দেশের প্রাণকেন্দ্র রাজধানী ঢাকায় ‘সিটিং সার্ভিস’ ঘিরে গণপরিবহনের বিশৃঙ্খলা নিরসনে সরকার গঠিত কমিটির সুপারিশ চার বছরেও বাস্তবায়ন হয়নি। রাজধানীর গণপরিবহন খাতে শৃঙ্খলা ফেরাতে ওই কমিটি ২৬টি সুপারিশ করলেও তার একটিও এই দীর্ঘ সময়ে বাস্তবায়ন হয়নি বলে জানিয়েছেন কমিটির এক সদস্য। এছাড়া সুপারিশগুলো আদৌও বাস্তবায়ন হবে কি না তা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন সংশ্লিষ্টরা।
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্র্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) গঠিত ওই কমিটি সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন পক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে ২৬টি সুপারিশ করে, তার মধ্যে সাতটি ছিল সিটিং সার্ভিস নিয়ে। তবে দেশের মোটরযান আইন বা সড়ক পরিবহন নীতিমালার কোথাও সিটিং সার্ভিস বলে কোনো শব্দ নেই। সরকার নির্ধারিত ভাড়া কিলোমিটারপ্রতি ১ টাকা ৭০ পয়সা নির্ধারণ করা থাকলেও তার তোয়াক্কা করছেন না পরিবহন মালিকরা। ‘সিটিং সার্ভিস’, ‘গেটলক সার্ভিস’ ও ‘কম স্টপেজ সার্ভিস’সহ হরেক নাম দিয়ে যে যার ইচ্ছে অনুযায়ী ভাড়া নির্ধারণ করে বাস পরিচালনা করে আসছে। যার ফলে স্থান ও পরিবহনভেদে কোথাও দ্বিগুণ আবার কোথাও তিনগুণ ভাড়া আদায় করা হচ্ছে।
রাজধানীতে কথিত সিটিং সার্ভিস বন্ধে ২০১৭ সালের এপ্রিলে বিআরটিএ, পরিবহন মালিক সমিতি ও পুলিশ অভিযান শুরু করে। তখন পরিবহন মালিকরা বাস চলাচল বন্ধ করে দিয়ে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করেন। এরপর সিটিং সার্ভিস পুনরায় চালু করে এ বিষয়ে করণীয় ঠিক করতে বিআরটিএ, মালিক-শ্রমিক সংগঠন, নাগরিক প্রতিনিধি ও পুলিশের সমন্বয়ে আট সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়। ওই কমিটি ২৬ দফা সুপারিশ সংবলিত প্রতিবেদন ২০১৭ সালের নভেম্বরে সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয়ে জমা দেয়। এ সুপারিশগুলোর বিষয়ে সিদ্ধান্ত আটকে আছে ঢাকা মহানগর আঞ্চলিক পরিবহন কমিটিতে (মেট্রো আরটিসি)। ঢাকায় বাস চলাচলের অনুমতি দেয় এই মেট্রো আরটিসি।
কমিটি সুপারিশ করেছিল, রাজধানীতে চলাচলকারী কিছু বাস সিটিং আর কিছু হবে লোকাল। দুই শ্রেণির বাসের রং হবে আলাদা। সিটিং সার্ভিসে দাঁড়িয়ে যাত্রী পরিবহন করা যাবে না, স্টপেজ থাকবে কম। আর লোকাল বাসকে কোনো অবস্থাতেই সিটিং সার্ভিস হিসেবে ব্যবহার না করার পরামর্শ দিয়েছিল কমিটি। ভাড়া নৈরাজ্য, যাত্রী হয়রানি ও একচেটিয়া ব্যবসা বন্ধে বেসরকারি মালিকদের অনুমতি বন্ধ রেখে বিআরটিসির দ্বিতল বাস বেশি করে চালুর পরামর্শ দিয়েছিল কমিটি। তবে সেসব সিদ্ধান্ত কাগজেই আটকা রয়ে গেছে, কোনোটাই বাস্তবায়ন হয়নি।
