সমঝোতা হলো, স্বস্তি এলো কি

বরিশালের ঘটনার আপাত বিরতি ঘটল। গত কয়েক দিন পত্রিকার পাতা, টেলিভিশনের পর্দাজুড়ে সংবাদ, বিশ্লেষণ, বিতর্ক চলল অবিরাম। করোনা সংক্রমণ রোধ করতে যে কড়াকড়ি ছিল তা শিথিল হওয়ায় চায়ের দোকানে বা চায়ের টেবিলেও বিতর্ক কম ছিল না। উচ্চপর্যায়ের নির্দেশ আর হস্তক্ষেপে আমলাতন্ত্র বনাম ক্ষমতাসীন দলের দলীয় ক্ষমতার মল্লযুদ্ধে আপাত বিরতি ঘটলেও নিষ্পত্তি হয়েছে তা বলা যাবে না। বলা হয়েছে এটা নাকি ছিল ‘ভুল বোঝাবুঝি’। যা ঘটেছে তা কি ভুল কাজ ছিল, না কাজটা সঠিক কিন্তু বুঝতে ভুল হয়েছিল? এই বিচার আর করা হলো না। কিন্তু, আসুন! সব ভুলে যাই বলে মিটমাট করে ফেললে যে সব মিটে যায় না অতীতের বহু ঘটনা তার সাক্ষী। আর বরিশালে মেয়র বনাম ইউএনও বিরোধ বলে যা প্রচার হয়েছে তা তো প্রথম ঘটনা নয়। দেশের বিভিন্ন স্থানে ক্ষমতাসীন দলের প্রভাবশালী জনপ্রতিনিধি এবং প্রশাসনের মধ্যে কমপক্ষে ১৭টি ঘটনায় বিরোধের নগ্ন প্রকাশ ঘটেছে এবং আশঙ্কা করা যায় আরও ঘটবে।

পত্রিকায় সংবাদ পরিবেশনার ক্ষেত্রে সংবাদ শিরোনাম খুব গুরুত্বপূর্ণ বিষয় শুধু নয়, আকর্ষণীয় বিষয়ও বটে। যেকোনো খবরের প্রতি প্রাথমিকভাবে পাঠককে আগ্রহী করা, প্রকাশিত সংবাদের প্রতি আকর্ষণ সৃষ্টি করা, গুরুত্বপূর্ণ বিষয় পাঠকের নজরে আনা, গুরুত্বপূর্ণ বিষয়কে হালকা করে দেখানো কিংবা গুরুত্বহীন বিষয়কে আলোচনার বিষয়-বস্তুতে পরিণত করতে শিরোনাম বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। শিরোনামের কারণে কেউ বিব্রত বা কেউ উল্লসিত হন, কেউ আবার বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন। কোনো কোনো শিরোনাম পাঠক এবং রাজনৈতিক মহলে দীর্ঘদিন আলোচনার বিষয় হিসেবে থাকে। যেমন প্রখ্যাত সাংবাদিক নির্মল সেনের সেই শিরোনাম, ‘স্বাভাবিক মৃত্যুর গ্যারান্টি চাই’ আজও আলোচনায় উঠে আসে বারবার। ফলে সংবাদ পরিবেশনার ক্ষেত্রে সংবাদ শিরোনাম কী হবে তা নিয়ে গলদঘর্ম হতে হয় সম্পাদক এবং সংবাদ-সংশ্লিষ্ট দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিবর্গকে। শিরোনাম যদি ক্ষমতাসীনদের শিরঃপীড়ার কারণ হয় তাহলে বিপদ অনিবার্য। কখনো প্রশংসা, কখনো শাস্তি, কখনো হাতে ফুল, কখনো হাতকড়াপ্রাপ্তি হতে পারে শিরোনামের কারণে। ফলে সংবাদ শিরোনাম পাঠকের জন্য আগ্রিহের, সংবাদকর্মীর জন্য প্রজ্ঞার আর রাজনীতিতে উত্তেজনার উপাদান হয়ে দেখা দেয়। 

