দাম্পত্যজীবনে সন্দেহ নয়

সাহাবি হজরত নোমান বিন বাশির (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘আমি হজরত রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি (এ কথা বলে তিনি আঙুল দিয়ে নিজ কানের দিকে ইঙ্গিত করেন; অর্থাৎ নিজ কানে শুনেছি) নিশ্চয় হালাল সুস্পষ্ট এবং হারাম সুস্পষ্ট; উভয়ের মাঝে রয়েছে অস্পষ্ট বিষয়াবলি যা অধিকাংশ লোকই জানে না।সুতরাং যে অস্পষ্ট বিষয়াবলি থেকে দূরে থাকবে তা তার সম্মান ও দ্বীনদারি উভয়ের জন্য কল্যাণকর সাব্যস্ত হবে।

পক্ষান্তরে যে এতে পতিত হবে সে হারামে লিপ্ত হবে। যেমন রাখাল সংরক্ষিত এলাকা থেকে ভয়ে দূরে থাকে যাতে সে এতে ঢুকে না পড়ে। মনে রেখো, প্রত্যেক রাজারই কিছু সংরক্ষিত স্থান থাকে। আরও মনে রেখো, আল্লাহর সংরক্ষিত এলাকা (যার সীমানা অতিক্রম করা নিষিদ্ধ) হলো, তার হারাম ঘোষিত বিষয়গুলো। তোমরা মনে রেখো, নিশ্চয় (মানুষের) শরীরে একটি মাংসপি- আছে। সেটা যদি সুস্থ থাকে তাহলে সারা দেহ সুস্থ আর সেটা যদি অসুস্থ হয়ে পড়ে তাহলে সারা শরীর অসুস্থ হয়ে যায়। মনে রেখো, সেটা হলো- কলব বা আত্মা।’ -সহিহ বোখারি : ৫২

মানুষের ইসলামের সৌন্দর্য হলো- সে যাবতীয় অনর্থক কাজ পরিহার করবে। ইসলাম মানুষকে অন্যের ব্যাপারে সুধারণা পোষণ করার নির্দেশ দিয়েছে। কাউকে অহেতুক সন্দেহ করতে নিষেধ করেছে। মানুষের ব্যক্তিগত ব্যাপারে গোয়েন্দাগিরি করা, দোষ খুঁজে বেড়ানো, পেছনে সমালোচনা করার মতো কাজগুলো ইসলামে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। কোরআনের বহু আয়াত ও হাদিসে এ ধরনের অভ্যাসের কঠোর নিন্দা করা হয়েছে।

এ প্রসঙ্গে আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘হে বিশ্বাসী! তোমরা অন্যের ব্যাপারে অধিকাংশ আন্দাজ-অনুমান থেকে দূরে থাকো। আন্দাজ-অনুমান অনেক ক্ষেত্রেই গোনাহের কাজ। তোমরা একে অন্যের গোপনীয় বিষয় খুঁজে বেড়িও না এবং কারও অনুপস্থিতিতে তার নিন্দা কোরো না। তোমাদের মধ্যে কেউ কি মৃত ভাইয়ের গোশত খেতে চাইবে? তোমরা তো এটাকে ঘৃণ্য মনে করো। আল্লাহকে ভয় করো; নিশ্চয়ই আল্লাহ তওবা কবুলকারী, পরম দয়ালু।’ -সুরা হুজুরাত : ১২

ইবনে হাজার হায়সামি (রহ.) এ আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেন, ‘বর্ণিত আয়াতে আল্লাহতায়ালা মানুষের ব্যক্তিগত ও গোপনীয় বিষয় নিয়ে আলোচনা এবং মানুষের দোষ অনুসন্ধান করতে নিষেধ করেছেন।’

এ বিষয়ে নিষেধাজ্ঞা ও সতর্কবাণী এসেছে বহু হাদিসেও। হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘সাবধান! তোমরা সন্দেহ করা থেকে বিরত থাকো। কারণ সন্দেহ করা হচ্ছে সবচেয়ে বড় মিথ্যাচার। পরস্পরের বিরুদ্ধে তথ্য তালাশ কোরো না এবং গোয়েন্দাগিরি কোরো না।’ -সহিহ বোখারি : ৪৯১৭

অন্য হাদিসে এ কাজগুলো যারা করে তাদের সতর্ক করা হয়েছে। এরকম অভ্যাসের কারণে দুনিয়াতেই লাঞ্ছিত হতে হবে বলে কঠোরভাবে সাবধান করা হয়েছে। হজরত আবু বারযা আসলামি (রা.) থেকে বর্ণিত, আল্লাহর রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘যারা মুখে ইমান এনেছে এবং যাদের হৃদয়ে ইমান স্থান পায়নি তারা শোনো! তোমরা মুসলমানদের গিবত করো না এবং তাদের দোষ খুঁজে বেড়িও না। যে ব্যক্তি তাদের দোষ খুঁজবে, আল্লাহ তার দোষ ধরবেন আর আল্লাহ যার দোষ ধরবেন তাকে তার ঘরের ভেতরেও লাঞ্ছিত করবেন।’ -সুনান আবু দাউদ : ৪৮৮২

