নির্ধারিত সময়ে নির্মাণকাজ শেষ নিয়ে সংশয়

কর্ণফুলী নদীর তলদেশে নির্মাণাধীন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান টানেলের কাজে বারবার বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে করোনা পরিস্থিতি। বৈশ্বিক এ মহামারীর প্রভাবে প্রকল্পের কাজে দেখা দিয়েছে ধীরগতি। প্রকল্পের মেয়াদ আছে ১৬ মাস। এখনো ২৮ শতাংশ কাজ বাকি রয়েছে। প্রকল্প পরিচালকসহ কর্মরত বেশ কয়েকজন বিদেশি শ্রমিক করোনায় আক্রান্ত। ফলে নির্ধারিত সময়ে নির্মাণকাজ শেষ হওয়া নিয়ে সংশয়ে রয়েছেন প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা।

বাংলাদেশ ও চীনের যৌথ সহায়তায় ৯ হাজার ৮৮০ কোটি টাকা ব্যয়ে বাস্তবায়নাধীন ‘মাল্টি লেন রোড টানেল আন্ডার রিভার কর্ণফুলী প্রজেক্ট’ নামে নদীর তলদেশে দেশের প্রথম সুড়ঙ্গ পথের নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার কথা রয়েছে ২০২২ সালের ডিসেম্বরে। গত আগস্ট পর্যন্ত প্রকল্পের সার্বিক ভৌত অগ্রগতি হয়েছে ৭২ শতাংশ।

সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, টানেলের দুটি টিউবের মধ্যে প্রথমটির ইন্টারনাল স্ট্রাকচারের কাজ চলছে। একই সঙ্গে চলছে লেন সø্যাব ঢালাইয়ের কাজ। অন্যদিকে আনোয়ারা প্রান্ত থেকে শুরু হওয়া দ্বিতীয় টিউবের বোরিং কাজ চলছে। টিউবটির মোট ২ হাজার ৪৫০ মিটারের মধ্যে আগস্ট পর্যন্ত ১ হাজার ৪৫০ মিটার বোরিং সম্পন্ন হয়েছে বলে জানান প্রকল্পসংশ্লিষ্টরা। টিউবের দুই প্রান্তে ৫ দশমিক ৩৫ কিলোমিটার অ্যাপ্রোচ সড়কের কাজও চলমান রয়েছে।

কর্ণফুলী নদীর পূর্বতীর ঘেঁষে গড়ে ওঠা ডাউন টাউনকে শহরের সঙ্গে যুক্ত করে চট্টগ্রাম শহরকে চীনের সাংহাই নগরীর মতো ‘ওয়ান সিটি টু টাউন’ হিসেবে গড়ে তোলার পাশাপাশি ঢাকা-চট্টগ্রাম-কক্সবাজারের মধ্যে নতুন সড়ক যোগাযোগের জন্যই এ টানেল নির্মাণ করা হচ্ছে। চায়না কমিউনিকেশন অ্যান্ড কনস্ট্রাকশন কোম্পানি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান হিসেবে প্রকল্পের কাজ করছে।

প্রাথমিকভাবে প্রকল্প ব্যয় ৮ হাজার ৪৪৬ কোটি টাকা নির্ধারণ করা হলেও পরে বাড়িয়ে ৯ হাজার ৮৮০ কোটি টাকা করা হয়। এর মধ্যে এক্সিম ব্যাংক প্রকল্প সাহায্য হিসেবে দিচ্ছে ৫ হাজার ৯১৩ কোটি ১৯ লাখ টাকা। বাকি অর্থ দেওয়া হচ্ছে সরকারি ফান্ড থেকে।

২০১৬ সালের ১৪ অক্টোবর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও চীনের প্রেসিডেন্ট শি চিনপিং প্রকল্পের নির্মাণকাজের উদ্বোধন করেন। তবে এক্সিম ব্যাংকের সঙ্গে সরকারের ঋণচুক্তির পর ২০১৭ সালের ৫ ডিসেম্বর থেকে কার্যত প্রকল্পের মাঠপর্যায়ের কাজ শুরু হয়। অর্থ ছাড়ে বিলম্বের কারণে টানেল খননের কাজ শুরু হয় ২০১৮ সালের শেষদিকে।

