কখনো কোনো অবস্থায় মন্দ কথা বলা যাবে না। মন্দ কথায় কোনো লাভ নেই, বরং ক্ষতি আছে। মন্দ কথা মানুষের জবান নষ্ট করে, ব্যক্তিত্ব বিলীন করে, মন ও চরিত্রকে কলুষিত করে। মন্দ কথার দরুন বন্ধুত্বের সম্পর্ক নষ্ট হয়। যে মন্দ কথা বলে, মানুষ তকে ঘৃণা করে, তাকে তুচ্ছজ্ঞান করে তার কাছ থেকে দূরে থাকে। এমনকি মানুষ তার শত্রু হয়ে যায়। মহান আল্লাহ কোরআনে কারিমে মন্দ কথার উপমা কীভাবে দিয়েছেন এভাবে, ‘আর একটি মন্দ কথা একটি মন্দ গাছের মতোই, সে গাছের মতো যাকে ভূমি থেকে উপড়ে ফেলা হয়, যার কোনো স্থায়িত্ব নেই।’ সুরা ইবরাহিম : ২৬
মন্দ কথা মানুষকে জাহান্নামে নিয়ে যায়। এ প্রসঙ্গে হজরত রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘ভাষার ফসলেই মানুষকে জাহান্নামে উপুড় করে নিক্ষেপ করবে।’ সুনানে তিরমিজি
তিনি আরও বলেছেন, (প্রকৃত) মুসলিম সে, যার ভাষা ও কর্ম থেকে (অন্য) মুসলমানরা নিরাপদ থাকে।’ সহিহ্ বোখারি
নবী কারিম (সা.) আরও বলেছেন, ‘মুসলমানের সুন্দর বৈশিষ্ট্যগুলো মধ্যে রয়েছে অর্থহীন কথা ও কাজ ত্যাগ করা।’ সুনানে তিরমিজি
মন্দ কথা অনেক অনিষ্টের মূল। মন্দ কথা সমাজে অস্থিরতা ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে। মন্দ কথায় মনঃকষ্ট, ঘৃণা, বিদ্বেষ, শত্রুতা ও হানাহানি সৃষ্টি করে। তাই মহান আল্লাহ এবং তার রাসুল (সা.) মানুষকে মন্দ কথা বলতে মানা করেছেন। কোরআনে কারিমের অনেক জায়গায় মন্দ কথার বিষয়ে মানুষকে সতর্ক করে বলা হয়েছে
এক. ‘তোমরা কেউ কারও গিবত (নিন্দা) করো না। তোমাদের কেউ কি তার মৃত ভাইয়ের গোশত খেতে পছন্দ করবে?’সুরা আল হুজুরাত : ১২
দুই. ‘তোমরা পরস্পরের বদনাম করো না, (কাউকে) বিকৃত উপাধিতে ডেকো না।’ সুরা আল হুজুরাত : ১১
তিন. ‘হে ইমানদাররা! তোমাদের পুরুষদের এবং নারীরা অপর নারীদের উপহাস করো না, কারণ তারা উত্তম হতে পারে।’ সুরা আল হুজুরাত : ১১
চার. ‘যারা বিনা অপরাধে মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারীদের কষ্ট দেয়, তারা মিথ্যা অপবাদ ও প্রকাশ্য পাপের বোঝা বহন করে।’ সুরা আল আহজাব : ৫৮
পাঁচ. ‘দান করার পর খোঁটা দিয়ে কষ্ট দেওয়ার চাইতে কোমল কথা বলে ক্ষমা চেয়ে বিদায় দেওয়া উত্তম।’ সুরা বাকারা : ২৬৩
ছয়. ‘মানুষ মন্দ কথা বলে বেড়াক, তা আল্লাহ পছন্দ করেন না।’ সুরা নিসা : ১৪৮
সাত. ‘তাদের ‘উহ্’ পর্যন্ত বলো না এবং ধমক দিয়ে কথা বলো না।’ সুরা বনি ইসরাইল : ২৩
