পবিত্র কোরআনে অসংখ্যবার ইমান ও আমলের ওপর তাগিদ দেওয়া হয়েছে। সেসবের মধ্যে সুরা আরাফের ৪২ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, ‘যারা ইমান এনেছে এবং সৎ কাজ করেছে, আমি (তাদের) কারও ওপর তাদের সাধ্যের বাইরে দায়িত্বভার অর্পণ করি না। এ লোকেরাই হচ্ছে জান্নাতের অধিবাসী, তারা সেখানে চিরদিন থাকবে।’ একই প্রসঙ্গে সুরা আসরে বলা হয়েছে, ‘সময়ের শপথ; মানুষ অবশ্যই ক্ষতির মধ্যে নিমজ্জিত আছে, সেসব মানুষ বাদে যারা ইমান এনেছে, নেক আমল করেছে; সত্যের ওপর প্রতিষ্ঠিত থেকেছে এবং ধৈর্য ধারণ করেছে।’
ইবাদত সম্পর্কে সুরা বাকারার ২১ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, ‘হে মানুষ, তোমরা আল্লাহর ইবাদত করো যিনি তোমাদের এবং তোমাদের পূর্বে যারা ছিল তাদের সবাইকে সৃষ্টি করেছেন; আশা করা যায় তোমরা সংকট থেকে মুক্ত থাকতে পারবে।’ পবিত্র কোরআনের উল্লিখিত আয়াতে ইমান, আমল ও ইবাদতের ব্যাপারে সুস্পষ্ট নির্দেশ লক্ষ করা যাচ্ছে।
ইমান, আমল ও ইবাদত, এই তিনটি শব্দই আরবি শব্দ এবং কোরআনেরও শব্দ বটে। ‘বন্দেগি’ শব্দটি ফারসি, অর্থ বান্দার আনুগত্য, দাস্যভাব বা গোলামের কাজ। বন্দেগি শব্দটি ইবাদত শব্দের প্রতিশব্দ হিসেবে ব্যবহার হয়। অর্থাৎ যা ইবাদত তাই বন্দেগি।
ভারতীয় উপমহাদেশের মুসলমানদের মধ্যে ইমান সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা লক্ষ করা যায়, কিন্তু আমল ও ইবাদতের সীমা-পরিসীমা ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণে বিশদভাবে তারতম্য পরিলক্ষিত হয়ে আসছে। আমল ও ইবাদতের ধারণা অবগত হওয়ার আগে ‘ইমান’ কী সেটা উল্লেখ করা যেতে পারে। আগেই বলা হয়েছে ‘ইমান’ শব্দটি আরবি। অর্থ বিশ্বাস বা বিশ্বাস স্থাপন করা। অর্থাৎ গায়েব বা অদৃশ্যের ওপর বিশ্বাস রাখা। ইসলামি পরিভাষায় আল্লাহ এবং তার রাসুল (সা.), কোরআন ও হাদিসের মাধ্যমে যেসব বিষয় অবতারণা করেছেন, সেসব বিষয়কে মুখে স্বীকার করে অন্তরে স্থাপন করার মধ্য দিয়ে কাজে পরিণত করার নাম ‘ইমান।’ আর যখন কোনো একজন মানুষ ইমানদার হয়ে ওঠেন, তখন তার জন্য আমল ও ইবাদত অত্যাবশ্যক হয়ে পড়ে। অর্থাৎ ইসলামের বৈশিষ্ট্যগুলোকে ধারণ, লালন-পালন ও প্রচার করার নামই ‘ইমান।’ এখন একজন ইমানদার ব্যক্তি নিজে ‘আমল’ ও ‘ইবাদত’ বলতে কী বুঝতে পারেন তা আলোচনা করা যেতে পারে।
‘আমল’ শব্দটি আরবি। আর আরবি শব্দের বৈশিষ্ট্য হলো একটি শব্দের অসংখ্য প্রতিশব্দ ব্যবহার হয়ে থাকে। সে জন্য ‘আমল’ শব্দের বাংলা প্রতিশব্দ করতে গিয়ে দেখা গেছে ‘আমল’ শব্দের অর্থ দাঁড়ায় ‘কাল’ বা সময়, যেমন জাহেলি আমল কিংবা আব্বাসীয় আমল। ‘আমল’ এর দ্বিতীয় অর্থ হলো ধনসম্পদ; যেমন সুরা নিসার ২ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, ‘এতিমের ধন সম্পদ তাদের কাছে দিয়ে দাও, ভালো জিনিসের সঙ্গে খারাপ জিনিস বদল করো না। এ আয়াতে ‘আমল’কে সম্পদ হিসেবে অর্থ করা হয়েছে। ‘আমল’ এর তৃতীয় অর্থ হলো মূল্যায়ন বা গুরুত্ব দেওয়া; যেমন : বিষয়টিকে আপনি আমলেই নিলেন না? ‘আমল’ এর চতুর্থ অর্থ হলো কাজ বা কর্তব্য। যেমন সুরা আসরে বলা হয়েছে, ‘যারা ইমান এনেছে এবং সৎকাজ করেছে। এখানে সুরা আসরে যে ‘আমল’-এর কথা বলা হয়েছে, এই আমলের অর্থ হলো আল্লাহ ও তার রাসুল (সা.) যা যা করতে বলেছেন, সেসব করা আর যা যা নিষেধ করেছেন, সেসব না করাকে বোঝানো হয়েছে। আর ইবাদত শব্দের অর্থ হলো দাসত্ব করা। অর্থাৎ আল্লাহ ও তার রাসুল (সা.) যা করতে বলেছেন ও যা নিষেধ করেছেন, সেসব করা না করাকেই ইবাদত বোঝায়। আবার এভাবেও বলা যায়, শরিয়ত মতে নিজেকে ও নিজের পরিবার-পরিজনকে পরিচালিত করার নাম ইবাদত। নামাজ পড়া যেমন ইবাদত, তেমনি প্রতিবেশীর প্রতি সহানুভূতিশীল হওয়াও ইবাদত। হজ করা যেমন ইবাদত, তেমনি জুলুম, অত্যাচার ও বৈষম্যের বেড়াজাল থেকে দেশের মানুষকে রক্ষা করাও ইবাদত। জাকাত দেওয়া যেমন ইবাদত, তেমনি দুর্বল মানুষকে আর্থিক ও মানবিক সাহায্য করাও ইবাদত। এসব ইবাদত একটি বাদে অন্যটি অসম্পন্ন। ইবাদত ও আমল শব্দ দুটি একে অন্যের পরিপূরক।