অস্ট্রেলিয়াকে ৪-১ এ সিরিজ হারানোর পর বাংলাদেশ এখন নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে খেলছে। পাঁচ ম্যাচের টি-টোয়েন্টি সিরিজে টাইগাররা এগিয়ে ২-১ ব্যবধানে। বুধবার সিরিজের চতুর্থ ম্যাচ। তবে মাঠের ক্রিকেট নিয়ে টাইগার ভক্তদের মধ্যে যত না আলোচনা, মাঠের বাইরের ক্রিকেট নিয়ে বরং তার চেয়ে উৎকণ্ঠা অনেক বেশি।
দেশের সাবেক অধিনায়ক মাশরাফী বিন মোর্ত্তজাও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ক্রিকেট নিয়ে নিজের মতামত প্রকাশ করে আসছেন। যে ধারাবাহিকতায় এবার জাতীয় দলের কোচ নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তুললেন মাশরাফী।
নিজের ফেইসবুক অ্যাকাউন্ডে কোচ নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়ে বিশাল এক স্ট্যাটাস নিয়েছেন মাশরাফী। যার শুরুটা করেছেন তিনি এভাবে, ‘একটা কোচ যখন নিয়োগ দেওয়া হয়, তার প্রসেস আসলে কি থাকে সেটা জানার খুব ইচ্ছে আমার।’
এরপরই মাশরাফী বিভিন্ন কোচদের সঙ্গে কাজ করার অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন। লিখেন, ‘এ যাবৎকালে প্রায় ৯/১০ জন কোচের সাথে কাজ করেছি আমি। প্রত্যেকটা কোচ তার নিজের মতো করে কাজ শুরু করে, যেটা করাটাও স্বাভাবিক। কারণ একেকজনের কাজের ধরন একেকরকম। কিন্তু সব সময় দেখেছি, প্রত্যেক কোচ তার নিজস্ব একজন বা দুজন প্রিয় খেলোয়াড় বানিয়ে নেয়। পরে সিলেক্টর, ক্যাপ্টেন বা অন্য কেউ তাকে আর কিছুই বোঝাতে পারে না। বরং সম্পর্কগুলো জটিল হতে থাকে।’
‘ওই পছন্দের জন্য সে আবার দুজনকে এমন অপছন্দ করা শুরু করে যে, তাদের আর দেখতেই পারে না। একপর্যায়ে এমন জিদ শুরু করে যে, প্রয়োজনে চাকরি ছেড়ে দেব, এমন কথা প্রকাশ্যেও শুনেছি কয়েকবার কোচের মুখে।’
এ প্রসঙ্গে মাশরাফী তার অভিমত তুলে ধরেন, ‘আমার পয়েন্ট হলো, কোচের পছন্দ কিছু খেলোয়াড় হতেই পারে। সেটা সব কোচেরই হয়। অন্যান্য দেশেও হয়। তবে সেখানে কখনো সেটা প্রকাশ্যে বুঝতে দেয় না, অনুমান করতে হয়। কারণ দলের সেরা ৩/৪ জন খেলোয়াড়ই শুধু ম্যাচ জেতায় না। জেতালেও আপনি একজনের জন্য আরেকজনকে ছোট করতে পারেন না।’
মাশরাফী আরো লিখেন, ‘দর্শক বা সাংবাদিক অনেক কিছু লিখতেও পারে, বলতেও পারে। যেটা একদম নরমাল ব্যাপার। কোচকে বলা হয় ফাদার অফ দ্য সাইড। সে সবাইকে দেখে রাখবে, প্রয়োজনে কঠোর হবে। আবার দলের স্বার্থে যাকে প্রয়োজন তাকে ব্যবহার করবে। তার সবকিছুই হতে হবে পজিটিভ। কারো প্রতি কঠোর, কারো প্রতি নমনীয়, এটা এক রকমের বৈষম্যতে রূপ নেয় আমাদের দেশে। যা গোছানো দলকে অগোছালো করে ফেলে।’