তবে বিআরটিএ গঠিত কমিটির আহ্বায়ক সংস্থাটির পরিচালক (রোড সেইফটি) শেখ মোহাম্মদ মাহবুব-ই-রব্বানীর দাবি, তাদের সুপারিশের পর রাজধানীর গণপরিবহন খাতে বেশ কিছু পরিবর্তন এসেছে। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এটা তো এক ডিপার্টমেন্টের বিষয় নয়। আমরা সব ডিপার্টমেন্টকে রিকুয়েস্ট করেছিলাম এটা বাস্তবায়নের জন্য। তার প্রেক্ষাপটেই মেট্রোরেল হচ্ছে। রুট ফ্রাঞ্চাইজি হচ্ছে। এসব সুপারিশের কারণেই তো এসব হচ্ছে।’
কিন্তু কমিটির আহ্বায়কের সঙ্গে ভিন্নমত পোষণ করে ওই কমিটির সদস্য অজয় দাশ গুপ্ত দেশ রূপান্তরকে বলেছেন, ‘মেট্রোরেলের তো এর সঙ্গে কোনো সম্পর্ক নেই। যদি সত্যটা বলি, ২৬ দফা সুপারিশের কোনো দফাই বাস্তবায়ন হয়নি। শ্রমিকদের স্বাস্থ্যের ব্যাপার, পোশাকের ব্যাপার, তার লাইসেন্স, নিয়োগপত্র, প্রকৃত অর্থে তারা যেটা বলে, মেট্রোরেলের সঙ্গে এর কোনো সম্পর্ক নেই।’
তিনি আরও বলেন, ‘মেট্রোরেলে দিনে সর্বোচ্চ পাঁচ লাখ যাত্রী যাতায়াত করবে। কিন্তু ঢাকা শহরে প্রতিদিন ৫০ লাখ যাত্রী যাতায়াত করে। যার ফলে সেই মানুষগুলোর স্বার্থ তো দেখতে হবে। বাসই নগরের প্রধান পরিবহন থাকবে। আমাদের টার্গেট ছিল উন্নত বাস চালু করা। প্রাইভেট কারের ব্যবহার কমিয়ে এনে আধুনিক বাস চালু করা।’ সরকার এখনো পরিবহন মালিক-শ্রমিকদের কাছে জিম্মি উল্লেখ করে হতাশা প্রকাশ করেন জ্যেষ্ঠ এই সাংবাদিক।
সিটিং সার্ভিসের ভাড়া নৈরাজ্য বন্ধ না হওয়ার কারণ জানতে চাইলে বিআরটিএ পরিচালক শেখ মোহাম্মদ মাহবুব-ই-রব্বানী বলেন, ‘তাদের মামলা করতেছি। জরিমানা করতেছি। আমরা তো বসে নেই।’ তাহলে সিটিং সার্ভিসের নামে নৈরাজ্য চলতেই থাকবে কি না এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘করোনার পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এটা তো এক সংস্থার বিষয় না।’
বিআরটিএ গঠিত কমিটির সদস্য অজয় দাশ গুপ্ত বলেন, ‘আমরা অনেকগুলো মিটিং করেছিলাম। যখন মিটিংয়ে উপস্থিত থাকতাম, তখন বেশ গুরুত্ব দিয়েছে। একটা মিটিং হয়েছে ১০০ পরিবহন মালিক, শ্রমিক, নেতাদের উপস্থিতিতে। তৎকালীন সময়ে বিষয়টা সিরিয়াসভাবে নেওয়া হয়েছিল।’ রুট ফ্রাঞ্চাইজির প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, ‘এখন বলতেছে, চারটা-পাঁচটা কোম্পানি। এ বিষয়টা ওগুলোর মধ্যে ছিল। রাজধানীর সামগ্রিক সুবিন্যস্ত একটা গণপরিবহন পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ব্যবস্থা করা হয়েছিল। সিটিং, নন-সিটিং পরিবহন শ্রমিকদের ইউনিফর্ম দেওয়া। পরিবহন শ্রমিকদের প্রশিক্ষণ দেওয়া। পরে প্রধানমন্ত্রী যেগুলো বলছেন, ছয় ঘণ্টার বেশি কাজ করবে না। সেগুলো আমাদের সুপারিশ ছিল। এছাড়া বাড়তি ভাড়া আদায় এসব বন্ধে কাজ করেছিলাম। পরিবহন শ্রমিকরা মেনেও নিয়েছিল। বিষয়টা কিন্তু বাস্তবসম্মত ছিল। সবচেয়ে বড় কথা হলো পরিবহন শ্রমিক-মালিক সবটা মেনে নিয়েছিল ওই বৈঠকে বসে।’
