শেখ আবদুল হাকিম কে ছিলেন

পঁচাত্তর বছরের একটি দুরন্ত ঝঞ্ঝাপূর্ণ জীবন কাটিয়ে শ্বাসকষ্টে ভুগে মারা গেলেন শেখ আবদুল হাকিম (১৯৪৬-২০২১)। তার কন্যা অপালা হাকিমের বরাতে আমরা জানতে পারি, ভদ্রলোক দীর্ঘদিন ধরে শ্বাসকষ্টের রোগী ছিলেন। কথাটা আক্ষরিক ও প্রতীকী দুই অর্থেই সত্যি। জীবনধারণের জন্য যে অতি স্বাভাবিক প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত জরুরি, সেটি তার জন্য মোটেই স্বাভাবিক ছিল না।

কিন্তু কে ছিলেন এই শ্বাসকষ্টের রোগী শেখ আবদুল হাকিম? বাংলাদেশের রহস্য-রোমাঞ্চ-অনুবাদ সাহিত্য সম্পর্কে যারা খোঁজখবর রাখেন, তাদের কাছে প্রশ্নটি ধৃষ্টতার উদাহরণ। কারণ, অর্ধ শতকেরও বেশি সময় জুড়ে তার কলম এই জগতে প্রবল প্রতাপে এবং পাঠকের ভালোবাসা ও সমীহ অর্জন করে সচল ছিল। বলা হয়, আমরা, বাংলাভাষীরা, অত্যন্ত বিস্মৃতিপ্রবণ। তারপরেও, শেখ আবদুল হাকিমকে ভুলতে রহস্য-রোমাঞ্চ-অনুবাদ সাহিত্যের পাঠকদের কষ্ট হবে বলেই মনে হয়।

পশ্চিমবঙ্গের হুগলি জেলায় জন্মগ্রহণ, ভারতভাগের অব্যবহিত পর সপরিবারে ঢাকা আগমন। বয়স কুড়ি হতে না হতেই প্রাতিষ্ঠানিক লেখাপড়ায় ইস্তফা দিয়ে কাজী আনোয়ার হোসেন প্রতিষ্ঠিত ‘সেবা’ প্রকাশনীতে পেশাদার লেখক হিসেবে কর্মজীবন শুরু। বোঝা যায়, তার ‘শ্বাসকষ্টের’ সূত্রপাত তখন থেকেই। তা হোক; কিন্তু ‘সেবা’ এবং শেখ আবদুল হাকিম, এই দুটি নাম প্রায় অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। সেখান থেকে প্রকাশিত ‘কুয়াশা’ নামের গোয়েন্দা কাহিনী আর ‘মাসুদ রানা’ নামের স্পাই থ্রিলার কাহিনীর অসংখ্য বইয়ের নেপথ্য লেখক ছিলেন তিনি; ইংরেজিতে যাকে ‘গোস্ট রাইটার’ বলা হয়। তবে, সেই নেপথ্য লেখকের নেপথ্যচারিতার সত্যটি সম্ভবত খুব বেশি মানুষ অনেক দিন ধরে অবগত ছিলেন না, এখনো যে সবাই জানেন তা-ও নয়। যখন সে-খবরটি বেশ জানাজানি হয় তখন অনেকেই প্রায় আকাশ থেকে পড়েছিলেন। তার একটি বড় কারণ, আমাদের সাহিত্যে এই বিষয়টি প্রায় অভাবিতপূর্বই ছিল বলা চলে। মাসুদ রানার নেপথ্য লেখক হিসেবে অবশ্য আরও যারা কাজ করেছেন বলে জানা যায় তারা হলেন শাহাদত চৌধুরী, সাজ্জাদ কাদির, রকিব হাসান, ইসমাইল আরমান, ইফতেখার আমিন প্রমুখ। আর ‘কুয়াশা’র ক্ষেত্রে, শেখ আবদুল হাকিম ছাড়া, শাহাদত চৌধুরী ও রাহাত খান। বলাই বাহল্য, কাজী আনোয়ার হোসেন নিজেও মাসুদ রানার বেশ কিছু খণ্ডের মূল রচয়িতা এবং বিপুল প্রশংসাধন্য সেসব বইয়ের কয়েকটি ‘মৌলিক’ও বটে। যাই হোক, নেপথ্য লেখকের ভূমিকায় বিরতি দিয়ে শেখ আবদুল হাকিম এক সময় মাসুদ রানার আদলে ‘জাকি আজাদ’ নামের একটি স্পাই থ্রিলার সিরিজ নির্মাণে সচেষ্ট হন, ভিন্ন একটি প্রকাশনা সংস্থা থেকে সেসব বই বের হতো: ওস্তাদ সাবধান, বিপদ ভয়ংকর, জিপসি জাদু ইত্যাদি। কিন্তু বইগুলোর বিক্রি তেমন আশাপ্রদ না হওয়াতে তিনি ‘সেবা’-তেই ফিরে যান।