‘একপর্যায়ে তারা (বিদেশি কোচরা) নিজেদের দেশে, না হলে আইপিএল বা আরো ভালো কোনো অফার পেয়ে চলে যাবে। কারণ এত দিনে সে আমাদের দেশের ক্রিকেটকে নিয়ে অনেক এক্সপেরিমেন্ট করে নিজের অভিজ্ঞতা বাড়িয়েছে, নিজের প্রোফাইলও ভারী করেছে। বেতন তো নিয়েছে মাসে ১২/১৫ লাখ টাকা আর আমাদের কোচরা না খেয়ে মরে। গালিও দেখি আমাদের কোচরাই হজম করে।’
‘পরে উনারা চলে গেলে আমরা পড়ি বিপদে। আবার নতুন কোচ, নতুন পরীক্ষা, নতুন দাবি মেটানো। এভাবেই চলছে বাংলাদেশে কোচদের যাওয়া-আসা।’
কোচ নিয়োগের প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তুলে মাশরাফীর লিখেন, ‘কোচ নিয়োগের সময় যে ইন্টারভিউ নেওয়া হয়, সেখানে আসলে তাকে কি প্রশ্ন করা হয়? বা আদৌ কি করা হয় কোনো প্রশ্ন? নাকি শুধু জানতে চাওয়া হয়, ‘তোমার কি করার ইচ্ছা?’ হয়তো তখন সে কিছু পয়েন্ট তুলে ধরে। ওখান থেকে নতুনত্ব কিছু পেলে চিন্তা করা হয়, ‘দারুণ কোচ, কী সুন্দর পরিকল্পনা, এর মতো কোচই হয় না।’
মাশরাফীর চোখে, ‘আমার তো মনে হয়, ভুল ওখানেই হয়ে যায়। কারণ, মানুষকে বোঝাতে আমরা সব সময় হাই প্রোফাইল কোচ খুঁজি, যা পরে আর কোনো কাজে আসে না। আমাদের প্রয়োজন, যে আমাদের ক্রিকেট ফলো করে বা আমাদের ম্যাক্সিমাম খেলোয়াড়কে নিয়ে স্টাডি করে এসে ইন্টারভিউ দিচ্ছে (এ রকম কোচ)। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, আমাদের সংস্কৃতি সম্পর্কে ন্যূনতম ধারণা নিয়ে আসা। তা না হলে তো সে বুঝবেই না, একজন সাকিব, তামিম, মুশফিক, রিয়াদ তৈরি করতে কত দিন লেগেছে, বা অতীতে তাদের অবদান কী, একজন মোস্তাফিজ কীভাবে উঠে এসেছে।’
মাশরাফীর কথায় আক্ষেপও ঝড়ে, ‘বারবার বলেছি, আবারো বলছি, দলের আগে কখনোই কোনো খেলোয়াড় হতে পারে না। ভালো না করলে বাদ পড়তেই হবে। অফ ফর্ম সব খেলোয়াড়ের জীবনেই যায়। বাদও পড়ে। কিন্তু ম্যানেজমেন্ট থেকে অপমানিত শুধু আমাদের দেশেই বেশি হয়।’
‘পারফর্ম না করলে বাদ দেবেন স্বাভাবিক। আবার তাকে তো সহযোগিতা করতে হবে, কীভাবে ফর্মে আনা যায় বা তাকে মেন্টালি কীভাবে সাপোর্ট করা যায়। কোনোভাবেই আপনি বুঝতে দিতে পারেন না যে, আপনি তাকে আর আপনার সময়কালে দেখতে চান না। এটার কারণ একটাই, কোনো কোচই আমাদের দেশে কাজ করার আগে আমাদের দেশের ক্রিকেটের ফলোয়ার থাকে না। চাকরির জন্য আসে, শেষ হলে চলে যায়।’
তাই মাশরাফীর প্রস্তাব, ‘আমার মনে হয়, হাই প্রোফাইল কোচ নয়, আমাদের প্রয়োজন আমাদের কোচ, বাংলাদেশের কোচ।’