করোনাকালে রাজধানীর গণপরিবহন খাতের অব্যবস্থাপনার চিত্র তুলে অজয় দাশ গুপ্ত বলেন, ‘করোনাকালে অর্ধেক যাত্রী নিয়ে বাস চলবে, এ কারণেই দ্বিগুণ ভাড়া দিতে হবে। কিন্তু অর্ধেক যাত্রী নিয়ে তো কেউ চলেনি। শ্রমিকরা বলতেছে যাত্রীরা জোর করে ওঠে। যাত্রীরা কি জোর করে ওঠার ব্যাপার? মালিকরাই চায় না সরকারের দেওয়া নির্দেশনা মেনে চলতে। দূরপাল্লার বাসে কি ইঞ্জিনের কভারে বসিয়ে যাত্রী নেওয়া হয় নাই?’
মালিকরা শ্রমিকদের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে জানিয়ে জ্যেষ্ঠ এ সাংবাদিক বলেন, ‘শ্রমিকদের যেহেতু চাকরি চাই, তাদের কোনো নিয়োগপত্র নেই। কাজেই মালিক যদি বলে বাড়তি লোক ওঠাতে হবে, ভাড়ায় নৈরাজ্য করতে হবে, সেখান থেকে তুমি একটা পার্সেন্টেজ কেটে রাইখো, সে তো তখন বাধ্য। এছাড়াও গণপরিবহনে চাঁদাবাজির ফলে যাত্রীরা এর শিকার হয়।’
এ প্রসঙ্গে সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির মহাসচিব এনায়েত উল্লাহ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘কমিটির সুপারিশ বাস্তবায়ন হয়নি। উদ্যোগ নিয়েছিলাম। তখনকার কমিটি এটা বাস্তবায়ন করতে রাজি হয়নি।’
ঢাকা মহানগর পুলিশের সাবেক কমিশনারের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, ‘আসাদ সাহেব যখন কমিশনার ছিলেন তখন এটা উঠিয়েছিলাম। তখন নির্বাচন ছিল। তিনি বলেছিলেন, এখন এটা করা যাবে না।’
বিআরটিএ গঠিত কমিটির সুপারিশ বাস্তবায়ন না হওয়া ক্ষুব্ধ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘গণমাধ্যমগুলো সরব হলে সরকার মলম লাগিয়ে উপশমের চেষ্টা করে। আসলে পরিবহন সেক্টরে আপাদমস্তক ক্যানসারের ক্ষত। চার বছর আগে গণমাধ্যম সরব হয়েছিল, তখন তড়িগড়ি করে কমিটি করা হলো। কিছু বৈঠক করা হলো। কমিটির সুপারিশ বাস্তবায়নের জন্য গেল, কিন্তু তখন গণমাধ্যম নীরব ছিল। ফলে এ বিষয়গুলো ধামাচাপা পড়ে গেল।’
তিনি আরও বলেন, ‘সড়ক পরিবহন নীতিমালা বা বিধিমালায় কোথাও কিন্তু সিটিং সার্ভিস নামে কিছু নাই। যে বিদ্যমান ভাড়া নির্ধারণ করা হয়েছে সেটাই কিন্তু সিটিং সার্ভিস। আবার সিটিংয়ের কথা বলে বাড়তি ভাড়া আদায়ের কোনো সুযোগ নেই। এ বিষয়টা বুঝতে পেরে সরকার কিন্তু পিছিয়ে গেল। তবে দুর্ভোগ কিন্তু জনগণের পিছু ছাড়েনি। ফলে এই সমস্যাগুলো সমস্যাই থেকে যায়। আলোর মুখ দেখে না।’