মাত্র বাইশ বছর বয়েসে হাকিম ভারতভাগের পটভূমিতে একটি অসাধারণ ‘মৌলিক’ উপন্যাস ‘অপরিণত পাপ’ রচনা করেন। পা-ুলিপিটি পড়ে অস্থির হয়ে উঠেছিলেন কাজী আনোয়ার হোসেন। সেবা থেকেই ১৯৬৮ সালের জুলাই মাসে প্রথম প্রকাশিত হয় এই বইটি। এবং প্রকাশক কাজী আনোয়ার হোসেন বলেছিলেন, “ৃযদি লেখক কাজী আনোয়ার হোসেনের আন্তরিক মত জানতে চান তাহলে আমি বলব বইটি সত্যিই আমাদের সাহিত্যে একটি ব্যতিক্রম। পান্ডুলিপিটি পড়ে আমি এতই বিস্মিত, মুগ্ধ এবং উত্তেজিত হয়ে উঠেছিলাম যে সারাটা দুপুর আমাকে বারান্দায় পায়চারী করে বেড়াতে হয়েছিল।” কিন্তু তৎকালীন রাজনৈতিক পরিস্থিতি সম্পর্কে কিছু ‘আপত্তিকর’ তথ্য বা মন্তব্য এবং যৌনতার ‘বাড়াবাড়ির’ কারণে বইটি কিছুদিন পর নিষিদ্ধ ঘোষিত হয়, এবং দীর্ঘদিন পরে পুনঃপ্রকাশিত হয়। ১৯৭০ সালে চারটি সংখ্যা প্রকাশিত হয়ে বন্ধ হয়ে যাওয়া ‘সেবা’-র রহস্য পত্রিকা  কাজী আনোয়ার হোসেনেরই সুদক্ষ সম্পাদনায় নতুন করে আটের দশকের মাঝামাঝি থেকে প্রকাশিত হতে শুরু করলে শেখ আবদুল হাকিম সেটার অন্যতম সহকারী সম্পাদক হিসেবে জীবনের নতুন পর্বে পা রাখেন; সঙ্গী হিসেবে পেয়েছিলেন রকিব হাসান এবং নিয়াজ মোরশেদকে (দাবাড়ু নন, অনুবাদক ও সাংবাদিক), আর শিল্প সম্পাদক হিসেবে খন্দকার আসাদুজ্জামানকে, যিনি নিজেও একদা প্রথম শ্রেণির অনুবাদক হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিলেন; তার অনূদিত বাস্কারভিলের হাউন্ড এবং পিনোকিও পাঠকরা এখনো মনে রেখেছেন। 

