বিশ্বব্যাংকের হিসাবানুসারে নতুন সহস্রাব্দের শুরুতে ২০০০ সালে বাংলাদেশের জনসংখ্যার মাত্র ৩২ শতাংশ বিদ্যুৎ সংযোগের আওতায় ছিল। ২০০৯ সালে যখন বর্তমান ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করে তখনো দেশে বিদ্যুৎ সংযোগের আওতায় ছিলেন মাত্র ৪৭ শতাংশ মানুষ। কিন্তু পরবর্তী এক যুগে দেশের বিদ্যুৎ খাতে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন ঘটে গেছে। জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয়ের বিদ্যুৎ বিভাগের হিসাবানুসারে চলতি বছরের জানুয়ারিতেই দেশের ৯৯ দশমিক ৫০ ভাগ মানুষের কাছে ইতিমধ্যে বিজলি বাতির সংযোগ পৌঁছে গেছে। কিন্তু এখনো দেশে চাহিদার তুলনায় বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতায় ঘাটতি রয়েছে। আবার উৎপাদিত বিদ্যুতের বড় অংশের জন্যই জীবাশ্ম জ্বালানি, গ্যাস ও কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের ওপর নির্ভর করায় পরিবেশ দূষণ কমানো যাচ্ছে না। অন্যদিকে এমন প্রথাগত বিদ্যুতের উৎপাদন ব্যয় যেমন বেশি তেমনি সরবরাহ ব্যবস্থায়ও অনেক সংকট রয়ে গেছে।
আশার কথা হলো, সরকারের নীতি ও সিদ্ধান্তে ইতিমধ্যেই বিদ্যুৎ উৎপাদনের জ্বালানি নীতিতে বড় পরিবর্তন এসেছে। এই পরিবর্তনের অংশ হিসেবে আগের ২২টি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের পরিকল্পনা থেকে সরকার অনেকটাই সরে এসেছে। সম্প্রতি সরকারের বিদ্যুৎ বিভাগ ১০টি কেন্দ্র রেখে বাকি সবগুলোর নির্মাণ পরিকল্পনা বাতিলও করেছে। একইসঙ্গে সরকারের বিদ্যুৎ বিভাগ এবং বিদ্যুৎ জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয়ের প্রতিষ্ঠান টেকসই ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (স্রেডা) সহায়তায় গত বছরের অক্টোবরে নবায়নযোগ্য জ্বালানির একটি মহাপরিকল্পনার খসড়া তৈরি করেছে। মহাপরিকল্পনায় বলা হয়েছে, ২০২১ থেকে ২০৪১ সাল এই ২০ বছর দেশে শুধু সৌরবিদ্যুৎ থেকেই ২৭ হাজার ৪৩০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব। এ ছাড়া দেশে কম করে হলেও ২০ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ বায়ুশক্তি ব্যবহার করে উৎপাদন করা যাবে। এভাবে সব মিলিয়ে আগামী ২০৪১ সাল নাগাদ দেশে ৬০ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা গড়ে তুলতে চায় সরকার। সৌর ও বায়ু বিদ্যুতের সঙ্গে দেশের পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে উৎপাদিত বিদ্যুৎ এবং বিদেশ থেকে আমদানি করা গ্যাস (এলএনজি) ভিত্তিক ও ভারত-নেপাল থেকে আমদানি করা বিদ্যুৎ যুক্ত হলে সে সময় চাহিদার চেয়ে বেশি বিদ্যুৎ থাকবে বাংলাদেশের হাতে।
কিন্তু আগামী বিশ বছরের মধ্যে সৌর ও বায়ু বিদ্যুৎ থেকে ৪৭ হাজার মেগাওয়াট উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করার ক্ষেত্রে অনেকগুলো চ্যালেঞ্জ রয়েছে। বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, সৌরবিদ্যুৎ উৎপদানের সব চেয়ে বড় সংকট হলো জমি। কেননা, প্রতি ১ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে গড়ে তিন একর জমি লাগে। অর্থাৎ ১০০ মেগাওয়াটের একটি কেন্দ্র নির্মাণে জমির প্রয়োজন হয় ৩০০ একরের মতো। তবে, স্রেডার মহাপরিকল্পনায় বলা হয়েছে ভূমি মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী দেশে ২০ লাখ একর অকৃষি খাস জমি রয়েছে। এসব অকৃষি খাস জমিতে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব। নবায়নযোগ্য জ্বালানির এই পরিকল্পনায় কাপ্তাই লেক, রংপুর ও নীলফামারীর তিস্তা নদীর চর, কুড়িগ্রামের যমুনা নদীর চরসহ ১২টি স্থান চিহ্নিত করে সেখান থেকে ১৬ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হচ্ছে। দেশে সৌরবিদ্যুতের কোনো বৃহৎ প্রকল্প এখনো বাস্তবায়িত না হলেও স্রেডার হিসাবে, বাংলাদেশে প্রায় ৫৮ লাখ সৌরবিদ্যুৎ বা সোলার হোম সিস্টেম রয়েছে। যেখান থেকে প্রায় ৪০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আসে। এই সক্ষমতা নিয়েই পৃথিবীতে বাসাবাড়িতে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারের হিসাবে বাংলাদেশ বর্তমানে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে। অন্যদিকে, দেশে বায়ু বিদ্যুৎ উৎপাদনের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ে ২০১৪ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি বিভাগের প্রতিষ্ঠান এনআরইএলের সহায়তায় দেশের ৯টি জেলায় বায়ুর গতিবেগ মাপা হয়। এর মধ্য দিয়ে দেশে প্রথমবারের মতো বায়ুর মানচিত্র তৈরি করেছে সরকার। বিদ্যুৎ বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রতি সেকেন্ডে বায়ুর গতিবেগ গড়ে সাড়ে ৪ মিটার হলে সেখানে বায়ু বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ বাণিজ্যিকভাবে সফল হয়। ওই বায়ুর মানচিত্রে দেখা গেছে, দেশে বাতাসের গড় গতিবেগ প্রতি সেকেন্ডে ৫.৭৫ থেকে ৬.২৫ মিটার রয়েছে মোট ১২ হাজার ২৭৬ কিলোমিটার এলাকায়। সেই হিসাবে এখান থেকে ২০ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব বলে পরিকল্পনায় জানানো হয়েছে।
পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে বাড়ছে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার। অন্যদিকে কমছে কয়লা, তেলসহ জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার। শুধু নবায়নযোগ্য জ্বালানি শক্তিভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র বাড়ছে তা নয়, একই সঙ্গে এ প্রযুক্তির উন্নয়নও হচ্ছে। আশার কথা হলো, প্রতি বছর সৌর বিদ্যুতের উৎপাদন ব্যয় গড়ে ১৩ শতাংশ হারে কমছে। একইসঙ্গে স্থলভাগ ও সাগর-জলাশয়ে স্থাপিত বায়ু বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন ব্যয়ও প্রতি বছর কমছে। অন্যদিকে, নিজেদের কয়লা ও তেল না থাকলে প্রথাগত জ্বালানিতে বাংলাদেশের মতো দেশগুলোতে বিদ্যুৎ উৎপাদনের ব্যয় অনেক বেশি। পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষা এবং উৎপাদন ব্যয়ের সার্বিক বাস্তবতা আমলে নিলে সবুজ জ্বালানির নীতি গ্রহণই এখন সর্বোত্তম পন্থা। নবায়নযোগ্য জ্বালানির এই মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে পারলে সবুজ জ্বালানির সবুজ বাংলাদেশ নির্মাণের স্বপ্ন সত্যি হতে পারে।