অনুচ্চ রসের সেতার বাদক

নরেন্দ্রনাথ মিত্র সম্পর্কে জনশ্রুতি ছিল, তার সঙ্গে মিশলে অথবা কথা বললে কিছুদিন বাদে সেই বিষয়টাই তার কোনো না কোনো গল্পে পাওয়া যেত। এ নিয়ে তার পরিচিত মহলে একটু অনুযোগের সুরও ছিল। এইরে সেরেছে, এই বিষয়টা নরেন্দ্রনাথকে জানানো উচিত হয়নি, দেখা যাবে কদিন বাদে তার কোনো গল্পে গোটা ব্যাপারটা প্রায় হুবহু ধরা পড়েছে। কিন্তু লেখায় কোনো বিষয়ই কি হুবহু ধরা পড়ে? যা শোনেন বা জানেন কোনো লেখক, তাই হুবহু তুলে দেন? সেখানে প্রয়োজনীয় রং কিছু মেশান। নরেন মিত্রও তাই করতেন। তার গল্প লেখার গল্প কিংবা গল্প লেখার পেছনের গল্প কিংবা আত্মকথা গোছের কোনো কোনো লেখায় এ বিষয়ে জানিয়েছেনও। আবার, নরেন্দ্রনাথ মিত্র অকপটে এ-ও স্বীকার করেছেন যে, নায়কের মুখে তিনি নিজের কথা বসিয়ে দেন। কিংবা, সেখানে প্রয়োজনে একজনের সঙ্গে অন্যজনের কথা মিলেমিশে একাকারও হয়ে যায়। ইত্যাদি। তবে তাকে নিয়ে, তার কালের তরুণ লেখকদের পারস্পরিক আন্তরিক ও কৌতূহলী মন্তব্যও ছিল প্রায় একই, এই নরেনদার সঙ্গে মিশিস না, কদিন পরে তার কোনো গল্পে দেখবি এসব লিখে দিয়েছেন। হয়তো ইতিপূর্বে তাই ঘটেছে, ওই সাবধানবাণী সেই জন্যে।

