দুর্ভোগ বাড়ছে পানিবন্দিদের

উজান থেকে নেমে আসা ঢল ও টানা বর্ষণে দেশের উত্তর-মধ্যাঞ্চলের কয়েকটি জেলায় বন্যা পরিস্থিতি স্থিতিশীল রয়েছে। নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় কোথাও কোথাও আবার পরিস্থিতির অবনতিও হচ্ছে। এরই মধ্যে বিভিন্ন পয়েন্টে বিপদসীমার ওপর দিয়ে পানি প্রবাহিত হচ্ছে। এতে করে বিভিন্ন জেলায় লোকালয়ে পানি প্রবেশ করাসহ নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হচ্ছে। কয়েকটি অঞ্চলে ‘ভয়াবহ’ নদীভাঙন এবং বহু স্থাপনা নদীতে বিলীন হয়েছে বলে খবর পাওয়া গেছে। এতে সীমাহীন দুর্ভোগ আর ভোগান্তি নিয়ে দিন পার করছে পানিবন্দি লাখো মানুষ। এক স্থান থেকে অন্য স্থানে চলাচল কিংবা পানি পারাপারের জন্য নৌকা বা কলাগাছের ভেলাই একমাত্র ভরসা সেসব বানভাসী মানুষের।

গতকাল সোমবার বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র জানিয়েছে, দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের মেঘনা অববাহিকার প্রধান নদীসমূহের পানি হ্রাস পাচ্ছে, যা আগামী ৪৮ ঘণ্টা পর্যন্ত অব্যাহত থাকতে পারে। এর ফলে আগামী ২৪ ঘণ্টায় কুড়িগ্রাম, জামালপুর, গাইবান্ধা, বগুড়া, টাঙ্গাইল, সিরাজগঞ্জ, পাবনা, মানিকগঞ্জ, রাজবাড়ী এবং ফরিদপুর জেলার নিম্নাঞ্চলসমূহের বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হতে পারে। তবে মুন্সীগঞ্জ ও শরীয়তপুর জেলায় পরিস্থিতি স্থিতিশীল থাকতে পারে। বর্তমানে উত্তর ও মধ্যাঞ্চলের নয়টি নদীর ১৭ পয়েন্টে বিপদসীমার ওপর দিয়ে পানি প্রবাহিত হচ্ছে। এদিকে গত রবিবার পরবর্তী ১০ দিনের সম্ভাব্য পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, ব্রহ্মপুত্র-যমুনা নদীর পানি হ্রাস অব্যাহত থাকতে পারে। জামালপুরের বাহাদুরাবাদ, বগুড়ার সারিয়াকান্দি, সিরাজগঞ্জের কাজীপুর ও সিরাজগঞ্জ স্টেশন, টাঙ্গাইলের এলাসিনঘাট এবং মানিকগঞ্জের আরিচা পয়েন্টে পানি আগামী সাত দিন হ্রাস পেতে পারে। যার ফলে এসব জেলায় বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হতে পারে।

আমাদের টাঙ্গাইল প্রতিনিধি জানিয়েছেন, উজান থেকে নেমে আসা ঢল ও টানা বর্ষণে টাঙ্গাইলের বিভিন্ন নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় বাসাইলে বন্যা পরিস্থিতির ক্রমেই অবনতি হচ্ছে। প্রতিদিন বাড়ছে নদ-নদীর পানির স্ফীতি। বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে ঝিনাই ও বংশাই নদীর পানি। নদীর বাঁধ ও তীর ছাপিয়ে পানি প্রবেশ করছে লোকালয়ে। পানি বৃদ্ধির সঙ্গে ভাঙন ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে। ইতিমধ্যে বহু স্থাপনা নদীতে বিলীন হয়েছে। প্লাবিত হচ্ছে নতুন নতুন এলাকা। এসব বন্যাকবলিত এলাকার গ্রামীণ কাঁচা-পাকা সড়ক পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় উপজেলার প্রায় ৩০টি গ্রামের অন্তত ৩০ হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। বানভাসি মানুষগুলো গবাদিপশু নিয়ে পড়েছে মহাবিপাকে। পানিতে নিমজ্জিত হয়ে গেছে বীজতলা, রোপা আমন ধান, বোনা আমন ও সবজিক্ষেত। ভেসে গেছে অধিকাংশ পুকুরের মাছ। শুকনো খাবার ও বিশুদ্ধ পানির সংকট দেখা দিয়েছে বেশ কিছু এলাকায়।

