সঞ্চয়পত্রে সুদহার কমানোর ফলে প্রান্তিক বা ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীরা ক্ষতিগ্রস্ত হবেন না বলে জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল। গতকাল বুধবার অর্থনৈতিক ও ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠক শেষে ভার্চুয়াল সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের এ কথা জানান অর্থমন্ত্রী।
এ সময় তিনি বলেন, ‘বাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সঞ্চয়পত্রে সুদহার পুনর্নির্ধারণ করা হয়েছে। বাজারে সমতা আনতে এটা দরকার ছিল। তাই সুদহার কমানো হয়েছে।’
অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমরা ১৫ লাখ টাকা পর্যন্ত বিনিয়োগে সুদহার অপরিবর্তিত রেখেছি। এর ফলে ক্ষুদ্র তথা প্রান্তিক সঞ্চয়কারীরা সুরক্ষা পাবেন। তারা কোনো ধরনের ক্ষতির মুখে পড়বেন না।’
প্রসঙ্গত, বর্তমানে ব্যাংকগুলোতে আমানতের সুদহার কমতে কমতে তলানিতে পৌঁছেছে। অনেক ব্যাংকের সুদহার মূল্যস্ফীতির নিচে। এ অবস্থায় আমানতকারীরা অনেকটাই ব্যাংকবিমুখ হয়ে পড়েছেন। জানা গেছে, ব্যাংকে এখন মেয়াদি আমানত রেখে ৬ শতাংশের বেশি মুনাফা পাওয়া যায় না। অন্যদিকে সঞ্চয়পত্রে এখনো ৯ থেকে ১১ শতাংশ সুদ পাওয়া যাচ্ছে।
উচ্চ মুনাফার কারণে সবাই সঞ্চয়পত্রের দিকে ঝুঁকছেন। সঞ্চয়পত্রে অস্বাভাবিক বিক্রি বাড়ায় সুদ পরিশোধে চাপ বাড়ছে সরকারের ওপর। এ অবস্থায় বাজারে ভারসাম্য আনতে সরকার সঞ্চয়পত্রে সুদহার পুনর্নির্ধারণ করেছে। অর্থমন্ত্রী সাংবাদিকদের বলেন, ‘এটি একটি চলমান প্রক্রিয়া। সুদহার কখনো কমবে, কখনো বাড়বে।’
মোট বিনিয়োগ ১৫ লাখ ছাড়ালেও মুনাফা কমবে বাকি বিনিয়োগের ওপর
এদিকে নতুন মুনাফা হার নির্ণয় নিয়েও গ্রাহকদের মধ্যে দ্বিধাদ্বন্দ্ব দেখা দিচ্ছে। অনেকে মনে করছেন, ১৫ লাখ টাকার বেশি সঞ্চয়পত্র থাকলে মোট বিনিয়োগের ওপর মুনাফা কমে যাবে। কিন্তু তা নয়। সঞ্চয়পত্রে বেশি বিনিয়োগ থাকলেও প্রথম ১৫ লাখ টাকার মুনাফা কমবে না। এর ফলে সঞ্চয়পত্রের মুনাফার হারের তিনটি স্তর করা হলেও গ্রাহকের নিট মুনাফা খুব একটা কমছে না বলে জানিয়েছেন সঞ্চয় অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা।
জাতীয় সঞ্চয় অধিদপ্তরের পরিচালক মো. শাহ আলম (যুগ্ম সচিব) দেশ রূপান্তরকে বলেন, পরিবার সঞ্চয়পত্রে একজন গ্রাহক সর্বোচ্চ ৪৫ লাখ টাকা বিনিয়োগ করতে পারেন। এখন থেকে কোনো গ্রাহক যদি পরিবার সঞ্চয়পত্রে একবারে অথবা ধাপে ধাপে ৪৫ লাখ টাকা বিনিয়োগ করেন, তাহলে প্রথম ১৫ লাখ টাকার জন্য ১১ দশমিক ৫২ শতাংশ হারেই মুনাফা পাবেন। বাকি ৩০ লাখ টাকার মধ্যে ১৫ লাখ টাকার ওপর মুনাফা পাবেন ১০ দশমিক ৫০ শতাংশ হারে এবং শেষ ১৫ লাখ টাকার ওপর মুনাফা পাবেন ৯ দশমিক ৫০ শতাংশ হারে।
