত পরিশোধ করা হয়েছে ৫ কোটি ২৯ লাখ ৮ হাজার ৮২৫ টাকা। একইভাবে আরও ৮টি মাইক্রোবাসের জন্য ২৪ মাসের ভাড়া হিসেবে মোট ৩ কোটি ৪৯ লাখ ৫০ হাজার ৫৯০ টাকার চুক্তি করা হয়েছে। সেখানে ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ১ কোটি ৭০ লাখ ৭২ হাজার ৯৯০ টাকা ও ২০১৯-২০ অর্থবছরে ১ কোটি ৭৮ লাখ ৭৭ হাজার ৬০০ টাকা। এটি ঢাকার হিসেবে সরকারি বিধিমতে প্রতি মাসে ৯০ হাজার টাকা ভাড়ায় মোট ২৪ মাসে ১ কোটি ৭২ লাখ ৮০ হাজার টাকা হওয়ার কথা। সেখানে অতিরিক্ত পরিশোধ করা হয়েছে ১ কোটি ৭৬ লাখ ৭০ হাজার ৫৯০ টাকা। এক্ষেত্রে সরকারি অর্থ খরচের জন্য মানা হয়নি জেনারেল ফিন্যান্সিয়াল রুলসের বিধি ১০ (১-৪) এবং অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে জারি করা এ সংক্রান্ত আদেশ।
এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে চট্টগ্রাম বন্দর কর্র্তৃপক্ষের সচিব ও মুখপাত্র মো. ওমর ফারুক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সব বিষয় তো মাথায় থাকে না, আপনি অফিসকালীন সময়ে ফোন করেন। এসব হয়তো আরও বছর দেড়েক আগের ঘটনা হবে।’