আট. ‘হে ইমানদারেরা! তোমরা এমন কথা কেন বলো, যা করো না।’ সুরা আস সফ : ২
নয়. ‘মিথ্যা কথা বলা থেকে আত্মরক্ষা করো।’ সুরা হজ : ৩০
দশ. ‘সে (মানুষ) যে কথাই উচ্চারণ করে, তাই গ্রহণ (লিপিবদ্ধ) করার জন্য তার কাছে সদাপ্রস্তুত প্রহরী (ফেরেশতা) রয়েছে।’ সুরা ক্বফ : ১৮
এগারো. ‘হে নবী! তুমি মিথ্যাবাদীদের কাছে নত হয়ো না।’ সুরা আল কলম : ৮
বারো. ‘হে নবী! তুমি নত হয়ো না তাদের কাছে, যারা কথায় কথায় শপথ করে, যারা মর্যাদাহীন, যারা গিবত করে, যারা পরনিন্দা ও চোগলখুরি করে বেড়ায়, ভালো কাজে বাধা দেয়... যারা চরম ঝগড়াটে ও হিংস্র।’ -সুরা আল কলম: ১০-১৩
তেরো. ‘ধ্বংস এমন প্রত্যেক ব্যক্তির জন্য যে, মানুষকে ধিক্কার দেয় এবং মানুষের নিন্দা করে বেড়ায়।’ সুরা হুমাজা: ১
এভাবেই মহান আল্লাহ মানুষকে মন্দ বলা থেকে সতর্ক করেছেন। হাদিসেও নবী কারিম (সা.) মানুষকে মন্দ কথা থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দিয়েছেন। নানাভাবে নানা প্রসঙ্গে অজস্র হাদিসে নবী কারিম (সা.) উম্মতদের এ সম্পর্কে সতর্ক করেছেন। ইরশাদ হয়েছে-
‘মুমিন সে নয়, যে উপহাস করে অভিশাপ দেয়, অশ্লীল ভাষায় কথা বলে এবং যে বাচাল।’ সুনানে তিরমিজি
‘কোনো কটুভাষী জান্নাতে প্রবেশ করবে না।’ সুনানে আবুদ দাউদ
‘(কোনো) মুসলমানকে গালি দেওয়া ফাসেকি।’ সহিহ্ বোখারি
‘মুসলমান ভাইকে হেয় করাই পাপী হওয়ার জন্য যথেষ্ট।’ সহিহ্ মুসলিম
‘তোমরা অনুমান করে কথা বলো না। কারণ অনুমান হচ্ছে জঘন্যতম মিথ্যা কথা।’ সহিহ্ বোখারি
‘মুসলমান মুসলমানের ভাই। সে তার ভাইকে অপমানিত করে না।’ সহিহ্ মুসলিম
‘তোমার ভাইয়ের (যেকোনো মুসলমানের) বিপদে আনন্দ প্রকাশ করো না।’ সুনানে তিরমিজি
‘মিথ্যা বলা এবং মিথ্যা সাক্ষ্য দেওয়া কবিরা গোনাহ।’ সহিহ্ বোখারি
‘যার মধ্যে চারটি স্বভাব আছে সে মুনাফিক। সেগুলো হলো আমানত রাখলে খেয়ানত করে, কথা বললে মিথ্যা বলে, অঙ্গীকার করলে ভঙ্গ করে এবং বিবাদ লাগলে গালাগাল করে।’ সহিহ্ বোখারি
এ ছাড়া আরও অনেক হাদিস রয়েছে। ওই সব হাদিসে নবী করিম (সা.) মন্দ কথা না বলতে নির্দেশ দিয়েছেন। এমনকি হাদিসে বিভিন্ন রকম মন্দ কথা উল্লেখ করে সেগুলো উচ্চারণ করতে বারণ করা হয়েছে। তাই যারা মহান আল্লাহ ও তার রাসুলের প্রতি ইমান রাখে, মন্দ কথা থেকে বিরত থাকা তাদের কর্তব্য, তাদের ইমানি দায়িত্ব। আল্লাহতায়ালা প্রত্যেক মুসলমানের নেক আমলগুলো কবুল করুন।