প্রশাসনে অসন্তোষ কিংবা রাজনীতিতে উত্তেজনা এ ধরনের শিরোনামে মাঝে মাঝেই পত্রিকায় সংবাদ প্রকাশিত হয়। প্রশাসনের অভ্যন্তরে অসন্তোষ হিসেবে সাধারণত সময়মতো প্রমোশন না পাওয়া, পছন্দের জায়গায় বদলি হতে না পারা ইত্যাদি বিষয়কেই উল্লেখ করা হয়। আর রাজনীতিতে উত্তেজনার বিষয়ের তো শেষ নেই। রাজনীতিতে ক্ষমতাসীনরা যা সাফল্য বলে প্রচার করে, ক্ষমতার বাইরে যারা আছেন তাদের কাছে তা ভীষণ সংশয়ের। এ নিয়ে চলে যুক্তিতর্ক, কখনো হয় ইতিহাসচর্চা কিংবা কখনো আপেক্ষিকতার বিশ্লেষণ। কে কার চেয়ে কম খারাপ, কার সময়ে কে কত খারাপ নজির স্থাপন করেছে তার পুঙ্খানুপুঙ্খ বিচার-বিশ্লেষণ চলতে থাকে। বাংলাদেশের রাজনীতিতে এ হচ্ছে সেই বিতর্ক যার কোনো সমাধান নেই এবং যা কখনো শেষ করা হবে না। কারা দলতন্ত্র শুরু করেছে এবং কারা তার চর্চা করছে, কারা আমলাতন্ত্রকে রাজনীতির ওপরে স্থান দিয়েছে এবং কারা তা প্রয়োগ করছে, কখন গণতন্ত্র নিহত হয়েছে এবং কত দিন ধরে তার লাশকে বহন করা হচ্ছে এই আলোচনা চলছে ক্লান্তিহীনভাবে। কিন্তু গণতন্ত্রের জন্য লড়াই করতে করতে যে দেশের জন্ম সে দেশে আমলাতন্ত্র কেন এত শক্তিশালী হয়ে উঠল তার কারণ কী এবং আমলাতন্ত্র দূর করে গণতান্ত্রিক বিধিব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা কীভাবে করা যায় সে কথা ক্ষমতাসীন দলের কেউই বলছেন না।  

নির্বাচনপদ্ধতি এবং নির্বাচিত প্রতিনিধিদের ব্যাপারে সচেতন মানুষের আস্থা এখন শূন্যের কোঠায়। কিন্তু জনপ্রতিনিধি হিসেবে যারা দাবি করছেন সেই সরকারদলীয় মন্ত্রী-এমপিদের ওপর সরকারের ভরসা কতটুকু তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে যখন করোনা মহামারী মোকাবিলা, ত্রাণকার্যক্রম এবং সরকারি সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের কাজ তদারকির জন্য গত এপ্রিলে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে অফিস আদেশ জারি করে ৬৪ জেলায় ৬৪ জন সচিবকে দায়িত্ব দেওয়া হয়। আগেও একবার ২০২০ সালের মে মাসে করোনাকালীন ত্রাণ বিতরণ ও মহামারী মোকাবিলায় ৬৪ জেলায় দায়িত্ব দেওয়া হয় সিনিয়র সচিব, সচিব ও সচিব মর্যাদার কর্মকর্তাদের। ক্ষমতাসীন দল ও তার শরিকদের মধ্যে তা নিয়ে অসন্তোষ থাকলেও মুখ খোলেননি কেউ। প্রবীণ নেতাদের কেউ কেউ সরকারের আমলানির্ভরতা নিয়ে হাহাকার প্রকাশ এবং তাদের অপমান ও কষ্টের কথা বলেন। কিন্তু সরকারদলীয় সংসদ সদস্যরা চুপ করেই ছিলেন। ওয়ারেন্ট অব প্রিসিডেন্স অনুযায়ী সংসদ সদস্যরা সচিবের ওপর। যারা রাজনীতিবিদ, যারা নির্বাচিত প্রতিনিধি, তাদের জন্য নির্ধারিত যে স্থান আছে, সেখানে তাদের থাকা উচিত। একসময় জেলার দায়িত্ব যে মন্ত্রীরা পালন করতেন সেটা বিক্ষোভ ও বেদনার সঙ্গেই স্মরণ করিয়ে দিয়ে অনেকেই বলেন যে, দেশে কোনো রাজনীতি নেই। কিন্তু এর দায় কার? সংসদে কীভাবে ব্যবসায়ীদের প্রাধান্য প্রতিষ্ঠিত হলো, কারা তাদের মনোনয়ন দেয়, কীভাবে তারা নির্বাচিত হয়ে আসেন সে কথা শুধু বললে চলবে না। রাজনীতির ব্যবসায়ীকরণ বা ব্যবসায়ীদের রাজনীতিকরণ বন্ধ করার উদ্যোগ না নিলে এর বিস্তার ঘটতে থাকবে। 