যাই হোক, রহস্য পত্রিকার সহকারী সম্পাদকের দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি শেখ আবদুল হাকিম তার অন্যান্য অনুবাদ কর্মও অব্যাহত রাখেন। এবং সেই আটের দশকেই পাঠকদের মধ্যে বিপুল চাঞ্চল্য সৃষ্টি করে প্রকাশিত হয় চার খণ্ডে, তার অনূদিত, গড ফাদার, বেশ তাক লাগানো চারটি প্রচ্ছদ শোভিত হয়ে। তারপর একে একে প্রকাশিত হয় পাঠকের অসাধারণ ভালোবাসায় সিক্ত তার দড়াবাজ স্পাই, কেন ফলেটের দ্য ম্যান ফ্রম সেন্ট পিটার্সবার্গ অবলম্বনে দুই খণ্ডে আততায়ী, আগাথা ক্রিস্টির কাহিনী অবলম্বনে কামিনী, ইত্যাদি।। ‘মাসুদ রানা’ সিরিজের নেপথ্য লেখক হিসেবে তিনি তার পুরনো কাজটিও চালিয়ে যাচ্ছিলেন এবং সেজন্য কাজী আনোয়ার হোসেন যে অঢেল প্রশংসা পাচ্ছিলেন তার মূল দাবিদার তিনিই ছিলেন, আরও কয়েকজন নেপথ্য লেখকের সঙ্গে; যদিও অধিকাংশ পাঠকই তা জানত না।

কেন এত কাজ করতে হচ্ছিল তাকে? মাসুদ রানা যারা পড়েছেন বা পড়েন তারা জানেন কী পরিশ্রমসাধ্য কাজ সেসব। সেই সঙ্গে একটি মাসিক পত্রিকার সহকারী সম্পাদকের গুরুভার, আর অবরে সবরে নিজের নামে নানান বইয়ের অনুবাদ। রীতিমতো অমানুষিক পরিশ্রম! এ-প্রসঙ্গে স্যাম চাচাকে লেখা মান্টোর চিঠি-তে লেখক সাদাত হাসান মান্টোর কিছু কথা হয়তো কোনোভাবেই অবান্তর হবে না। মান্টো লিখছেন: “আমার দেশ অত্যন্ত গরিব। এখানে আর্ট পেপার নেই। ভালো একটা ছাপাখানা নেই। এ দেশের দারিদ্র্যের সবচেয়ে বড় নমুনা আমি নিজে। আপনার বিশ্বাস হবে না, চাচাজান, বিশ-বাইশটা বইয়ের লেখক হওয়ার পরেও বসবাসের জন্য আমার একটা বাড়ি নেই। আরও অবাক হবেন যে, আমার কাছে যাতায়াতের জন্য না আছে কোনো প্যাকার্ড, না আছে ডজ। এমনকি একটা সেকেন্ড হ্যান্ড মোটর কারও নেই।” (স্যাম চাচাকে লেখা মান্টোর চিঠি; সালেহ ফুয়াদের অনুবাদ; ঐতিহ্য প্রকাশনী)।

আমরা জানি রহস্য-রোমাঞ্চ-অনুবাদ সাহিত্যকে সাহিত্যসেবীরা মূলধারার সাহিত্য হিসেবে গ্রহণ করেন না। তাই মান্টোর সঙ্গে শেখ আবদুল হাকিমের কোনো তুলনা হচ্ছে না। আসলে এভাবে কোনো তুলনা হয়ও না। কিন্তু এটা তো ঠিক যে বই বিক্রির দিক থেকে বিচার করলে মান্টোর বইয়ের তুলনায় মাসুদ রানা এবং অন্যান্য থ্রিলার বা গোয়েন্দা কাহিনীর লেখকদের বই অনেক বেশি সংখ্যায় বিকোয়। আর, ‘কুয়াশা’ সিরিজের কথা বাদই দেওয়া যাক; নেপথ্য লেখক হিসেবে হাকিম স্রেফ ‘মাসুদ রানা’ই লিখেছেন, তার দাবি অনুযায়ী, আড়াইশোর বেশি। সঙ্গে, যেসব অনুবাদের কথা উল্লিখিত হলো তা ছাড়াও রয়েছে বিষদাঁত, প্যাট্রিক সাসকিন্ড-এর পারফিউম, পাঁচ ডলার সাত সেন্ট, দ্য ম্যান ফ্রম পাকিস্তান, লোতানি গুপ্তধন, আমি কি হত্যাকারী?, মার্সেনারি, অধরা কুমারী, মধুবালা, কাঠফাটা এবং একজন উদ্যম, ফকিরের কেরামতি (হরর কাহিনী), দ্বিতীয় ধরন (সায়েন্স ফিকশন), মানুষটা মরেনি (গোয়েন্দা উপন্যাস), গুমখুন (রহস্যোপন্যাস), কি বিপদ (ফ্যান্টাসি), কি ছিল ওটা? (ভৌতিক), ফুর্তি (রহস্যোপন্যাস), নার্সারি (ফ্যান্টিাসি), চারপেয়ে মানুষ (হরর), ভেনম (রহস্যোপন্যাস), দুঃস্বপ্ন (সায়েন্স ফিকশন), ইত্যাদি।

