ঢাকার উত্তরা থেকে শাহবাগ পর্যন্ত মেট্রোরেল লাইন-৬-এর কাজ এগিয়ে চলছে। পরীক্ষামূলকভাবে ট্রেন চলাচলও শুরু হয়েছে। তবে মেট্রোরেলের অন্য লাইনগুলোতে চলছে স্থবিরতা। জাপানের সংস্থা জাইকা ও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) সহায়তায় আরও তিনটি প্রকল্প হাতে নিয়েছে সরকার। দুই বছর আগে প্রকল্পগুলো নেওয়া হলেও দৃশ্যত কাজ থমকে আছে। জাইকার অর্থায়নে ঢাকা ম্যাস র্যাপিড ট্রানজিট ডেভেলপমেন্ট প্রকল্প বা এমআরটি-১ ও ৫-এর ব্যয় ধরা হয়েছে ৯৩ হাজার ৮০০ কোটি টাকা। আর এডিবির অর্থায়নে এমআরডি লাইন-৫-এর সাউদার্ন অংশের জন্য ব্যয় ধরা হয়েছে ৪০৮ কোটি টাকা। প্রকল্পগুলোর অর্থ ব্যয়ের গড় অগ্রগতি ৪ শতাংশ। ভৌত কাজ শুরুই হয়নি। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দুই বছর আগে প্রকল্পগুলো নেওয়া হলেও এখন চলছে সম্ভাব্যতা যাচাই ও নকশা প্রণয়নের কাজ। করোনার কারণে কার্যক্রমে কিছুটা বাধাগ্রস্ত হয়েছে। ইতিমধ্যে সংশোধনী এনে লাইন-১-এর মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেডের (ডিএমটিসিএল) ব্যবস্থাপনা পরিচালক এমএএন ছিদ্দিক দেশ রূপান্তরকে বলেন, এমআরটি অন্যান্য লাইনগুলো বাস্তবায়নে যে কর্মপরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে, সে অনুসারে এগিয়ে যাচ্ছে। অর্থায়নসহ প্রকল্প বাস্তবায়নে কোনো সমস্যা আপাতত নেই। নির্দিষ্ট মেয়াদের আগেই কাজ শেষ করতে পারব।
এমআরটি-১ : ২০১৯ সালের অক্টোবরে অনুমোদন পাওয়ার পর দুই বছরেও শুরু হয়নি ৩২ দশমিক ২৪ কিলোমিটার ম্যাস র্যাপিড ট্রানজিট (এমআরটি) লাইন-১-এর নির্মাণকাজ। বিএমটিসিএল সূত্রে জানা গেছে, এমআরটি লাইন-১ দুটি অংশে বিভক্ত। অংশ দুটি হলো বিমান রুট (বিমানবন্দর থেকে কমলাপুর) এবং পূর্বাচল রুট (নতুন বাজার থেকে পিতলগঞ্জ ডিপো)। বিমানবন্দর রুটের মোট দৈর্ঘ্য ১৯ দশমিক ৮৭ কিলোমিটার এবং মোট পাতাল স্টেশন সংখ্যা ১২টি। এ রুটেই বাংলাদেশে প্রথম পাতাল বা আন্ডারগ্রাউন্ড মেট্রোরেল নির্মিত হতে যাচ্ছে। পূর্বাচল রুটের মোট দৈর্ঘ্য ১১ দশমিক ৩৬ কিলোমিটার। সম্পূর্ণ অংশ উড়াল এবং মোট স্টেশন সংখ্যা নয়টি। তার মধ্যে সাতটি স্টেশন হবে উড়াল। নতুন বাজার ও যমুনা ফিউচার পার্ক স্টেশনদ্বয় বিমানবন্দর রুটের অংশ হিসেবে পাতালে নির্মিত হবে। নতুন বাজার স্টেশনে ইন্টার-চেঞ্জ থাকবে। এ ইন্টার-চেঞ্জ ব্যবহার করে বিমানবন্দর রুট থেকে পূর্বাচল রুটে এবং পূর্বাচল রুট থেকে বিমানবন্দর রুটে যাওয়া যাবে। উভয় রুটের সব বিস্তারিত স্টাডি, সার্ভে এবং বেসিক ডিজাইন সম্পন্ন হয়েছে। বর্তমানে ডিটেইল ডিজাইনের কাজ চলমান, এর অগ্রগতি ৭৭ শতাংশ। এ লাইনে ডিপো ও ডিপো এক্সেস করিডারে নির্মাণের নিমিত্ত নারায়ণগঞ্জ জেলার রূপগঞ্জ উপজেলার পিতলগঞ্জ ও ব্রাহ্মণখালী মৌজায় ৯২ দশমিক ৯৭ একর জমি অধিগ্রহণের নিমিত্ত যৌথ তদন্ত কার্যক্রম সমাপ্ত হয়েছে। বর্তমানে ৭ ধারার নোটিস জারির কার্যক্রম প্রক্রিয়াধীন। নির্মাণকাজ তত্ত্বাবধানের জন্য পরামর্শক প্রতিষ্ঠান নিয়োগের নিমিত্ত এক্সপ্রেশন অব ইন্টারেস্ট (ইওআই) গত ১৫ ফেব্রুয়ারি আহ্বান করা হয়। ডিপোর ভূমি উন্নয়নের নিমিত্ত গত ১০ জুন দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে।