কথাগুলো এ জন্যে তোলা, নরেন্দ্রনাথ মিত্রই সম্ভবত বাংলা ভাষার সবচেয়ে অনায়াস ছোটগল্প লেখক। প্রচুর গল্প লিখতে পারতেন, আর তা যে অতি অনায়াসেই ঘটত, সে ওই গল্প পড়লেই বোঝা যায়। যে কোনো শিল্পের ক্ষেত্রে, সেই শিল্পের প্রচলিত শর্ত রক্ষা করে, তাকে অনায়াস প্রয়াসে পরিণত করতে পারার ক্ষমতা কথাসাহিত্যের ক্ষেত্রে প্রায়শ ঘটেই না অথবা কম ঘটে। কবিতার ক্ষেত্রেও বিষয়টি সব সময়ে ঘটে না, সে-ও কালেভদ্রে। কোনো কোনো কবি দ্রুতকলমে হঠাৎ আলোর ঝলকানিতে অনায়াসে একটি আট-দশ পঙ্্ক্তির কবিতা লিখে ফেলেন, পরে সেখানে কোনো একটি শব্দ বদলেরও কোনো প্রয়োজন পড়ে না। এ কথার অর্থ এই নয় যে, কবিতা সব সময়েই সবার কাছে অনায়াসে ধরা দেয়। রবীন্দ্রনাথ-নজরুল-জীবনানন্দের কবিতায় প্রচুর কাটাকুটি যেমন আছে, আবার বিদ্রোহীর মতন কবিতা যে প্রায় ভূতগ্রস্তের হাতে রচিত, সে কথাও ইতিহাসে সাহিত্যের ইতিহাস বয়ে চলেছে। রূপসী বাংলার পা-ুলিপি বেশ পরিচ্ছন্ন, শুধু বিকল্প শব্দ কোথাও কোথাও; অন্যত্র কাটাকুটি আর কাটাকুটি। একদিনে সাতটি কবিতা কয়েকটি গীতিকবিতা আর প্রবন্ধ ও গল্প লিখতে পারা লেখকের হাতে প্রায় দেড় বছর কোনো কবিতা ধরা দেয়নি। রবীন্দ্রনাথের মতো সার্বভৌম প্রতিভাকে নিয়ে এ তথ্য আমাদের পক্ষে মানা একটু বিস্ময়করই, কিন্তু ঘটনা তো সত্য। ওদিকে তার পা-ুলিপি পরীক্ষাকারী গবেষকরা জানিয়েছেন, সব লেখাই তিনি পরে যথেষ্ট সম্মার্জন বা সংস্কার করলেও গল্পগুচ্ছের ক্ষেত্রে প্রায় ব্যতিক্রম, প্রথম সাময়িকপত্রের মুদ্রণের পাঠই আমাদের সামনে বর্তমান। একটু প্রসঙ্গান্তরে প্রসঙ্গের কারণেই যেতে হলো। নরেন্দ্রনাথ মিত্র নাকি প্রায় আটশোর কাছাকাছি গল্প লিখেছেন। তার একান্নটি গল্পগ্রন্থে তিনশোর কাছাকাছি গল্প জায়গা পেলেও বাকি প্রায় সাড়ে চারশো কি তারও বেশি গল্প কোনো বইয়ে জায়গা দেননি। অর্থাৎ বই করার ক্ষেত্রে তিনি নিজস্ব নির্বাচনকে প্রাধান্য দিয়েছেন। কোনো কোনো গল্প সংস্কারও করেছেন, অর্ধেকেরও বেশি গল্প বইয়ের বাইরে রেখেছেন। একটি ডায়েরিতে প্রতিটি গল্পের পত্রিকার নাম উল্লেখ থাকায় পরে তার ছেলে অভিজিৎ মিত্র বাকি গল্পগুলো সংগ্রহ করেছেন। প্রায় সবই, তাও নাকি গোটা তিরিশেক বাকি থেকে গেছে। এই তথ্য ‘পিওন থেকে প্রকাশক’কে জানিয়েছেন বাদল বসু। সেই মধ্য তিরিশের দশক থেকে মধ্যসত্তর পর্যন্ত নরেন্দ্রনাথ মিত্রের কলম সব সময়েই গল্পের জন্যে ছিল অক্লান্ত। বইয়ে জায়গা না-পাওয়া সেসব গল্প খুঁজে বের করা মোটামুটি অন্ধকারে আলপিন খোঁজার শামিল।

তাহলে, সাড়ে সাতশো বা আটশো গল্প! আটত্রিশটি উপন্যাস! উপন্যাসগুলো আজকাল প্রায় হারিয়েই গেছে। হয়তো আটশো গল্পের বেশিরভাগই সাহিত্যিক মানদ-ে উতরায়নি। কিন্তু বিষয়টি একেবারেই ভিন্ন। একজন গল্পলেখকের এমন অনায়াস গল্প রচনার শক্তি বিস্ময়কর। ওই সাড়ে সাতশো আটশো গল্প তাকে ফাঁদতে হয়েছে। আর বাঙালির জীবনের উনিশ সাঁইত্রিশ থেকে মধ্যসত্তর পর্যন্ত বাংলাদেশ আর পশ্চিম বাংলা উভয়ই রাজনৈতিকভাবে যে ভীষণ উত্তাল, সেসব রাজনৈতিক ক্ষত গার্হস্থ্যজীবনে ওভাবে প্রবেশ করানো এক অস্বাভাবিক কীর্তি বটে। গল্প লিখবার অনায়াস শক্তির জন্যে সন্তোষকুমার ঘোষ তাকে মোপাসাঁ আর চেখভের সঙ্গে তুলনা করতেন। একথা প্রচলিত আছে, আন্তন চেখভ বাঁধাকপি থেকে জুতোর সুখতলা যে কোনো বিষয় নিয়ে অনায়াসে গল্প লিখতে পারতেন। নরেন্দ্রনাথ সম্পর্কে এক আলাপচারিতায় দেবেশ রায় বলেছিলেন, কোনো কোনো লেখক উপন্যাসে ঠিক তার গন্তব্যটা বুঝে উঠতে পারেন না। কিন্তু ছোটগল্পে তিনি সেই জনজীবনের গহিন আর গোপন পর্বান্তরকে ধীরে ধীরে অনায়াসে যেন তার অজ্ঞাতেই ধরে রাখেন।

