আমাদের দেশের গণমাধ্যম হঠাৎ-হঠাৎ একের পর এক ‘জিরো থেকে হিরো’ বনে যাওয়া ব্যক্তিকে নিয়ে মেতে ওঠে। কখনো স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের গাড়িচালক আব্দুল মালেক, কখনো ওসি প্রদীপ, কখনো পিকে হালদার, কখনো যুবলীগ নেতা জিকে শামীম, কখনো হেলেনা জাহাঙ্গীর গণমাধ্যমের কাছে আকর্ষণীয় খবরে পরিণত হন। এখন যেমন অবৈধভাবে কোটি কোটি টাকার সম্পত্তি বানানো পুলিশ পরিদর্শক সোহেল রানাকে নিয়ে নানা প্রতিবেদন ছাপা হচ্ছে।
এ ধরনের প্রতিবেদন দেখলে সরকারের প্রতি ক্ষোভ জন্ম নেওয়াটাই স্বাভাবিক। কারণ যারা অবৈধভাবে কোটি কোটি টাকা বানাচ্ছেন, তারা রাতারাতি এসব বানাতে পারেন না। তারপরও সরকার এদের ধরতে পারে না! হয়তো ধরার ইচ্ছাও সেভাবে নেই। মাঝে-মধ্যে দুই-একজনকে নিয়ে একটু হৈ-চৈ হয়, ব্যস। এর বেশি সরকার কিছু করবে বলেও মনে হয় না। কিন্তু এখন সরকারের প্রতি ক্ষোভের চেয়েও আমার বরং সেই সব ব্যক্তিকে নিয়ে প্রশ্ন জাগে, যারা কোটি কোটি টাকার পেছনে হন্যে হয়ে ঘুরেন, টাকার নেশায় যারা উন্মত্তের মতো বাঁচেন, এত টাকা দিয়ে কী হয়? জীবনে কোন কাজে লাগে? জীবনের মানে কি কেবল টাকা বানানো? মানুষের জীবনের উদ্দেশ্য নিয়ে রয়েছে নানা মুনির নানা মত। আনন্দ নিয়ে বাঁচা, জীবনকে উপভোগ করা, সুখে-শান্তিতে বসবাস করা, সমাজের কল্যাণে কাজ করা, ঈশ্বরের আরাধনা করা এমন হাজারো মত শোনা যায়। এ সম্পর্কে হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর ভাবনা একেবারেই ব্যতিক্রম। মুক্তি, পরমাত্মায় মিশে যাওয়া, এ সবের ধারেকাছে যাননি, মানুষকে দয়া, শিবজ্ঞানে জীবসেবার ধারণাও তার নয়। আমরা সবাই মানুষের কাছে নানাভাবে ঋণী। আমাদের জীবনের উদ্দেশ্য সে ঋণ শোধ করা। সমাজের জন্য, মানুষের মঙ্গলের জন্য কাজ করার কারণ হিসেবে আমাদের দায়বদ্ধতার যে ধারণা তিনি বেঁধে দিয়েছিলেন, তা অনন্যসাধারণ।
বঙ্গদর্শন-এ প্রকাশিত ‘মনুষ্য জীবনের উদ্দেশ্য’ প্রবন্ধে হরপ্রসাদ লিখছেন: “মনুষ্যজীবনের দেনা যে যাহার নিকট হইতে লইয়াছি তাহাকেই শোধ দিতে হইবে তাহা নহে। লইলাম সমাজের নিকট দিলাম সমাজকে; পিতামাতার খাইয়া মানুষ হইলাম, মানুষ করিলাম সন্তানকে। দাতার খাইয়া মানুষ হইলাম, দিলাম অনাথকে। দরিদ্রালয় হইতে মানুষ হইলাম, স্থাপন করিলাম বিদ্যালয়। গুরুর নিকট উপদেশ পাইলাম, শিক্ষা দিলাম ছাত্রকে। গ্রন্থকারের নিকট উপদেশ পাইলাম, নিজে গ্রন্থ পাঠ করিয়া রচনা করিয়া তাহার ঋণ শোধ দিলাম। কিন্তু সর্বত্র চেষ্টা করা উচিত যাহা পাইয়াছি তাহার অধিক দেওয়া।... অনেকে