কোরআনের বর্ণিত আয়াত ও হাদিস থেকে বোঝা যায়, প্রত্যেক মুসলমানের ব্যাপারেই ভালো ধারণা রাখা কর্তব্য। উপযুক্ত কারণ ও প্রমাণ ছাড়া অহেতুক কাউকে সন্দেহ করা অন্যায়। কারও ব্যাপারে অমূলক খারাপ ধারণা করা এবং কারও দোষ অনুসন্ধান করা গোনাহের কাজ। বিশেষ করে স্বামী-স্ত্রী পরস্পরে ধারণা ও আচরণের ক্ষেত্রে এটা প্রযোজ্য।

সাম্প্রতিক সময়ে দেশের একাধিক গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শুধুমাত্র সন্দেহকে ঘিরে অনেক দম্পতির মধ্যে বিচ্ছেদ ঘটছে। শুধু এখানেই শেষ নয়, ক্ষেত্রবিশেষ মারামারি ও খুনাখুনি পর্যন্ত ঘটছে। শুধু নি¤œবিত্ত কিংবা উচ্চবিত্ত পরিবার নয়, শিক্ষিত কিংবা অশিক্ষিত দম্পতি নয় ব্যাপকভাবে স্বামী-স্ত্রী পরস্পরের ওপর গোয়েন্দাবৃত্তিকে পরস্পরের অধিকার ও স্বাভাবিক বিষয় বলে মনে করে থাকে। যা কোনোভাবেই কাম্য নয়।

বর্তমানে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সবাই মোবাইল ফোন ব্যবহার করে, ফেইসবুক, হোয়াটসঅ্যাপসহ সামাজিক যোগাযোগের অন্যান্য মাধ্যম ব্যবহার করে। অনেকেই সঙ্গী বা সঙ্গিনীর অগোচরে তাদের মোবাইল ফোন চেক করেন, ফেইসবুকসহ অন্যান্য মেসেজ-অ্যাপগুলোর ইনবক্স চেক করেন। এটাকে তেমন দোষের কিছু মনে করেন না। এ ধরনের গোয়েন্দাবৃত্তি ইসলামে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। ওপরে বর্ণিত আয়াত ও হাদিসগুলোর নিষেধাজ্ঞা এ ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য।

এ ছাড়া হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) বিশেষভাবে স্ত্রীর দোষ অনুসন্ধান করতে, তার ওপর গোয়েন্দাগিরি করতে নিষেধ করেছেন। হজরত জাবির ইবনে আবদুল্লাহ (রা.) বলেন, ‘নবী করিম (সা.) সফর থেকে এসে রাতে ঘরে ফেরা অপছন্দ করতেন।’ -সহিহ বোখারি : ৪৮১২

সহিহ মুসলিমের অন্য বর্ণনায় এ নিষেধাজ্ঞার কারণ স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। হজরত জাবির (রা.) বলেন, ‘হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) সফর থেকে ফিরে স্ত্রীর প্রতি সন্দেহবশত বা তার ওপর গোয়েন্দাগিরির উদ্দেশ্যে রাতের বেলা অতর্কিতে ঘরে গিয়ে উপস্থিত হতে নিষেধ করেছেন।’ -সহিহ মুসলিম : ৪৮১৬

নবী করিম (সা.) সফর থেকে ফিরে সরাসরি বাসায় না ঢুকে আগে মসজিদে যেতেন। সেখানে দুই রাকাত নামাজ আদায় করে তারপর ঘরে আসতেন। এতে করে ঘরের লোকেরা তাকে স্বাগত জানানোর জন্য মানসিক প্রস্তুতির সুযোগ পেতেন। এসব হাদিস থেকে বোঝা যায়, এ ধরনের সন্দেহ ও গোয়েন্দাবৃত্তি ইসলামে কতটা অপছন্দনীয়।

ইসলামের নির্দেশনা হলো, যতক্ষণ পর্যন্ত স্বামী বা স্ত্রী সন্দেহজনক কিছু না করছে, ততক্ষণ পরস্পরের ব্যাপারে সুধারণা পোষণ করতে হবে। প্রকাশ্য কথা ও আচরণ অনুযায়ীই পরস্পরের সঙ্গে সদ্ব্যবহার ও সদাচরণ করতে হবে। গোপনীয় বিষয় আল্লাহর ওপর ছেড়ে দিতে হবে। তাহলে আল্লাহ তাদের বৈবাহিক সম্পর্কে বরকত দান করবেন, পরিবারে শান্তি ও ভালোবাসা দান করবেন, প্রত্যেককেই বিশ্বস্ত থাকতে সাহায্য করবেন।

লেখক : মুফতি ও ইসলামবিষয়ক লেখক