এই দুটো বিষয়, একটা অনায়াস রচয়িতার ক্ষমতা আর দ্বিতীয়টাতে তার সামনের প্রতিদিনকার ঘটমান ও চলমান জীবন, এর বাইরে আর যেন কিছু নেই, থাকতেও নেই। তাই ঘটেছে, বাজারের ভেতরে নিচতলায় জানালার ধারে টেবিলে বসে সমস্ত কোলাহলের ভেতরে নরেন্দ্রনাথ মিত্র ওই জীবনের ভেতরের এক নিস্তব্ধ নীরবতার গল্প লিখে যেতেন। যা তার উপন্যাসে সেভাবে ধরা পড়ত না অথবা উপন্যাসের গঠন প্রক্রিয়া ভিন্ন। অথচ গল্পে তিনি অনায়াস। এতটাই অনায়াস যে ভাষার সরলতা, জীবনকেও যেন সরল করে তোলে। তাই তার অভীষ্টও ছিল। লিখেছেন, ‘নিজের গল্পগুলির কথা যতদূর মনে পড়ে আমি দেখতে পাই ঘৃণা বিদ্বেষ ব্যঙ্গ বিদ্রƒপ বৈরিতা আমাকে লেখায় প্রবৃত্ত করেনি। বরং বিপরীত দিকের প্রীতি প্রেম সৌহৃদ্য, স্নেহ শ্রদ্ধা ভালোবাসা, পারিবারিক গ-ির ভিতরে ও বাইরে মানুষের বিচিত্র সম্পর্ক, একের সঙ্গে অন্যের মিলিত হবার দুর্বার আকাক্সক্ষা বারবার আমার গল্পের বিষয় হয়ে উঠেছে। তাতে পুনরাবৃত্তি ঘটেছে। তা জেনেও আমি সীমার বাইরে যেতে পারিনি।’

নরেন্দ্রনাথ মিত্রের গল্পের অন্তর্গত সারল্যের মতন অতি সরল এই স্বীকারোক্তি। নিজের গল্প লেখার জগৎ সম্পর্কে একটি ভাষ্যও আড়াল রাখেননি, আর কোনো উচ্চমন্যতার বারতাও নেই সেখানে। পুনরাবৃত্তি তো তার মতো এক অতিপ্রজ গল্পলেখকের জন্যে খুব স্বাভাবিক। শোনা যায়, প্রতি বছর বিভিন্ন পুজোসংখ্যায় নরেন্দ্রনাথ মিত্র আঠারোটা থেকে কুড়িটার মতন গল্প লিখতেন। এ ক্ষেত্রে প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন তার রাজেন্দ্র কলেজের সহপাঠী ও বন্ধু নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়। কিন্তু নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়কে প্রায়শ গল্পসংখ্যায় তার কাছে হার মানতে হতো। একজন সংবাদিক যিনি আটত্রিশটি উপন্যাস লিখেছেন, সাংবাদিক-গদ্যও আছে, তার পক্ষে শুধু একটি পার্বণে এক কুড়ি গল্প লেখা বিস্ময়কর ঘটে। অনায়াসে লিখে ফেলেছেন রস, অসবর্ণা, সেতার, পালঙ্ক, জাল, অবতরণিকা ও বিলম্বিত লয়; কিংবা অভিনেত্রী, চাকরি, দোলা, মাস্টারমশাই, বিকল্পর মতন গল্প! আর এই অতিখ্যাত গল্পগুলো পাশে সরিয়ে যদি সামগ্রিকভাবে তাকানো যায়, তাহলে দেবেশ রায়ের ওই ঘরোয়া মন্তব্যের যথার্থতা ধরা পড়ে।