প্রকল্পটি শেষ করার সময়সীমা নির্ধারণ করা হয় ২০২২ সালের ডিসেম্বর। প্রথম দিকে দ্রুত কাজ এগিয়ে চললেও করোনা পরিস্থিতির কারণে ২০২০ সালের মার্চে এসে থমকে যায় গতি। করোনা পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার ঘোষিত সাধারণ ছুটির ওই সময়ে প্রকল্পে শ্রমিক সংকট প্রকট হয়। হাতেগোনা চীনা শ্রমিক দিয়ে তখন প্রকল্পের কাজ চালু রাখা হয়। পরে করোনার প্রথম ঢেউয়ের শেষদিকে পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হলে প্রকল্পের নির্মাণকাজ আবারও গতি পায়।

করোনার মধ্যেই গত বছরের আগস্টে টানেলের প্রথম টিউবের বোরিং শেষ হয়। এরপর ডিসেম্বরে শুরু হয় আনোয়ারা প্রান্ত থেকে দ্বিতীয় টিউবের বোরিং কাজ। এরপর থেকে চীন ও দেশীয় মিলে সহস্রাধিক শ্রমিক সেখানে কাজ করছিলেন। কিন্তু দেশে করোনার দ্বিতীয় ঢেউ ভয়াবহ আকারে নিলে প্রভাব পড়ে নির্মাণকাজে। সংক্রমণের ঊর্ধ্বগতি রোধে গত ৫ এপ্রিল থেকে নতুন করে সরকারি বিধিনিষেধ আরোপ করলে আবারও শ্লথ হয়ে পড়ে প্রকল্পের কাজ। এ সময় কর্মরত কয়েকজন শ্রমিক করোনায় আক্রান্ত হলে প্রায় এক মাস স্কেভেশনের কাজ বন্ধ রাখা হয়।

এরই মধ্যে গত সপ্তাহে করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন প্রকল্প পরিচালক প্রকৌশলী হারুনুর রশিদ। বর্তমানে তিনি ঢাকার বাসায় আইসোলেশনে থেকে চিকিৎসা নিচ্ছেন। দেশ রূপান্তরের সঙ্গে মোবাইলে আলাপকালে তিনি বলেন, ‘যথাসময়ে নির্মাণকাজ শেষ করতে আমাদের চেষ্টার ঘাটতি নেই। কিন্তু করোনা পরিস্থিতি বারবার থামিয়ে দিচ্ছে। করোনার প্রথম ঢেউয়ে পিছিয়ে পড়লেও পরে পুষিয়ে নিতে সক্ষম হই। কিন্তু দ্বিতীয় ঢেউয়ে প্রকল্পের কর্মকর্তা এবং বেশ কয়েকজন চীনা শ্রমিক আক্রান্ত হলে বড় ধরনের ধাক্কা খাই। প্রায় এক মাস স্কেভেশনের কাজ বন্ধ রাখতে বাধ্য হই।’

তিনি আরও বলেন, ‘চীনা শ্রমিক কেউ আক্রান্ত হলে তার সঙ্গে কাজ করা অন্যদের ১৪ দিনের কোয়ারেন্টাইনে পাঠাতে হচ্ছে। এতে কাজের স্বাভাবিক গতি ঠিক রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে। এরপরও সরকারের অগ্রাধিকার প্রকল্প হিসেবে নির্দিষ্ট সময়ে টানেলের নির্মাণকাজ এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। আগস্ট পর্যন্ত প্রকল্পের ৭২ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে। এখন নির্দিষ্ট সময়ে প্রকল্পের কাজ শেষ করা যাবে কি না তা পুরোপুরি নির্ভর করছে করোনা পরিস্থিতির ওপর।’