উজানটিয়ার চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে সরকারি উপহারের ঘর নিয়ে অনিয়মের বিস্তর অভিযোগ

কক্সবাজারের পেকুয়া উপজেলার উজানটিয়া ইউনিয়নে এক অসহায় বিধবা নারীর নামে বরাদ্দের সরকারি উপহারের ঘর স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান ও সাবেক যুবলীগ নেতার বড় ভাইয়ের ভিটায় নির্মাণের অভিযোগ পাওয়া গেছে। এ ঘটনা সম্প্রতি ফাঁস হলে এলাকায় তোলপাড় সৃষ্টি হয়। এতে সরকারি তদন্ত কমিটিও গঠিত হয়েছে। চলছে তদন্ত।

তবে অভিযোগ, অনিয়ম ধামাচাপা দিতে অভিযুক্ত পেকুয়া উপজেলার উজানটিয়া ইউনিয়নের ইউপি চেয়ারম্যান ও সাবেক যুবলীগ নেতা শহীদুল ইসলাম নানা তৎপরতা শুরু করেছেন। তিনি উজানটিয়া ইউনিয়নের বিধবা, হতদরিদ্র, ভূমিহীনদের বাদ দিয়ে মোটা অংকের আর্থিক সুবিধাসহ অনিয়মের আশ্রয় নিয়ে বিভিন্ন ব্যবসায়ী, ব্যক্তিগত সহকারী, প্রবাসীদের দিয়েছেন সরকারি বরাদ্দের ঘর।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, পেকুয়া উপজেলার উজানটিয়া ইউনিয়র পরিষদের চেয়ারম্যান শহীদুল ইসলামের বাবা নুরীর পাড়া গ্রামের মরহুম মফিজুল ইসলাম চৌধুরীর বাসায় গৃহকর্মী ছিলেন স্থানীয় মরহুম গোলাম সোবহান নামে এক ব্যক্তি। সেই সূত্রে মফিজুল ইসলাম চৌধুরী তার জীবদ্দশায় গোলাম সোবাহানের পরিবারকে উজানটিয়া মৌজার ২১৯ নম্বর খতিয়ানের ৩৪৫৭ দাগে ৮ শতাংশ জমি লিখিতভাবে দান করেন। গোলাম সোবহান মারা যাওয়া পর উক্ত জমিতে তার বিধবা স্ত্রী বুতিজা বেগম বসবাস করতেন। ২০১৯ সালে চেয়ারম্যানের সহযোগিতায় ৩৪৫৭ দাগে বিধবা বুতিজা বেগমের নামে প্রধানমন্ত্রীর উপহারের একটি ঘর বরাদ্দ দেওয়া হয়। কিন্তু চেয়ারম্যান আত্মসাতের উদ্দেশে নিজের মালিকানাধীন একই খতিয়ানের ৩৪১৮ নম্বর দাগে উক্ত ঘরটি নির্মাণ করেন। বুতিজা বেগমকে বঞ্চিত করে বর্তমান চেয়ারম্যানের বড় ভাই সেলিম উদ্দিন ওই ঘরে বসবাস করছেন। গত বছর বুতিজা বেগমের মৃত্যু হয়েছে বলে জানান স্থানীয়রা।

বুতিজা বেগমের দুই মেয়ে মানসিক ভারসাম্যহীন। ফলে তাদের মন্তব্য নেয়া সম্ভব হয়নি। অপর দুই ছেলে এলাকায় থাকেন না। তাদেরও মন্তব্য নেয়া সম্ভব হয়নি।

আরো অভিযোগ, একই বছর ৬ নম্বর ওয়ার্ডের গোদার পাড়া এলাকার জয়নাল আবেদীনের স্ত্রী মাহফুজা বেগমকে প্রধানমন্ত্রীর উপহারের ঘর দেওয়ার বিনিময়ে জোর করে শহীদুল ইসলাম ৫০ হাজার টাকা নিয়েছেন বলে জানিয়েছেন মাহফুজা বেগম।

সরেজমিনে জানা যায়, উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার নথি অনুযায়ী ৪ নম্বর ওয়ার্ডের মৃত রমজান আলীর ছেলে চিংড়ি ও লবণ ব্যবসায়ী বকুল আহমদ, লেদু মিয়ার ছেলে চিংড়ি ও লবণ ব্যবসায়ী আমান উল্লাহ, বাহাদুর আলমের ছেলে চিংড়ি ও লবণ ব্যবসায়ী হাবিবুর রহমান, ৭ নম্বর ওয়ার্ডের সিরাজুল ইসলামের ছেলে চেয়ারম্যানের ব্যক্তিগত সহকারী ও অন্তত ১৫ কানি জমির মালিক জাহাঙ্গীর আলম, ৮ নম্বর ওয়ার্ডের রূপালী বাজারের বাসিন্দা আলী আহমদের ছেলে প্রবাসী আমীর উদ্দীন থেকে আর্থিক সুবিধা নিয়ে ঘর বরাদ্দ দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে যুবলীগ নেতা শহীদুল ইসলামের বিরুদ্ধে।

