সঞ্চয়পত্রের ব্যবস্থাপনা নিয়ে সরকারকে বেশ কিছুদিন ধরেই নানা রকম পরিবর্তন, সংশোধন ও সংস্কার আনতে দেখা যাচ্ছিল। অর্থনীতিবিদরা একই অর্থবাজারে বিরাজমান অসম হারের সরকারি সঞ্চয় হাতিয়ারগুলোর লভ্যাংশ যৌক্তিকীকরণের প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্ব আরোপ করে আসছিলেন। এই হাতিয়ারগুলোর লভ্যাংশ বেশ উচ্চ হওয়ায় সরকারের দায় ও ব্যয় বেড়ে যাচ্ছিল। অবশেষে ২১ সেপ্টেম্বর ২০২১ তারিখ এক নোটিফিকেশন জারির মাধ্যমে সব কটি হাতিয়ারের লভ্যাংশের গায়ে কুড়াল চালানো হয়েছে; মোটা দাগে ২ শতাংশ লভ্যাংশ ছেঁটে ফেলা হয়েছে। ব্যবস্থাটাকে প্রগতিশীল ও যৌক্তিক হিসেবে দেখানোর জন্য প্রতিটি সঞ্চয় স্কিমে অর্থের পরিমাণ ৩টি স্তরে ভাগ করে প্রতি ভাগের জন্য আলাদা আলাদা লভ্যাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে; ১৫ লাখ টাকা পর্যন্ত আগের হার বহাল রাখা হয়েছে, এরপর ৩০ লাখ টাকা পর্যন্ত গড়পড়তা ১ শতাংশ এবং তৎপরবর্তী বিনিয়োগের ওপর আরও ১ শতাংশ অর্থাৎ মোট ২ শতাংশ লভ্যাংশ কর্তন করার কথা বলা হয়েছে। অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে এটার যৌক্তিকতা হয়তো অস্বীকার করা যাবে না। কিন্তু এর একটা সামাজিক এবং নৈতিক দিকও রয়েছে, যেটা বিবেচনা করা রাষ্ট্রের একটি অন্যতম দায়িত্ব।
অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মচারী, তাদের অবর্তমানে নির্ভরশীল পরিবার-পরিজন, নিম্ন ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির কর্মহীন ও কর্মোত্তর লোকজনের জীবনযাত্রার জন্য সঞ্চয়পত্রের লভ্যাংশ প্রধান অথবা একমাত্র পাথেয়। সঞ্চয়পত্রের লভ্যাংশ কমে গেলে এই প্রান্তিক ও প্রায়-প্রান্তিক শ্রেণির মানুষজনের আয় কমে যাবে এবং জীবন মানের অবনমন ঘটবে। অর্থাৎ তাদের খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, স্বাস্থ্যসেবা প্রভৃতি মৌলিক চাহিদা পূরণে ভাটা চলে আসবে। রাষ্ট্র এখন আর শুধু পুলিশি কোনো সত্তা বা ব্যবসায়ী কোনো প্রতিষ্ঠান নয়; এটা রীতিমতো একটি কল্যাণ প্রতিষ্ঠান। এই নৈতিকতা থেকে রাষ্ট্র দুষ্টের দমন ও শিষ্টের পালন নীতি যেমন অনুসরণ করে, তেমনি বৃহৎ পুঁজির দুর্দমনীয় লভ্যাংশে ভাগ বসায় এবং তা দুর্বলদের মধ্যে বণ্টন করে দেয়। আমাদের মতো পক্ষোদগম অর্থনীতির দেশে এখনো সেই ধরনের সক্ষমতা আসেনি যে অসমর্থ, অক্ষম, অসহায় ও