৫২ হাজার ৫৬২ কোটি টাকা আনুমানিক ব্যয় ধরা এ প্রকল্পে সরকার দেবে ১৩ হাজার ১১ কোটি এবং অবশিষ্ট ৩৯ হাজার ৪৫১ কোটি টাকা ঋণ হিসেবে দিবে জাইকা। করোনার সংক্রমণ শুরু হওয়ার পর সরকারের পক্ষ থেকে লকডাউন ও বিদেশি পরামর্শকদের অনুপস্থিতির কারণে কাজের গতি পিছিয়েছে বলে প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ানোর সময় বলা হয়েছিল।
এ প্রসঙ্গে এমআরটি-১-এর উপপ্রকল্প পরিচালক (ডিপো-সিভিল) মোহাম্মদ মোমেনুল ইসলাম মৃধা দেশ রূপান্তরকে বলেন, প্রকল্পের বিভিন্ন ধাপ থাকে। এখন আমরা প্রথম ধাপ অতিক্রম করছি। উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, একটি বাড়ি বানানোর সময় যেমন পরিকল্পনা নিয়ে একটি নকশা তৈরি করতে হয়, এরপর বাড়ির মূল কনস্ট্রাকশনে হাত দিতে হয়, তেমনি এমআরটি-১ প্রকল্পটি এখন নকশা প্রণয়নের কাজ চলছে। আগামী বছরের মাঝামাঝি সময়ে আমরা প্রকল্পের মূল কনস্ট্রাকশনে যেতে পারব বলে আশা কিরছি। এ প্রসঙ্গে এমআরটি-১-এ প্রকল্প পরিচালক সাইদুল ইসলামের সঙ্গে যোগাযোগ করে কথা বলা সম্ভব হয়নি।
এমআরটি লাইন-৫ সাউদার্ন : ২০৩০ সালের মধ্যে গাবতলী হতে দাশেরকান্দি পর্যন্ত উড়াল ও পাতাল সমন্বয়ে ১৭.৪০ কিলোমিটার দীর্ঘ (পাতাল ১২.৮০ কিলোমিটার এবং উড়াল ৪,৬০ কিলোমিটার) এবং ১৬টি স্টেশন (পাতাল ১২টি এবং উড়াল ৪টি) বিশিষ্ট মেট্রোরেল নির্মাণের নিমিত্ত প্রাক-সম্ভাব্যতা যাচাই সম্পন্ন করা হয়েছে। প্রকল্পের অর্থায়নের জন্য নিমিত্ত উন্নয়ন সহযোগী সংস্থার সঙ্গে ঋণ চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। গত ২১ এপ্রিল নিয়োজিত পরামর্শক প্রতিষ্ঠান কাজ শুরু করেছে। সম্ভাব্যতা যাচাই অংশ হিসেবে বিভিন্ন ধরনের সার্ভে ও বেসিক ডিজাইনের কাজ শুরু করা হয়েছে। বেসিক ডিজাইন কাজের অগ্রগতি ১৮ শতাংশ।
তবে এমআরটি লাইন-৫ সাউদার্নের প্রকল্প পরিচালক মোহাম্মদ আবদুল ওহাব দেশ রূপান্তরকে বলেন, ২০২০ সালের প্রকল্প অনুমোদন হলেও করোনার কারণে কাজে একটু দেরি হয়েছে। তবে ইতিমধ্যে টেন্ডার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে গত ২৯ মার্চ ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি সই হয়েছে। আমরা পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছি। আশা করছি চলতি বছর ২৮ ডিসেম্বরের মধ্যে ফিজিবিলিটি স্টাডি সম্পন্ন করা সম্ভব হবে। এরপর পরের বছরের ২৮ মার্চ নাগাদ ডিটেইল ডিজাইন এবং ২০২৪ সালের মার্চ নাগাদ প্রকিউরমেন্টের কাজ শুরু করা যাবে।
এমআরটি লাইন-৫-এর সাউদার্ন রুটে নির্মাণের সম্ভাব্য ব্যয় প্রায় ৩৬ হাজার কোটি টাকা। এ অংশে মেট্রোরেলটি গাবতলী থেকে টেকনিক্যাল, কল্যাণপুর, শ্যামলী, কলেজ গেট, আসাদ গেট, রাসেল স্কয়ার, পান্থপথ, সোনারগাঁও হোটেল, হাতিরঝিল, নিকেতন হয়ে রামপুরা পর্যন্ত যাবে।