নির্ভরযোগ্য সূত্র জানিয়েছে, বুতিজা বেগমের ঘর আত্মসাতের ঘটনায় শহীদুল ইসলামের বিরুদ্ধে জেলা প্রশাসনের কাছে অভিযোগ করেন তার ভাই মিজু মিয়া। পরে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের কক্সবাজার জেলার উপ-পরিচালক শ্রাবস্তি রায়, পেকুয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তাকে নিয়ে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। তদন্ত কমিটি ৭ সেপ্টেম্বর সরেজমিন ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন।

উপ-পরিচালক শ্রাবস্তি রায়ের কাছে জানতে চাইলে তিনি প্রতিবেদন জমা দেওয়ার আগে এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে অপরাগতা জানান। 

অভিযুক্ত ইউপি চেয়াররম্যান শহীদুল ইসলামের বড় ভাই মিছবাহ উদ্দীন চৌধুরী মিজু মিয়া জানান, আগামী ইউপি নির্বাচন সামনে রেখে তদন্ত রিপোর্ট নির্বাচনের আগে না দিতে অর্থের বিনিময়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ম্যানেজ করতে কোমর বেঁধে মাঠে নেমেছে শহীদুল।

তিনি বলেন, তার অনিয়মের বিরুদ্ধে কথা বলার কারণে গুন্ডা বাহিনীর হাতে কয়েক দফা হামলার শিকার হয়েছি। সর্বশেষ সমস্ত সম্পত্তি দখলে নিয়ে আমাকে পরিবারসহ এলাকা ছাড়া করেছে। মৃত্যুর ভয়ে এখন নিজ এলাকায় ফিরতে পারি না।

উজানটিয়া ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি তোফাজ্জল করিম ও স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতারা জানান, বিভিন্ন সময়ে চেয়ারম্যানের অপকর্মের বিরুদ্ধে কথা বলার কারণে দলের ত্যাগী নেতাকর্মীরা তার চক্ষুশুল। তিনি নিজস্ব বাহিনী ও সন্ত্রাসীদের দিয়ে গোটা ইউনিয়নকে অনিয়ম আর দুর্নীতির আস্তানায় পরিণত করেছেন।

এ ছাড়া এই চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে বেড়িবাঁধ সংলগ্ন পানি উন্নয়ন বোর্ডের জমি দখল করে চিংড়ি ঘের নির্মাণ, স্বজনপ্রীতি ও নিজ অনুসারীদের সুবিধার্থে ইউনিয়ন পরিষদের নাম ব্যবহার করে অন্যের জমির ওপর অবৈধভাবে সড়ক নির্মাণের অভিযোগে কক্সবাজার জেলা প্রশাসক ও বিভাগীয় কমিশনার বরাবর ২০১৯ সাল থেকে এ পর্যন্ত বেশ কয়েকটি লিখিত অভিযোগও দায়ের করেছেন স্থানীরা। 

এ বিষয়ে উজানটিয়ার ইউপি চেয়ারম্যান শহিদুল ইসলামের কাছে জানতে চাইলে তার বিরুদ্ধে উল্লেখিত সব অভিযোগ ‘ষড়যন্ত্র’ উল্লেখ করে তিনি বলেন, বুতিজা বেগমের স্বামীকে আমার বাবা জমি দেওয়ার পরে ৩৪১৮ দাগ থেকে আরো দুই শতক জমি দান করি। পরে সেই জমির ওপরই প্রধানমন্ত্রীর উপহারের ঘর করে দিয়েছেন। পরে বুতিজা বেগমের ছেলেরা বড় ভাই সেলিম উদ্দীনকে ওই ঘরটি ভাড়া দিয়েছেন।

অন্যান্য অভিযোগ বিষয়ে তিনি জানান, কারো কাছ থেকে ঘুষ নিয়েছেন এমন কোনো প্রমাণ নেই এবং ব্যবসায়ী ও প্রবাসীদের ঘর দেওয়ার বিষয়টি মিথ্যা।

এ ছাড়া তার সহোদর মিছবাহ উদ্দীনের সঙ্গে তার দলীয় আদর্শগত বিরোধের কারণে তিনি বিভিন্ন দপ্তরে তার বিরুদ্ধে অভিযোগ করছেন বলেও দাবি তার।