কর্মহীনদের জন্য বাধ্যতামূলক ভাতার ব্যবস্থা করে তাদের মৌলিক চাহিদা পূরণ সম্ভব হবে। তবে যারা কষ্টেসৃষ্টে অল্প কিছু অর্থ সঞ্চয় করে তার ওপর ভর দিয়ে আত্মনির্ভরতার পথ বেছে নিয়েছে, তাদের কিছুটা প্রণোদনা দেওয়া সব দিক থেকে যৌক্তিক; এতে অন্যরাও আত্মনির্ভরশীল হতে অনুপ্রাণিত হবে, দেশে সঞ্চয়ের প্রবণতা বাড়বে।
এখন বেতন বৃদ্ধির ফলে পেনশন ও গ্র্যাচুইটির পরিমাণ বেশ বেড়েছে। ফলে মাঝারি ও উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তাদের গ্র্যাচুইটি ও অন্যান্য সুবিধার পরিমাণ অধিকাংশ ক্ষেত্রে কোটি টাকা ছাড়িয়ে যায়। কিন্তু তাদের সংখ্যা মোট কর্মচারীর একটা ক্ষুদ্র ভগ্নাংশ মাত্র। বাকিদের অধিকাংশের অঙ্ক ৫০ লাখ পার হয় না। তার পরও এক কোটি টাকার সঞ্চয়পত্র কিনলে এরূপ একজনের অবস্থা কেমন দাঁড়াবে, তার একটা খসড়া হিসাব দিচ্ছি। পুনর্নির্ধারিত হারে বছরে এক কোটি টাকার লভ্যাংশ হবে নয় লাখ পঞ্চাশ হাজার টাকা। বিদ্যমান হারে এর ওপর কর ধার্য হবে ৮০ হাজার টাকা। বাকি থাকবে ৮ লাখ ৭০ হাজার টাকা। অর্থাৎ বছর শেষে সুদাসলে মোট গ্রস অর্থের পরিমাণ দাঁড়াবে এক কোটি ৮ লাখ ৭০ হাজার টাকা। সরকারি হিসাবে এখন দেশে মুদ্রাস্ফীতি ৫.৭৬ শতাংশ; যারা এখন চাল, তেল, ডিম, আটা, চিনি কিনতে নিত্যবাজারে যান তাদের কাছে এটা বললে তারা দুঃখের মধ্যেও অট্টহাসিতে ফেটে পড়বেন। সামনে এ মুদ্রাস্ফীতি যে আরও বাড়বে, তার স্পষ্ট ইঙ্গিত রয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে। সে যাই হোক, ৬ শতাংশ ধরে হিসাব করলেও ওই টাকা থেকে মুদ্রাস্ফীতি বছরে খেয়ে ফেলবে ৬,৫২,০০০ টাকা; ফলে বছর শেষে তার নিট অর্থের পরিমাণ দাঁড়াবে ১ কোটি ২ লাখ ১৮ হাজার টাকা। অর্থাৎ তার নিট লাভ ২ লাখ ১৮ হাজার টাকা। এর সঙ্গে তার স্বাস্থ্যভাতাসহ মাসে পেনশন আসতে পারে সর্বাধিক ৩০ হাজার টাকা; অর্থাৎ বছরে ৩ লাখ ৬০ হাজার টাকা। এই টাকা থেকে মুদ্রাস্ফীতি বাবদ বাট্টা নাই-বা কর্তন করলাম। তাহলে সঞ্চয়পত্রের লভ্যাংশসহ বছরে তার মোট আয় দাঁড়াবে ৫ লাখ ৭৮ হাজার টাকা; মাসে ৪৮,০০০ টাকা। এটাও নিট টাকা নয়; এর ওপর ব্যাংক থেকে ভ্যাট, আবগারি শুল্ক, হিসাব রক্ষণাবেক্ষণ ফিস বাবদ টাকা কাটা যাবে। এখন বিবেচনা করুন, অবসরজীবনে যাদের ঘন ঘন হাসপাতাল ও ডাক্তারখানা মাড়াতে হয়, তাদের কেমন করে চলবে? আর যাদের বিনিয়োগ ৫০ লাখ বা তার কম তাদের অবস্থা কী হবে?