অবতরণিকা সত্যজিৎ রায়ের মহানগর। দেশভাগ-উত্তর সময়ে পূর্ববাংলার উদ্বাস্তু মেয়েদের বাবা-মা কিংবা স্বামীসন্তানকে বাঁচাতে যে বাইরে আসার ঢল কলকাতা নগরী দেখেছিল, ওই গল্প তার একান্তই পারিবারিক আবহ। অসবর্ণাও তাই। বাইরের অস্থিরতা চৌকাঠের ভেতরে কীভাবে ক্রিয়াশীল, এক বিভক্ত দেশে মানুষ তার সামনে আসা সংকটে নিজেও যে ভেঙে না পড়ে নিজের মতন করে নিজস্ব প্রতিরোধে শামিল হয়, সেখানে নারী-পুরুষ কোনো ভেদ থাকে না, জীবনই সেখানে কোলাহল করে ওঠে, ওই ভাঙনের নিস্তব্ধতার ভেতরে বাঁচে নিজের মতন করে, একথা নরেন মিত্রের চেয়ে ভালো আর কে বুঝতেন? অথবা, যে সারল্যে জানান তিনি যদি সেভাবেই ভেবে নিই যে তিনি কিছুই বোঝেননি, শুধু যা দেখেছেন তাই লিখেছেন, জটিল সেই জীবন ধরা পড়েছে অত্যন্ত সরল কলমে। সেখানে পুরুষের পাশাপাশি নারীর ভূমিকাও মুখ্য। গল্প বা জীবন পারিবারিক আবহে এলেই সেখানে নারীর ভূমিকা খুব স্বাভাবিকভাবে প্রাধান্য পাবে।

বাঙালির জীবনে বড় সংকটগুলোয় নরেন্দ্রনাথের গল্পের নারী সেই ভূমিকা পালন করেছে। ফলে রাজনৈতিক সংকটের পাশে ব্যক্তির সংকটে ‘রস’ অথবা ‘পালঙ্ক’ বহুকাল সেই জীবনের ভাষ্যকার হয়েই থাকবে। আর স্নেহ শ্রদ্ধা ভালোবাসা, পারিবারিক গ-ির ভেতরে এরই মাঝে জীবনের যে গভীরতর চিকিৎসাতীত অসুখ থাকে, নরেন্দ্রনাথ তাই অনায়াস চেষ্টায় দেখিয়ে দিয়েছেন।

এই লেখা কোনোভাবেই নরেন্দ্রনাথের গল্পের আলোচনা নয়। একাত্ম ও নীরব, যৌবনে হঠাৎ স্বদেশকে চিরদিনের জন্যে পেছনে রাখা একজন মানুষ প্রতিদিনের চারপাশের কথাগুলোকে তার নিজস্ব সাধ্যে ধরে রাখছেন। এমনকি সেগুলোর সাহিত্যিক মান্যতা নিয়েও তার কোনো উচ্চাশা যেন কোথাও ভরও করেনি। অথবা তিনি তা করতে দেননি। বরং, জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত সেই দেখাকে, কোনো সচকিত উচ্চারণের বাইরে শুধু লিপিবদ্ধ করে রাখাই যেন তার কাজ। তাই তার মৃত্যুও যেন হঠাৎ, লয় সেখানে বিলম্বিত, খুব সকালে লিখতে লিখতে লেখা রেখে কিছুক্ষণের জন্যে বাজারের দিকে ঘুরতে যেতেন, সেভাবে চলে যাওয়া। তখন তার ছোটগল্পগুলোও ছোট প্রাণ নিয়ে কোনো কলরব করে না। কারণ নরেন্দ্রনাথের লেখায় এত ভালোবাসা ও প্রীতির স্পর্শ থাকার পরেও তা নীরব। রস গল্পের শেষ দিকে নিজের দোষে পরাজিত মোতালেফ যেভাবে সাবেক স্ত্রী মাজু খাতুনের রসের হাঁড়ি দুটো নামিয়ে রাখছে!

লেখক কথাসাহিত্যিক