তো, এর পরেও কি শেখ আবদুল হাকিমের মতো একজন পেশাদার লেখক একটি মানসম্মত জীবন যাপন করতে পারছিলেন? পাচ্ছিলেন পরিবারের সবার অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, চিকিৎসা, শিক্ষার নিশ্চয়তা? বুক ভরে শ্বাস নিয়ে নির্ভার হয়ে এ সমাজে চলাফেরা, জীবনধারণ করতে পারছিলেন? যতদূর জানা যায়, এ প্রশ্নের উত্তর নেতিবাচক। আর তাই হয়তো তার এতদিনের কর্মস্থল ‘সেবা’ ছেড়ে চলে যেতে হয় তাকে। এবং তারপর, আমরা জানি, সেবা তথা সেবা-র কর্ণধারের সঙ্গে বছর কয়েক আগে তাকে জড়িয়ে পড়তে হয় কপিরাইট সংক্রান্ত দ্বন্দ্বে, মামলায়। গোস্ট রাইটার তথা নেপথ্য লেখক বিষয়টি কোনো নতুন ধারণা নয়। অনেক বিখ্যাত বই, সংগীত, নেপথ্য লেখকের কলমে রচিত, যেজন্য কৃতিত্ব পেয়েছেন অন্য একজন। জগদ্বিখ্যাত সুরস্রষ্টা মোৎসার্ট-ও অনেক সুর সৃষ্টি করেছেন সংগীত যশোপ্রার্থী নানান ধনকুবেরের জন্য।

আমরা শেখ আবদুল হাকিম বনাম সেবা-র মামলার তথা দ্বন্দ্বে কারও পক্ষ নিয়ে এখানে কিছু বলতে চাই না। হাকিম সাহেবের দাবির ন্যায্যতা প্রতিপাদন এ রচনার উদ্দেশ্য নয়। কিন্তু যে-কথাটা আমরা জোর দিয়ে বলতে চাই তা হলো শেখ আবদুল হাকিমের মতো যেসব কলম জাদুকর বছরের পর বছর ধরে, যুগের পর যুগ ধরে পাঠকের হাতে উৎকৃষ্ট রচনা তুলে দিয়ে গেছেন, যাচ্ছেন, বা যাওয়ার ইচ্ছা পোষণ করেন, অসংখ্য অনুবাদক যাদের কাজ দেখে অনুপ্রেরণা লাভ করেছেন, শিখেছেন, যারা লিখেই বা শিল্প সৃষ্টি করেই জীবিকা নির্বাহ করতে চান, তাদের জন্য আমাদের সমাজ, রাষ্ট্র কতটুকু সহায়ক ভূমিকা পালন করেছে বা করছে? রাষ্ট্রের এসব সম্পদের প্রতি কি রাষ্ট্রের কোনো দায়, কোনো কর্তব্য, কোনো সহানুভূতি নেই?

আমাদের দেশের লেখক-শিল্পীদের প্রয়াণ লেখা শেষ অব্দি ট্র্যাজেডির মতোই শোনায়। তাদের জীবনকথা শেষ অব্দি তাদের শ্বাসকষ্টেরই বয়ান। শেখ আবদুল হাকিমকে সালাম। তার অবিস্মরণীয় কর্ম ও স্মৃতির প্রতি প্রগাঢ় শ্রদ্ধা জানাই।

লেখক : অনুবাদক ও শিক্ষক

patraabali@gmail.com