কাবুল বিমানবন্দরে আইএস হামলায় শতাধিক মানুষ নিহত হওয়ার পর ঘরে-বাইরে সব জায়গায় চাপের মুখে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন। নিজের ওপর যে চাপ বাড়ছে তা নিজেও ভালো করেই জানেন বাইডেন। গত বৃহস্পতিবার সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য দেওয়ার সময় বাইডেনের কম্পিত কণ্ঠস্বর ও দৈহিকভাবে ঝুঁকে পড়া অঙ্গভঙ্গিই বলে দিচ্ছিল, কতটা পরাস্ত তিনি। কাবুলে আইএস হামলায় শুধু নিরীহ আফগানরাই নিহত হয়নি, যুক্তরাষ্ট্রের ১৩ সেনাও নিহত হয়েছে। আফগানিস্তানে গত ২০ বছরে তালেবান হামলায় একত্রে এতসংখ্যক যুক্তরাষ্ট্রের সেনা নিহত হয়নি।
হোয়াইট হাউজে সংবাদ সম্মেলনকে কেন্দ্র করে জাতির উদ্দেশে বক্তব্য দেওয়ার আগমুহূর্তে বাইডেন কিছু সময় নীরবতা পালন করেন। এরপরই তাকে সাংবাদিকরা প্রশ্নবাণে জর্জরিত করতে থাকে। ২০ বছরের অভিযান রাতারাতি বন্ধ করে দেওয়া এবং কাবুলে এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে তা গোয়েন্দাদের কাছে তথ্য থাকার পরও কেন ঘটনা এড়ানো যায়নি, এমন অনেক প্রশ্নের মুখোমুখি হন তিনি। বিশ্লেষকরা বলছেন, কোনো সন্দেহ নেই কাবুল বিমানবন্দরে হামলার ঘটনা বাইডেনের ক্ষমতার ভিতকে নাড়িয়ে দিয়েছে। গত জানুয়ারিতে ক্ষমতা গ্রহণের সময় বাইডেন জাতিকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন যে, তিনি সাবেক প্রোসিডেন্ট ট্রাম্পের মতো দেশকে উত্তপ্ত রাজনৈতিক অবস্থার ভেতর দিয়ে নেবেন না। কিন্তু ৭৮ বছর বয়সী এ রাজনীতিক ইতিমধ্যেই অভ্যন্তরীণ ও ভূ-রাজনীতিকে উত্তপ্ত করে তোলার মতো যথেষ্ট ঘটনার জন্ম দিয়েছেন। গোটা বিশ্বে যুক্তরাষ্ট্রের সরকার ও তার সেনাবাহিনী বছরের পর বছর ধরে যে ভাবমূর্তি তৈরি করেছে, তা আজ ভূলুণ্ঠিত প্রায়। যুক্তরাষ্ট্রের মিত্ররাও আর আগের মতো ওয়াশিংটনকে বিশ্বাস করতে পারছে না। অনেকটা ক্ষমা চাওয়ার মতো করেই আফগানিস্তান ছাড়তে হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রদের।
কাবুল বিমানবন্দরে আত্মঘাতী হামলা হওয়ার আগপর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র ৯৫ হাজার মানুষ আফগানিস্তান থেকে সরায়। তালেবানরা বারবার সতর্ক করছিল ওয়াশিংটনকে যে, তারা সৈন্য প্রত্যাহারের আর সময় বাড়াবে না। শুধু তাই নয়, তালেবানরা কয়েক দফায় হুঁশিয়ারিও জানিয়েছিল কাবুল বিমানবন্দরে হামলা হতে পারে। কিন্তু কোনো হুঁশিয়ারিতেও যখন কাবুল বিমানবন্দরে আফগানদের ভিড় কমছিল না, ঠিক তখনই রক্তক্ষয়ী ওই হামলার ঘটনা ঘটে। হামলায় একজন তালেবানও হতাহতের শিকার হয়নি। অনেক দিন ধরেই বলা হচ্ছিল, আফগানিস্তানে তালেবানের সঙ্গে যোগাযোগ আছে ইসলামিক স্টেটের। বিশ্লেষকদের মধ্যে কেউ কেউ বলছেন, যুক্তরাষ্ট্রের দেখানো পথেই তালেবানরা বাইডেন প্রশাসনকে শায়েস্তা করছে ছায়াযোদ্ধা হিসেবে আইএসকে ব্যবহার করে এবং ভবিষ্যতেও করতে পারে। আর এমনটা হলে, আফগানিস্তানে তালেবান শাসনও যে কণ্টকমুক্ত হবে এমনটা বলা যায় না।
বাইডেন আফগান যুদ্ধ শুরু করেননি। করেছিল রিপাবলিকান প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ। অথচ আজ ওই রিপাবলিকানদের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশই আফগান ব্যর্থতার দায়ে বাইডেনের পদত্যাগ চাইছে। বাইডেন রিপাবলিকানদের এমন বক্তব্যকে স্রেফ উড়িয়ে দেবেন, সেই শক্তিও তার নেই। আর এজন্যই বোধহয় তিনি অনেকটা ফাঁকা বুলির মতো কাবুলে হামলাকারীদের ওপর প্রতিশোধ নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। তিনি ভালো করেই জানেন, আফগানিস্তানে আর তাদের কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। সেখানে এখন বহু জাতির স্বার্থ কাজ করছে। একাধিক পরাশক্তিধর দেশ যারা প্রকারান্তে যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী, তারাই আজ তালেবানদের কাছাকাছি। খোদ তালেবানরা তুরস্কের সঙ্গে আলোচনায় বসেছে। আলোচনায় কী নিয়ে কথা হয়েছে তা এখনো জানা যায়নি।