তারুণ্যের কবি নজরুল। যৌবনের প্রতীক নজরুল। তার সুর ও বাণী তারুণ্যকে প্রবলভাবে প্রভাবিত করে। অফুরন্ত প্রাণশক্তি রয়েছে নজরুলের গানের সুর ও বাণীতে। তিনি বিদ্রোহের প্রতীক। তার বিদ্রোহী চেতনা তারুণ্যর কাছে পাথেও। নজরুলের তারুণ্যের কথা নতুন করে বলার কিছু নেই। তার গান ও কবিতায় তারুণ্যের আবেশ ছড়িয়ে রয়েছে প্রতিটি পঙ্ক্তিতে পঙ্ক্তিতে। বাংলা সংগীতের অন্যতম স্তম্ভ নজরুলগীতি বা নজরুল সংগীত। সাড়ে তিন হাজারের বেশি গান রচনা ও সুর করেছেন মহান এই কবি। আগে শুধু নজরুল সংগীতশিল্পীরাই নজরুল সংগীত পরিবেশন করতেন, কালে-ভদ্রে আধুনিক গানের শিল্পীরাও। ভারতের প্রখ্যাত শিল্পী মোহাম্মদ রফি ও বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন কণ্ঠশিল্পী রুনা লায়লাও গেয়েছেন।
ব্যান্ড মিউজিকের শিল্পীরা যে গাইতে পারেন তা অনেকের ভাবনাতেই ছিল না। নজরুলের হাই বিটের গানগুলো ব্যান্ডসংগীতের সঙ্গে মানানসই। আর তারুণ্য সে গানই বেছে নিয়েছে সময়ের প্রয়োজনে। অনেক দেরিতে হলেও শুরু হয়েছে ব্যান্ড মিউজিকে নজরুলের গানের চর্চা। ব্যান্ডের মাধ্যমে নজরুলকে জানতে পারছে এ প্রজন্মের তরুণরা। পরিবর্তিত বিশ্বরাজনীতিতে নজরুলের গানগুলো অনেক বেশি প্রাসঙ্গিক। নজরুলের এই বিদ্রোহী গানের মধ্যে লুকিয়ে আছে তারুণ্যের প্রাণ। মুক্তির আকাক্সক্ষা। কভিড-পরবর্তী নিও নরমাল পৃথিবীতে নজরুল শুধু বাংলাদেশের ব্যান্ড বা তারুণ্যের জন্যই অপরিহার্য নয়। সারা পৃথিবীর মুক্তিকামী মানুষের জন্য সহায়ক। মুক্তির প্রত্যাশায় নজরুলের সাম্যবাদের কাছে ফিরে যেতে হবে বদলে যাওয়া নতুন পৃথিবীতে।
আমাদের যেকোনো আন্দোলন-সংগ্রাম বাদ-প্রতিবাদের হাতিয়ার বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের জাগরণের গান ‘চল্ চল্ চল্’। এ গানটি বাংলাদেশের রণসংগীত হিসেবে স্বীকৃত। আজ থেকে প্রায় ১০০ বছর আগে নজরুল যে গান রচনা করেছেন তা এ সময়েও অনেক বেশি আধুনিক। ব্যান্ডসংগীতের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ। বর্তমান সময়ে প্রতিনিয়ত নজরুল সংগীতকে আমরা পাচ্ছি ভিন্ন মাত্রায় ব্যান্ড মিউজিকে। কখনো ইনস্ট্রুমেন্টাল কখনো বা মডার্ন রূপে। নজরুলের গানকে ভিন্নমাত্রা দিয়েছে কয়েকটি ব্যান্ড। কিছু কিছু নজরুল সংগীতের কথা ও সুরে ফুটে ওঠে প্রতিবাদ ও বিদ্রোহ, যা ব্যান্ডসংগীতের জন্য মানানসই। নজরুল সংগীতকে তারা তাদের মতো করে পরিবেশন করছে। চল্ চল্ চল্ গানটি অনেক ব্যান্ডই পারফর্ম করছে।
পথ দেখিয়েছে আর্টসেলের ‘কা-ারী হুঁশিয়ার’। ব্যান্ডটি ‘রক ৩০৩’ নামের ব্যান্ড মিক্সড অ্যালবামের মাধ্যমে প্রকাশ করে। অনেক জনপ্রিয়তা পায় ২০০৯ সালে প্রকাশিত গানটি। আর এভাবেই খুলে যায় নজরুল সংগীত নিয়ে নতুনভাবে কাজ করার দুয়ার। ব্যান্ড দৃক অনলাইনে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ঝরনার মতো চঞ্চল কালজয়ী গানটির রক ভার্সন প্রকাশ করেছে। তখন থেকে আজ পর্যন্ত প্রতিটি কনসার্টে তারা বিদ্রোহী কবির গানটি পরিবেশন করছে। পপ, রক, মেটাল, হেভি মেটালসহ সব ঘরানার ব্যান্ডই পরিবেশন করছে জাতীয় কবির গান। নজরুলের গানকে ভিন্ন আঙ্গিকে রূপ দিয়েছে অনেক ব্যান্ড। ৯০ দশকের মেলোডিয়াস ব্যান্ড ডিফারেন্ট টাচ টিভি লাইভে মাঝে মাঝে নজরুল সংগীত পরিবেশন করছে। করছে আরও অনেকেই। নব্বই দশকের শুরুতে সিম্ফনি গেয়েছে ‘বিদ্রোহী কবির স্মরণে’ শিরোনামে গান।