মনে করেন বিদ্যা জীবনের উদ্দেশ্য, আত্মোন্নতি জীবনের উদ্দেশ্য। কিন্তু বিদ্যা যদি খরচ না হইয়া শুদ্ধ পেটে গজগজ করে তবে বিদ্যায় কাজ কী? যদি সেই বিদ্যা দ্বারা তুমি আপন দেনা শোধ দিয়া সমাজকে কিছু ঋণ দিয়া যাইতে পারো তবে তো জানি তোমার জীবন সার্থক।... বিদ্যা যশ ধন মান পরোপকার এ সকল অতি উৎকৃষ্ট পদার্থ হইলেও ইহার কোনোটিই জীবনের উদ্দেশ্য নয়। নিজের শরীর ও মনের উন্নতি হইয়া নিজের কর্তব্যকর্ম সুচারুরূপে সম্পন্ন করিয়া তাহার পর বিদ্যা দ্বারা হউক, ধন দ্বারা হউক, পরিশ্রম দ্বারা হউক সমাজকে কিঞ্চিৎ ঋণী করিয়া যাইতে পারিলে জীবনের উদ্দেশ্য সফল হইল। নচেৎ শুদ্ধ বিদ্যা লইয়া, ধন লইয়া, শক্তি লইয়া, স্বাস্থ্য লইয়া ধুইয়া খাইলে কিছুই হইবে না।” কিন্তু হায়, কোথায় সেই হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর ভাবনা? আমরা তো জল আর মলত্যাগ ছাড়া অন্যের জন্য, বৃহত্তর সমাজের জন্য আর কোনো ত্যাগ স্বীকার করতে শিখলাম না! আমাদের যদি ভালো কাজ এক-আধটা করিও কিন্তু সেজন্য আমরা নাম চাই। খ্যাতি ও প্রশংসা চাই। আমাদের দেশে চ্যারিটি হয় ঢাকঢোল পিটিয়ে। একটা কম্বল যদি কোনো শীতার্তের হাতে তুলে দিই তাহলে পঞ্চাশজন সেই গ্রহীতা ব্যক্তির সঙ্গে ছবি তুলি। এক কেজি চাল ত্রাণ সহায়তা হিসেবে দিলে দশটা ক্যামেরায় ছবি তুলি। আমাদের সব সামাজিক কর্ম লোক দেখানো। নিজেকে মহান হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার শোচনীয় প্রয়াস। আমরা নিজেকে বড় করতে গিয়ে কেবলই ছোট হয়ে যাই। আমাদের ক্ষুদ্রতা, দীনতা প্রতিদিনের কাজে আচরণে প্রকাশ পায়। আমরা নিজেকে নিয়ে সন্তুষ্ট থাকা, নিজের ভোগ-বিলাসে জীবন অতিবাহিত করাকে লক্ষ্য হিসেবে ধরে নিয়েছি। ভোগবাদী জীবন আমাদের আচ্ছন্ন করে ফেলছে। আমাদের মধ্যে ধনী হওয়ার আকাক্সক্ষা, ভোগের নানা সামগ্রী হাতে পাওয়ার লোভ তীব্র হচ্ছে। আর এই জীবনের হাতছানি আমাদের মধ্যে এক অসুস্থ প্রবণতা সৃষ্টি করছে। আমরা সবাই প্রাণপণে ছুটছি কেবল টাকা বানানোর জন্য।
বেলজিয়ামে জিল নামে ছোট্ট একটা গ্রাম আছে। সেখানকার বাসিন্দারা অপরিচিত মনোরোগীদের নিজের বাড়িতে রেখে শুশ্রƒষা করেন, বিনিময়ে কিছু পাওয়ার প্রত্যাশা না করেই। বিদেশের বহু কফিশপে মানুষ একটা কফি খেয়ে দুটোর দাম দিয়ে যান, যাতে কোনো নিরাশ্রয়, অভুক্ত মানুষ এক কাপ কফি খাওয়ার সুযোগ পান। এই ছোট ছোট উদাহরণগুলোই আমাদের নতুনভাবে বাঁচতে শেখায়, এবং একই সঙ্গে যেন এক একটা ঘোষণাও হয়ে ওঠে! স্বার্থপরতার যে সব দৃষ্টান্ত সারাক্ষণ আমাদের একটু একটু করে মেরে ফেলে, তাদের প্রতিস্পর্ধী হয়ে ওঠে এ সব ঘটনা! আমরা যে এভাবে মরিয়া হয়ে টাকার পেছনে ছুটছি, সম্পদের পাহাড় গড়ছি, শেষ পর্যন্ত সেই সম্পদের কতটুকু আমার কাজে লাগছে? নিজে কতটুকু ভোগ করতে পারছি? সম্পদ কি মানুষকে অমরত্ব দিতে পারে? এ প্রসঙ্গে মনে পড়ছে বিশ্ববিখ্যাত বীর আলেকজান্ডারের শেষ ইচ্ছার কাহিনীটি। রাজ্যজয় সাঙ্গ হয়েছে, ভাণ্ডারে জমেছে বিপুল বৈভব। সুদূর ম্যাসিডোনিয়ার পথে ফেরার সময় বিশ্বজয়ী আলেকজান্ডার পড়লেন অসুখে। প্রাণঘাতী সে রোগ, ক্রমে শয্যা নিলেন, মৃত্যুর ছায়া ঘনাল শিয়রে। ঘরে ফেরা আর হলো না বুঝি এ যাত্রায়। বয়সে যুবক, কিন্তু দেখেছেন, জেনেছেন অনেক। অন্তিম কাল সমাসন্ন, আলেকজান্ডার বুঝতে পারলেন এই পরাক্রম, শৌর্য স্বর্ণসম্পদের অসারতা, জীবনের ক্ষণস্থায়িত্ব। কাছে দাঁড়িয়ে থাকা পাংশুমুখ সেনাপতিদের ডেকে বললেন, মরতে চলেছি আমি। ম্যাসিডোনিয়ার ভূমিস্পর্শ হয়তো আর সম্ভব নয়। তোমরা জেনে নাও আমার শেষ তিন ইচ্ছে: এক. আমার শববাহী কফিন যেন কেবল আমার ব্যক্তিগত চিকিৎসকরাই বহন করেন। অন্য কেউ নয়। দুই. যে পথে আমার মৃতদেহ যাবে, সে পথ যেন আমারই ভাণ্ডারের, আমারই অর্জিত রজতকাঞ্চনমুদ্রায়, মণিমঞ্জুষায় আবৃত থাকে। তিন. আমার মৃতদেহ কফিনের মধ্যে শায়িত রেখো, কেবল হাত দুটি ঝুলিয়ে দিয়ো কফিনের বাইরে দুদিকে।
শোকাকুল সেনাপতিদের এক জন আবেগে, বিনয়ে জিজ্ঞেস করলেন, এই তিন ইচ্ছের মানে। আলেকজান্ডার বললেন: ‘মৃত্যু অনিবার্য। মৃত্যু সত্য। কোনো চিকিৎসকই মৃত্যুকে পরাজিত করতে, অস্বীকার করতে পারেন না। মানুষ যেন তা বুঝতে পারে। দ্বিতীয়ত, ধনসম্পদে মুড়ে দেওয়া রাস্তা আমার গৌরবের চিহ্ন নয়। মানুষ জানুক, একটি কাঞ্চনমুদ্রাও সে সঙ্গে করে নিয়ে যেতে পারবে না, পরপারে। আমার হাত দুটি ঝুলিয়ে রেখো কফিনের দুপাশে লোকে জানবে, আমি শূন্য হাতে এসেছিলাম পৃথিবীতে, যাচ্ছিও তাই।’ পৃথিবীর সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ হচ্ছে সময় এবং জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হচ্ছে মানুষের জন্য কিছু করা। এ বিষয়টি বিশ্বজয়ী বীর আলেকজান্ডার দ্য গ্রেট জীবনের অন্তিম লগ্নে উপলব্ধি করেছিলেন; কিন্তু তখন তার আর করার কিছুই ছিল না। ডেসমন্ড টুটু বলেছিলেন, যে যেখানেই থাকুন, নিজের মতো করে ছোট ছোট ভালো কাজ করার চেষ্টা করুন। এই সব ছোট কাজই এক দিন একজোট হয়ে মহীরুহের মতো ছায়া দেবে পৃথিবীকে! কিন্তু আমরা কি ভালো কিছু করছি?
লেখক লেখক ও কলামনিস্ট
chiros234@gmail.com