আমলাতন্ত্রের দাপট নিয়ে যখন সরকারি দলের নেতারা প্রশ্ন তোলেন, তখন তারা ভুলে যান যে, ২০২১-২২ অর্থবছরের বাজেটে সরকারি কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের বেতন-ভাতা বাবদ বরাদ্দ করা হয়েছে ৭১ হাজার ৩৫০ কোটি টাকা, যা পরিচালন বাজেটের ১৯ শতাংশ। আর পেনশন বাবদ রাখা হয়েছে ৭.৭ শতাংশ অর্থাৎ বাজেটের চার ভাগের এক ভাগের বেশি (২৬ দশমিক ৮ শতাংশ) রাখা হয়েছে কর্মরত ও অবসরপ্রাপ্ত পাবলিক সার্ভেন্টদের বেতন-ভাতা ও পেনশনের জন্য। ২০১৪-১৫ অর্থবছরে বেতন-ভাতায় ব্যয় বরাদ্দ ছিল ২৮ হাজার ৮২০ কোটি টাকা। ধারণা করা হচ্ছে, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে তা দাঁড়াবে ৯২ হাজার টাকার বেশি। গত এক দশকে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা খাতে সরকারের ব্যয় বাড়বে ২২১ শতাংশ। অন্যদিকে কৃষি এবং স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ কিন্তু ৫ শতাংশের বেশি বাড়ছে না। তাহলে গুরুত্ব কার তা পরিষ্কার। আমলারা যেভাবে খুশি থাকতে চেয়েছেন, সেভাবেই খুশি রাখার ব্যবস্থা করা হচ্ছে?

সরকারের আমলানির্ভরতার সমালোচনা হচ্ছে সরকারি দল থেকেই। এমনও মন্তব্য এসেছে যে, ‘মাঠে খেলছেন আমলারা। রাজনীতিবিদরা সাইডলাইনে বসে খেলা দেখছেন।’ কিন্তু প্রশ্ন হলো, রাজনীতিবিদরা কেন রাজনীতিতে নেই? আমলারা কেন তা দখল করছেন? শাসক দল কথায় কথায় সংবিধানের দোহাই দেয়। এই সংবিধান অনুযায়ী দেশের মালিক হচ্ছেন জনগণ। তাহলে জনগণের ভোটে নির্বাচিতদেরই দেশ পরিচালনার কথা। আসল প্রশ্নটা হলো, বর্তমান সংসদের এমপি বা সরকারের মন্ত্রীদের কি সত্যিকারের জনপ্রতিনিধিত্ব করার নৈতিক ম্যান্ডেট আছে? এ প্রশ্নের উত্তর জনগণ যেমন জানেন, তার চেয়ে অনেক বেশি জানেন আমলারা। কী পরিমাণ ভূমিকা পালন করেছেন তারা সেটা তাদের চেয়ে আর বেশি কে জানে? ফলে কে বড় আমলা না জনপ্রতিনিধি এই দ্বন্দ্বে সংবিধান দেখিয়ে কাজ হবে কি?

