শিক্ষায় একাধিক ভাষার গুরুত্ব

অনেক বিশ্লেষকের মতে, আগামীর বিশ্ব রাজনীতিতে যেমন একক কোনো পরাশক্তির আধিপত্য থাকবে না তেমনি ভাষার ক্ষেত্রেও একক কোনো ভাষা নয়, একাধিক ভাষার আধিপত্য থাকবে বিশ্বব্যাপী। পৃথিবীতে এখন সবচেয়ে বেশি মানুষ কথা বলে চীনা ভাষায়, ২০.৭ শতাংশ। আর প্রথম ভাষা হিসেবে ইংরেজিতে কথা বলে ৬.২ শতাংশ। অর্থাৎ ৯৩.১ শতাংশ মানুষ অন্যান্য ভাষায় কথা বলে। এই পরিসংখ্যানই বলে দিচ্ছে ইংরেজি ছাড়া অন্যান্য ভাষার গুরুত্ব কত। এই যুগে তাই বিশ্বায়ন ও বিভিন্ন জাতির ভাষা একটির সঙ্গে অপরটি ওতপ্রোতভাবে জড়িত। এই বাস্তবতা আমলে নিয়ে সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে অনেক দেশ ও জাতি ইতিমধ্যেই ইংরেজির পাশাপাশি এক বা একাধিক আন্তর্জাতিক ভাষা শিক্ষা করে বিশ্বপরিমন্ডলে সাফল্য লাভ করছে। কিন্তু স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে এসেও বাংলাদেশে আমরা বাংলা ও ইংরেজি শিক্ষার পুরাতন বৃত্তেই আজও ঘুরপাক খাচ্ছি।

একবিংশ শতাব্দীতে মাতৃভাষা এবং একটি আন্তর্জাতিক ভাষার পাশাপাশি নিদেনপক্ষে অন্য আরও একটি ভাষা জানা এখন জরুরি হয়ে পড়েছে। পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে নিজেকে খাপ খাওয়ানোর জন্য এর কোনো বিকল্প নেই। অর্থনীতি ছাড়াও সামাজিক ও সাংস্কৃতিক যোগাযোগর ক্ষেত্রে ভাষার গুরুত্ব অপরিসীম। ভাষা মানুষকে কাছে টানে। মানুষে মানুষে সেতুবন্ধন সৃষ্টি করতে সহায়ক ভূমিকা পালন করে। যাদের মাতৃভাষা ইংরেজি তারাও অন্য ভাষা শিখছে জীবন ও জীবিকার প্রয়োজনে। ব্যবহারিক প্রয়োজনেই ভাষা শেখা পরিহার্য। ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার বেশিরভাগ দেশেই মাতৃভাষার পাশপাশি একাধিক আন্তর্জাতিক ভাষা শিক্ষা বাধ্যতামূলক। ব্যবসা-বাণিজ্য, চাকরি-বাকরি পড়াশোনা আন্তর্জাতিক দেন-দরবারের ক্ষেত্রে ভাষা গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। কূটনৈতিক সম্পর্ক সুদৃঢ়করণে ভাষা অগ্রণী ভূমিকা রাখে। বৈশ্বিক পরিসরে এখন মাতৃভাষার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক ভাষা হিসেবে কেবল ইংরেজি জানলেই চলছে না। তৃতীয় আরেকটি ভাষা জানা প্রয়োজন। বিদেশের শ্রমবাজারে এখন তাদেরই কদর যারা মাতৃভাষা ও আন্তর্জাতিক ভাষা ছাড়াও এক বা একাধিক ভাষা জানেন এবং কর্মক্ষেত্রে ব্যবহার করতে পারেন। তাই তৃতীয় ভাষা জানা বিশেষ যোগ্যতা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে সারা পৃথিবীতে। করপোরেট দুনিয়াতে একাধিক ভাষায় দক্ষদের কাজের চাহিদা বাড়ছে। বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে বিদেশি ভাষায় দক্ষতা বাড়াতে হবে। ফলপ্রসূ ও ক্যারিশমাটিক নেতৃত্বের জন্যও একাধিক ভাষা জানা অপরিহার্য। বিদেশি ভাষা জানলে ইমিগ্রেশন, দোভাষী, বায়িং হাউজ, বহুজাতিক কোম্পানিতে, জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থায়, ফাইভ স্টার হোটেলে, দূতাবাসে, এনজিওতে এবং ট্যুরিস্ট গাইড হিসেবেও কাজের সুযোগ রয়েছে।