কাজী নজরুল ইসলামের ১১৪তম জন্মজয়ন্তীতে বাংলাদেশের শীর্ষস্থানীয় ১৪টি ব্যান্ডের ১৪ জন কণ্ঠশিল্পী একসঙ্গে কণ্ঠ দিয়েছেন নজরুলের রণসংগীত ‘চল্ চল্ চল্ ঊর্ধ্ব গগনে বাজে মাদল’ গানে। এ তালিকায় আছেন মাকসুদ ও ঢাকা ব্যান্ডের মাকসুদ, মাইলসের ইকবাল আসিফ জুয়েল, অর্থহীনের রাফা, আর্টসেলের লিংকন, পাওয়ার সার্চের জামশেদ, নিমিসিসের জোহানসহ অনেকেই। গানের সংগীতায়োজন করেছেন মাইলসের ইকবাল আসিফ জুয়েল। মিউজিক ভিডিও নির্মাণ করেছেন অর্থহীন ব্যান্ডের রাফা। গানটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেইসবুক, ইউটিউব, টুইটারসহ বিভিন্ন ওয়েবসাইটে পাওয়া যাচ্ছে। মাইলস ব্যান্ডের গিটারিস্ট ইকবাল আসিফ জুয়েল মনে করেন, নজরুলের গানগুলো খুবই আধুনিক এবং রক ঘরানার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ, আমার ধারণা তিনি এ সময়ে জন্মগ্রহণ করলে ব্যান্ড মিউজিককেই সাপোর্ট করতেন। তার গানগুলো ডিমান্ড করে রক মিউজিক।
নতুন আঙ্গিকে নজরুলগীতিকে শ্রোতাদের কাছে পৌঁছে দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের ‘রবি ও নবীন’ ব্যান্ড। সংগীতশিল্পী সৌমিত্র রায় বলেন, এর আগে কোনো ব্যান্ড নজরুলগীতি নিয়ে এভাবে কাজ করেনি। নতুন প্রজন্মের শ্রোতাদের কথা মাথায় রেখেই আমাদের রেকর্ডিং হয়েছে ভিন্ন স্বাদের। স্ক্র্যাচ রেকর্ডিং আমরা নজরুলগীতি বিশেষজ্ঞ কয়েকজনকে শুনিয়েছিলাম। তারাও তাদের ভালো লাগার কথা আমাদের জানিয়েছেন। বলেছেন, এমন কাজ নজরুলকে নিয়ে আগে হয়নি। অ্যারেঞ্জমেন্ট এবং প্রেজেন্টেশনের দিক দিয়ে নজরুলগীতির প্রথাগত গায়কি থেকে বেশ আলাদা ‘রবি ও নবীন’র এই নজরুলগীতি। ‘দূর দ্বীপবাসিনী’ নামের এই অ্যালবামে নজরুলগীতি পরিবেশিত হয়েছে কিছুটা রকসংগীতের মতো করেই।
শুরুতে তাদের সংশয় ছিল ব্যান্ড আঙ্গিকে নজরুলের গান নজরুল সংগীত গবেষক ও বিশিষ্ট শিল্পীরা পছন্দ নাও করতে পারেন। নজরুল সংগীতশিল্পী ফাতেমা-তুজ-জোহরা ব্যান্ড শিল্পীদের নজরুলের গান শুনেছেন এবং প্রশংসাও করেছেন। উৎসাহ দিয়েছেন চালিয়ে যেতে। শ্রোতাদের কাছ থেকে শুভ ইঙ্গিত পাচ্ছে ব্যান্ডগুলো। কনসার্টে অনুরোধ আসে নজরুলের গান পরিবেশনের। পাশাপাশি অভিযোগও উঠেছে গানগুলো নষ্ট হচ্ছে না তো? মহান এই কবি অনুমতি দিয়ে গেছেন তার পরের প্রজন্মকে তার গানকে ভেঙে গড়ার। ভেঙে গড়তে গিয়ে গানের মৌলিকত্ব নষ্ট হচ্ছে কি না সে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। ভেঙে গড়ার বা ফিউশন করার যোগ্যতা কি সবার থাকে? এমন অনেক প্রশ্ন অভিযোগ-অনুযোগকে সঙ্গে নিয়েই এগিয়ে চলছে দুরন্ত গতিতে ব্যান্ডসংগীতে নজরুলচর্চা। আগ্রহী হচ্ছে নতুন নতুন ব্যান্ড নজরুলের কালজয়ী গানগুলো করতে। পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশ দুই বাংলাতেই তার গানের চর্চা করছেন ব্যান্ডশিল্পীরা।
রবীন্দ্র সংগীতের রক্ষণাবেক্ষণের জন্য রয়েছে বিশ্বভারতী (রবীন্দ্রভারতীয়) কর্র্তৃপক্ষ। রবীন্দ্র সংগীতের কোনো সুর ও বাণী এমনকি বাদ্যযন্ত্র ব্যবহারে কোনো ধরনের বিকৃত বা যথাযথ মনে না হলে রবীন্দ্রভারতীয় হস্তক্ষেপ করে। এমন একাধিক নজির রয়েছে। নজরুল সংগীতের জন্য রয়েছে নজরুল ইনস্টিটিউট, বাংলাদেশ। নজরুলের গানের সুর ও বাণী বিকৃতি রক্ষার্থে তাদের তৎপরতা ততটা দৃশ্যমান নয়। এই গান নিয়ে দর্শক শ্রোতাদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া রয়েছে। অনেকেই মনে করেন নজরুল যেভাবে গান করেছেন সেভাবেই হওয়া উচিত। তার গানে আধুনিক বাদ্যযন্ত্র ব্যবহারের প্রয়োজন নেই। অসাধারণ সৃষ্টি নষ্ট করার অধিকার কারও নেই। নজরুল শুধু আমাদের জাতীয় সম্পদই না, নজরুল বিশ্ববাসীর সম্পদ।
লেখক : সাংবাদিক ও কলামনিস্ট
hindol_khan@yahoo.com