আর এখন এটা তো সবাই জানে, এখন প্রশাসনের সচিব বা পদস্থ কর্মকর্তাদের অনেকেই অবসরের পর রাজনীতিতে যোগ দিয়ে এমপি, মন্ত্রী হতে চান। তাই তারা প্রস্তুতি শুরু করেন সরকারি চাকরিতে থাকার সময়ই। চাকরিরত অবস্থায় রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ছেন। পদমর্যাদা কাজে লাগিয়ে নিজ নিজ সম্ভাব্য নির্বাচনী এলাকায় টার্গেট করে উন্নয়নকাজে বরাদ্দ দিচ্ছেন। সভা-সমাবেশে অংশ নিয়ে নিচ্ছেন, চাকরিবিধি লঙ্ঘন করে রাজনৈতিক বক্তব্য দিচ্ছেন। এ ক্ষেত্রে যিনি যত বেশি সাহসী তিনি তত প্রশংসা পাচ্ছেন। অনেকের ক্ষেত্রে আবার ছাত্রজীবনে তার দলীয় পরিচয় কর্মজীবনে খুঁটির জোর হিসেবেও কাজ করে থাকে। 

এবারের ঘটনা যে বরিশাল নিয়ে সেখানের মেয়র রাষ্ট্রক্ষমতার কেন্দ্রের সঙ্গে আত্মীয়তার সূত্রে ঘনিষ্ঠ, সেটা সবাই জানে। তারপরও সদরের নির্বাহী কর্মকর্তা মেয়রের বিরুদ্ধে মামলা করেছেন। তার অর্থ তারও খুঁটির জোর আছে। তাকে বিরোধী দলের তকমা দেওয়া কঠিন, কারণ ওই নির্বাহী কর্মকর্তার ছাত্রজীবনে ছাত্রলীগের সম্পৃক্ততার প্রামাণ্য রেকর্ড আছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে যে দুটি মামলা হয়েছে তা কি কোনো ধরনের ইশারা ছাড়া হয়েছিল? উত্তর হবে, না। লক্ষণীয় বিষয়, ঘটনাটি কিন্তু শুধু উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার মধ্যে সীমিত থাকেনি। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে পুলিশ প্রশাসন। সরকারি তরফের মামলার একজন হচ্ছেন কোতোয়ালি থানার ওসি। প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ অনুমোদন কি ছিল না প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরের? তাহলে কি দীর্ঘদিন ধরে মেয়র পরিবারের বিরুদ্ধে যে বিক্ষোভের কথা শোনা যায় এ ঘটনা তার বহিঃপ্রকাশ? গায়ের জোরে ও প্রশাসনিক কারসাজিতে নির্বাচিত হওয়ার যে সংস্কৃতি শুরু হয়েছে বরিশালের মেয়র নির্বাচন তার থেকে ভিন্ন কিছু নয়। বাসদ প্রার্থী মনীষা চক্রবর্তী তো প্রামাণ্য দৃষ্টান্ত দেখিয়েছিলেন। একজন নির্বাচন কমিশনারও নির্বাচন দেখে বিব্রত হয়েছিলেন। কিন্তু কিছু করতে পারেননি। শক্তির কাছে জনগণের অসহায়ত্বের কাছে এক করুণ উদাহরণ হয়ে আছে সেই নির্বাচন।

উত্তেজনা ও দ্বন্দ্ব মিটে গেল, মামলা প্রত্যাহার হচ্ছে কিন্তু মানুষ যে ময়লার গন্ধে, যানবাহন বন্ধের কারণে কষ্ট ভোগ করল, তারা কী পেল? প্রশাসন এবং ক্ষমতাসীন দল দুজনই শক্তি পরীক্ষা করেছে আর জনগণ শুধু চাপ সহ্য করে যাবে। এ অবস্থা আর কত দিন চলবে? সরকারি কর্মচারী যে দলীয় কর্মী নন তারা প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী, তারা থাকবেন তাদের প্রশাসনিক বিধিবিধান অনুযায়ী দায়বদ্ধ আর রাজনৈতিক দল থাকবে জনগণের কাছে দায়বদ্ধ। একটি সুষ্ঠু, অবাধ নির্বাচনের মাধ্যমে রাজনৈতিক দলের জবাবদিহির পরীক্ষা যত দিন না হবে, তত দিন এ ধরনের মল্লযুদ্ধের দর্শক হয়ে জনগণকে ভোগান্তি সহ্য করতেই হবে।  

লেখক রাজনৈতিক সংগঠক ও কলামনিস্ট

  rratan.spb@gmail.com