আন্তর্জাতিক ভাষা হিসেবে ইংরেজির পরেই ফরাসির স্থান। দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক ভাষা হিসেবে ফরাসি ভাষার গুরুত্ব আন্তর্জাতিকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। ফ্রান্স এবং সুইজারল্যান্ড ও বেলজিয়ামের মতো দেশগুলোর পাশাপাশি ফরাসি ভাষার কদর রয়েছে কানাডাতেও। এছাড়া ভিয়েতনাম, লাওস, কঙ্গো, নাইজেরিয়াসহ অনেক দেশে ফরাসি ভাষার ব্যবহার স্বীকৃত। পৃথিবীর ৫৪টি দেশে ফরাসি ভাষা ব্যবহার হয়। ফরাসি ভাষা জানলে অন্যান্য ইউরোপীয় ভাষাও সহজে আয়ত্তে আনা যায়। বর্তমানে বিশ্বের প্রায় ৩০ কোটি মানুষ মাতৃভাষা কিংবা দ্বিতীয় ভাষা হিসেবে ফরাসিতে কথা বলেন। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থাতে ফরাসি ভাষার চাহিদা রয়েছে। ইউরোপীয়দের মধ্যেও ফরাসি ভাষা চর্চা বৃদ্ধি পাচ্ছে। অন্যদিকে, এই শতাব্দীতে অর্থনীতিতে চীনের বিস্ময়কর উত্থান ঘটেছে। পুরো বিশ্বেও মোট জনগোষ্ঠীর পাঁচ ভাগের একভাগ চীনা ভাষায় কথা বলে। আপনি যদি চীনা (ম্যান্ডারিন) ভাষা জানেন তাহলে এই ভাষায় কথা বলতে পারবেন পৃথিবীর ২০.৭ শতাংশ মানুষের সঙ্গে। তাই উন্নত-অনুন্নত অনেক দেশের নাগরিকদের বাধ্য হয়েই  বিশেষ করে চীনা ভাষা শিখতে হচ্ছে। আমাদের দেশে ২০০১ সাল থেকে পূর্বমুখী অর্থনীতির কথা বলা হচ্ছে। সেখানে আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে অপার সম্ভাবনা। পূর্বমুখী অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত হতে ভাষার দক্ষতাকে কাজে লাগাতে হবে। ইংরেজির পরই এখন আমাদের চীনা ভাষাকে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। চীন আমাদের সবচেয়ে বড় উন্নয়ন সহযোগী। পূর্ব-এশিয়ার অন্যান্য দেশেও চীনা ভাষার ব্যবহার রয়েছে। তাইওয়ানের অফিশিয়াল ভাষা চীনা (ম্যান্ডারিন)। সিঙ্গাপুরের অন্যতম একটি অফিশিয়াল ভাষাও এটি।

আমাদের বৈদেশিক শ্রমবাজারের একটি বিরাট অংশ জুড়ে রয়েছে মধ্যপ্রাচ্য। সেখানে কর্মরত দেশের অধিকাংশ নাগরিক ইংরেজি বা আরবি ভাষা কোনোটাই তেমন একটা পারেন না। মধ্যপ্রাচ্যে যারা কাজ করতে চান তারা আরবি শিখতে পারেন। মধ্যপ্রাচ্য ছাড়াও আফ্রিকার অনেক দেশে আরবি ভাষার প্রচলন রয়েছে। জাতিসংঘের ৬ষ্ঠ অফিশিয়াল ভাষা হিসেবে স্বীকৃত আরবি। মোট ২২টি দেশের রাষ্ট্রভাষা আরবি। ৬০টি দেশে আরবি ভাষার ব্যবহার হয়। উইকিপিডিয়ার তথ্য মতে, ২৯ কোটি ৫০ লাখ মানুষের মাতৃভাষা আরবি। আর প্রায় ৪৬ কোটি মানুষ আরবি ভাষায় কথা বলেন। জাতিসংঘ আফ্রিকান ইউনিয়ন ওআইসিসহ অসংখ্য আন্তর্জাতিক সংস্থার অফিশিয়াল ভাষা আরবি। ভাষা হিসেবে স্প্যানিশ ভাষাও খুবই গুরুত্বপূর্ণ। স্পেন, ফিলিপাইন ও ল্যাটিন আমেরিকার দেশগুলোর পাশাপাশি ২৯টি দেশে স্প্যানিশ ভাষা প্রচলিত। আন্তর্জাতিক বাজারে লাতিন আমেরিকা ক্রমশ মনোযোগ আকর্ষণ করছে। সেখানে কাজ করতে গেলে স্প্যানিশ ও পর্তুগিজ ভাষা জানতে হবে। আফ্রিকা মহাদেশে তাদের নিজস্ব ভাষা ছাড়াও পর্তুগিজ ও ফরাসি ভাষার ব্যবহার রয়েছে। আন্তর্জাতিক ব্যবসা-বাণিজ্য ও ভূ-রাজনীতির কারণে এখন জার্মান, জাপানি, কোরীয় ও ইন্দোনেশীয় ভাষাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

এমন বৈশি^ক বাস্তবতায় শুধুমাত্র ফার্স্ট ল্যাঙ্গুয়েজ দিয়ে জীবন জীবিকা চালানো কঠিন। জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতি গড়ে তুলতে এবং প্রতিযোগিতামূলক বাজারে টিকে থাকতে হলে এক বা একাধিক বিদেশি ভাষা শেখার কোনো বিকল্প নেই। ভাষার যুদ্ধে আমাদের জয়ী হতে হবে এবং একই সঙ্গে ত্যাগ করতে হবে ভাষা শেখার ব্যাপারে সব সংকীর্ণ মানসিকতা। মাতৃভাষাসহ কোনো ভাষাতেই আমরা দক্ষ না। নিজেদের স্বকীয়তা বাজায় রেখে সব ভাষার দ্বার উন্মুক্ত করে দিতে হবে ভাষাজ্ঞান বৃদ্ধির জন্য। বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনিস্টিটিউট প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। প্রায় সব সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে আধুনিক ভাষা ইনিস্টিটিউট রয়েছে। ইদানীং প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়েও একাধিক ভাষা শেখার সুযোগ তৈরি হচ্ছে। আজকাল তথ্যপ্রযুক্তির কল্যাণে অনলাইনে ঘরে বসেই বহু ভাষা শেখার সুযোগ তৈরি হয়েছে। ছাত্রছাত্রীদেরও আগ্রহ বাড়ছে নতুন নতুন ভাষা শেখার প্রতি। সারা পৃথিবীতেও নীরবে নিভৃতে চলছে ভাষার যুদ্ধ। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের গতি প্রকৃতি ও ২০৩০ সালের মধ্যে সাসটেইনেইবল ডেভেলপমেন্ট গোল (এসডিজি) অর্জনে একাধিক ভাষা জানা এবং না জানার ওপর অনেকাংশে নির্ভর করছে।

লেখক : সাংবাদিক ও কলামনিস্ট

hindol_khan@yahoo.com