তিনি আরও বলেন, তিন মাস অন্তর মুনাফাভিত্তিক সঞ্চয়পত্রে একজন গ্রাহক সর্বোচ্চ ৩০ লাখ টাকা বিনিয়োগ করতে পারেন। এক্ষেত্রেও প্রথম ১৫ লাখ টাকার ওপর ১১ দশমিক শূন্য ৪ শতাংশ এবং বাকি ১৫ লাখ টাকার ওপর ১০ শতাংশ হারে মুনাফা পাবেন।
পাঁচ বছর মেয়াদি সঞ্চয়পত্রের ক্ষেত্রেও একই ব্যবস্থায় মুনাফা হিসাব করা হবে বলে জানান সঞ্চয় অধিদপ্তরের ওই পরিচালক।
শাহ আলম বলেন, এই তিনটি সঞ্চয় স্কিমে একজন গ্রাহক মোট ৫০ লাখ টাকা বিনিয়োগ করতে পারেন। এক্ষেত্রে দেখা হবে কোনো গ্রাহক কখন মুনাফার প্রথম স্তর পার করছেন। কোনো গ্রাহকের সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগের পরিমাণ যখনই প্রথম স্তরের মুনাফার হার পার করবে তখন থেকে ১৫ লাখ টাকার বেশি যে পরিমাণ বিনিয়োগের ওপর দ্বিতীয় ও পর্যায়ক্রমে তৃতীয় স্তরের মুনাফা প্রযোজ্য হবে।
গত মঙ্গলবার অর্থ মন্ত্রণালয়ের অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগের প্রজ্ঞাপনে মুনাফা প্রদানের শর্তাবলির ‘খ’-তে বলা হয়, ‘বর্ণিত সব ধরনের সঞ্চয় স্কিমের ক্রমপুঞ্জীভূত বিনিয়োগ বিবেচনাপূর্বক প্রযোজ্য হারে মুনাফা প্রাপ্য হবে।’
সঞ্চয় অধিদপ্তরের নির্দেশনা অনুযায়ী একজন গ্রাহক পরিবার সঞ্চয়পত্র, ৩-মাস অন্তর মুনাফাভিত্তিক সঞ্চয়পত্র ও ৫ বছর মেয়াদি বাংলাদেশ সঞ্চয়পত্রে মোট ৫০ লাখ টাকা বিনিয়োগ করতে পারে। এ ছাড়া অবসরপ্রাপ্তদের আরও ৫০ লাখ টাকা পেনশনার সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ করার সুযোগ রয়েছে। এই স্কিমগুলোর বাইরে ডাকঘর সঞ্চয় ব্যাংকের মেয়াদি হিসাবে (এফডি) ১০ লাখ টাকা এবং সাধারণ হিসাবে (এসবি) ১০ লাখ টাকা বিনিয়োগ করা যায়।
এ ছাড়া ওয়েজ আর্নার ডেভেলপমেন্ট বন্ড, ইউএস ডলার প্রিমিয়াম বন্ড ও ইউএস ডলার ইনভেস্টমেন্ট বন্ডÑ তিনটি বন্ডের বিপরীতে সমন্বিত বিনিয়োগের ঊর্ধ্বসীমা ১ কোটি টাকার সমপরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা।
অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগের নির্দেশনা অনুযায়ী এখন থেকে এই ৯ ধরনের স্কিমে যখনই কোনো গ্রাহকের বিনিয়োগ ১৫ লাখ টাকা ছাড়াবে তখনই সংশ্লিষ্ট স্কিমের দ্বিতীয় স্তরের মুনাফার হার প্রযোজ্য হবে। অর্থাৎ যে ধরনের সঞ্চয় স্কিম কেনার ফলে ১৫ লাখ টাকার স্তর পার হবে সেই সঞ্চয় স্কিমের দ্বিতীয় স্তরের মুনাফার হার প্রযোজ্য হবে।
এমনকি এই নির্দেশনা জারির আগে যে পরিমাণ সঞ্চয়পত্র কেনা রয়েছে তার মুনাফা না কমলেও আগে কেনা সঞ্চয়পত্রের পরিমাণের সঙ্গে নতুন কেনা সঞ্চয়পত্রের পরিমাণ যোগ করে নতুন সঞ্চয়পত্রের মুনাফা প্রযোজ্য হবে বলে জানান সঞ্চয় অধিদপ্তরের পরিচালক মো. শাহ আলম।