টাঙ্গাইল জেলা প্রশাসক মো. আতাউল গনি জানান, বন্যায় ক্ষতি হওয়া সব এলাকায় ত্রাণ তৎপরতা অব্যাহত আছে। প্রতিটি এলাকায় চাহিদা অনুযায়ী শিগগিরই সহায়তা প্রদান করা হবে।

রাজবাড়ী প্রতিনিধি জানিয়েছেন, দৌলতদিয়া পয়েন্টে পদ্মা নদীর পানি গতকাল ৫ সেন্টিমিটার কমে বিপদসীমার ৭২ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এছাড়া রাজবাড়ী সদরের মহেন্দ্রপুর পয়েন্টে এক সেন্টিমিটার কমে বিপদসীমার ৩১ সেন্টিমিটার আর পাংশা উপজেলার সেনগ্রাম পয়েন্টে পানি ৫ সেন্টিমিটার বেড়ে বিপদসীমার ৭৫ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। রাজবাড়ীর দুটি পয়েন্টে পানি কিছুটা কমলেও পানিবন্দি মানুষের দুর্ভোগ কমেনি। এখনো নিম্নাঞ্চলের রাস্তাঘাট তলিয়ে আছে। রাজবাড়ীতে পদ্মা তীরবর্তী চার উপজেলার নিম্নাঞ্চলের ৩৫ হাজারের বেশি মানুষ পানিবন্দি হয়ে আছে। রাজবাড়ী জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, রাজবাড়ীতে ৩২৬ হেক্টর ফসলি জমির বিভিন্ন প্রকার ফসলের ক্ষতি হয়েছে। জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা সৈয়দ আরিফুল হক জানান, জেলায় ১০ হাজার ১৩৭টি পানিবন্দি পরিবারের তালিকা পাওয়া গেছে। তাদের সহায়তা করতে ত্রাণ বিতরণ কার্যক্রম চলছে। দুর্গতদের জন্য এখন পর্যন্ত ২৪৮ মেট্রিক টন চাল ও ১৩ লাখ টাকা বিতরণ করা হয়েছে।

দোহার-নবাবগঞ্জ (ঢাকা) প্রতিনিধি জানিয়েছেন, পদ্মার পানি বৃদ্ধির কারণে ঢাকার নবাবগঞ্জের নিম্নাঞ্চলের অনেক পরিবার পানিবন্দি রয়েছে। তাদের চলাচলের একমাত্র বাহন এখন নৌকা। পানিবন্দির কারণে জনজীবনে নেমে এসেছে নানা দুর্ভোগ। এছাড়া জয়কৃষ্ণপুর ইউনিয়নের নিম্নাঞ্চলের ফসলি জমি তলিয়ে গেছে। ১২টি গ্রামের প্রায় ১৫ হাজার পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। নৌকা ছাড়া চলাচল করার কোনো উপায় নেই। দেখা দিয়েছে বিশুদ্ধ খাবার পানির অভাব। গবাদি পশু নিয়ে মহাবিপদে আছে তারা। বাড়িঘর ফেলে আসতে নারাজ পানিবন্দি মানুষজন। খেয়ে না খেয়ে দিন কাটাচ্ছে তারা।

নবাবগঞ্জ উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান নাসির উদ্দিন আহমেদ ঝিলু বলেন, জয়কৃষ্ণপুর ইউনিয়নের পদ্মার তীরবর্তী বেড়িবাঁধের বাইরে আট-নয়টি গ্রামের মানুষ পানিবন্দি রয়েছে। সমস্যা হলে তাদের জন্য প্রতিটি ইউনিয়নে থাকার ব্যবস্থা করা হয়েছে। এছাড়া খাদ্য সংকট যাতে দেখা না দেয়, তার জন্য খাদ্যের ব্যবস্থা করা হয়েছে।