এমআরটি লাইন-৫ নর্দান : এই সময়াবদ্ধ কর্মপরিকল্পনা অনুসরণে ২০.১০ কিলোমিটার দীর্ঘ বাংলাদেশের প্রথম উড়াল মেট্রোরেল বা লাইন-৬-এর নির্মাণকাজ আরলি কমিশনিংয়ের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে পুরোদমে এগিয়ে চলছে। ২০২৬ সালের মধ্যে কমলাপুর থেকে বিমানবন্দর পর্যন্ত ১৯ দশমিক ৮৭ কিলোমিটার পাতাল এবং নতুন বাজার থেকে পিতলগঞ্জ ডিপো পর্যন্ত ১১ দশমিক ৩৬ কিলোমিটার উড়াল মোট ৩১ দশমিক ২৪ কিলোমিটার দীর্ঘ ও ২১টি স্টেশনবিশিষ্ট এমআরটি ১ নির্মাণের লক্ষ্যে ডিটেইল ডিজাইন ও ভূমি অধিগ্রহণের কাজ চলমান।
কমলাপুর থেকে বিমানবন্দর রুটেই বাংলাদেশে প্রথম পাতাল আন্ডারগ্রাউন্ড রেল নির্মিত হতে যাচ্ছে। ২০২৮ সালের মধ্যে উড়াল ও পাতাল মেট্রোরেলের সমন্বয়ে ২০ কিলোমিটার দীর্ঘ এমআরটি-৫ নর্দানের বিভিন্ন জরিপ, ডিটেইল ডিজাইন ও ভূমি অধিগ্রহণের কাজ চলছে। ২০৩০ সালের মধ্যে উড়াল ও পাতাল মেট্রোরেলের সমন্বয়ে ১৭ দশমিক ৪০ কিলোমিটার দীর্ঘ এমআরটি লাইন সাউদার্ন নির্মাণের লক্ষ্যে বিভিন্ন সার্ভে ও বেসিক ডিজাইনের কাজ চলছে। একই সময়ের মধ্যে জিটুজি ভিত্তিতে পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশিপ (পিপিপি) পদ্ধতিতে এমআরটি-২ নির্মাণের লক্ষ্যে প্রিলিমিনারি স্টাডি চলমান আছে। ২০৩০ সালের মধ্যে কমলাপুর থেকে নারায়ণগঞ্জ পর্যন্ত রেলওয়ে ট্র্যাকের পাশ দিয়ে প্রায় ১৬ কিলোমিটার দীর্ঘ উড়াল মেট্রোরেল হিসেবে পিপিপি পদ্ধতিতে লাইন-৪ নির্মাণের উদ্যোগ প্রক্রিয়াধীন।
এ প্রসঙ্গে এমআরটি লাইন-৫ নর্দানের প্রকল্প পরিচালক মো. আফতাব হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, আমরা প্রকল্পের ডিটেইল ডিজাইনের কাজ করছি। এর এক বছর শুধু গিয়েছে। আরও দেড় বছর নাগাদ এই নকশা প্রণয়নের কাজ চলবে, তারপর বলা যাবে মূল কাজ কবে নাগাদ শুরু হবে। তিনি বলেন, আমাদের কাজ স্মুথলি চলছে, প্রধানমন্ত্রী কার্যালয় থেকে তদারকি করা হচ্ছে। কোনো সমস্যা নেই।
এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের সাবেক সাধারণ সম্পাদক এবং জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের অধ্যাপক আকতার মাহমুদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, সংশোধিত নগর পরিকল্পনায় মেট্রোরেলের পাঁচটি লাইন ও কয়েকটি বাস র্যাপিড ট্রানজিট (বিআরটি) লাইন রয়েছে। এগুলোর কাজ যত দ্রুত শেষ হবে, নগর তত সচল হবে। যাতায়াতে মানুষের দুর্ভোগ কমবে। আলটিমেটলি গণপরিবহনের বিকল্প নেই। তিনি বলেন, মেট্রোরেলের একটি লাইনের সঙ্গে আরেকটি লাইনের সংযুক্ততা রয়েছে। এখানে এমআরটি লাইন-৫-এর নর্দান ও সাউদার্ন খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এই লাইনটি ঢাকার পূর্ব ও পশ্চিম অংশকে যুক্ত করবে। যেখানে এমআরটি লাইন-৬ যেমন উত্তর-দক্ষিণকে যুক্ত করছে। এ ক্ষেত্রে অর্থায়ন ও তদারকি জোরদার করার পরামর্শ দেন তিনি।