পেনশন বিক্রি করে এককালীন অর্থ তুলে নেওয়ার একটা নিয়ম ছিল। আগের অর্থমন্ত্রীর আমলে সেটা বাতিল করা হয়। কতটুকু সত্যাসত্য জানি না, তবে শুনেছি যে এর একটা পটভূমি ছিল। সমূলে পেনশন তুলে নেওয়া অনেক কর্মকর্তা নাকি কর্মকালে অনুসৃত সেই সরল বিশ্বাসে তাদের অনেক আপনজনকে এই অর্থ তুলে দিয়েছিলেন দুই পয়সা অতিরিক্ত রোজগার করতে। কিন্তু টাকা হাতানোর পর এই আপনজনরা আর সরল থাকেননি; গরল হয়ে গিয়েছেন। ফলে তারা হয়ে গিয়েছিলেন একেবারে নিঃস্ব। তাদের এই অসহায়ত্ব ঘোচাতে মন্ত্রী ওই ব্যবস্থাটি বাতিল করেন; যৎসামান্য হলেও তারা যেন আজীবন পেনশন পান।
আসলে ঘরে, বাইরে এবং ভূতপূর্ব কর্মস্থলে অবসরপ্রাপ্তদের অবস্থা যে কী রকম হয়, তা বলে বোঝানো কঠিন; তারা না ঘরকা, না ঘাটকা। তাদের না থাকে কোনো মর্যাদা, না থাকে কোনো মূল্য; থাকে শুধু অতীতের সুখস্মৃতি যেটা অন্য কারুর জন্য উপাদেয় নয়, বরং বিস্বাদ। ফলে এ সময় অনেকে কিছুটা অপ্রকৃতিস্থও হয়ে পড়ে। অবসরপ্রাপ্তির পর আমার কন্যা মজা করার জন্য আমাকে জিজ্ঞাসা করেছিল, ‘আব্বু তুমি কি কাজ করতে বারে বারে Tired হয়ে যাচ্ছিলে যে ওনারা তোমাকে Retired ঘোষণা করল?’ আমি বলেছিলাম আমি এখনো Retire করিনি; ; PRL-এ আছি। কন্যার কাছে মজায় আমিও বা কম যাব কেন? বলেছিলাম, এর পূর্ণ ফর্ম হলো Power Recently Lost. . এটা শেষ হলে নামের সঙ্গে পদের পর সংক্ষেপে লিখব Rtd. যার গূঢ় পূর্ণ ফর্ম হলো Ready to Die. কন্যা আমার হেসে গদগদ। তবে মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত থাকাই যথেষ্ট নয়; সৃষ্টিকর্তার ইচ্ছা-অনিচ্ছার বিষয় রয়েছে। সে পর্যন্ত যাতে অন্তত ডাল-ভাতে চলে যায় এবং কারও ওপর নির্ভর করতে না হয়, সেটা কিন্তু সবারই একান্ত ইচ্ছা। এত দিন সঞ্চয়পত্রের লভ্যাংশ সে ইচ্ছা পূরণে বেশ ভালোই সাহায্য করে আসছিল।
শুধু যে পেনশনাররা এই হাতিয়ারের ওপর নির্ভরশীল তা-ই না, সমাজের নিম্ন ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির একটা বড় অংশও এর ওপর ভর করে জীবিকা নির্বাহ করছে, বিশেষ করে যাদের পরিবারে উপার্জনক্ষম মানুষ নেই। এর অনেকগুলো আবার নারী-প্রধান পরিবার। আমার জানাশোনা বেশ কিছু পরিবারের আয়ের একমাত্র উৎস এই সঞ্চয়পত্র। এই শ্রেণির আয়ে কুড়াল চালানো আর গায়ে কুড়াল চালানো প্রায় সমার্থক। সঞ্চয়পত্রই যে সরকারের একমাত্র ব্যয়বহুল স্কিম তা তো নয়; আরও অনেক ব্যয়বহুল স্কিম চালু আছে, নানা প্রয়োজনে এগুলো রাখতেও হয়। স্টিমুলাস প্যাকেজের আওতায় ব্যবসায়ীদের যে লাখো কোটি টাকার ঋণ ভর্তুকি সুদের হারে বিতরণ করা হলো, সেটা তো কম মহার্ঘ্য নয়। বড় ব্যবসায়ীদের খেলাপি ঋণ আদায়ে যেভাবে ছাড় দেওয়া হয়েছে এবং হচ্ছে, সেটাকে কি বলা যাবে? সরকারি কর্মকর্তা/কর্মচারীদের প্রভিডেন্ট ফান্ডে প্রদেয় সুদের হার এখনো সবচেয়ে বেশি; ১৩ শতাংশ। এ ছাড়া তাদের গাড়ি কেনার জন্য অবচয়ের সুবিধাসহ ঋণদান এবং তার মেইনটেন্যান্সের জন্য মাসিক ভাতাদান এমনি আরেকটি ব্যয়বহুল স্কিমের দৃষ্টান্ত। সেবা প্রদানের চমৎকারিত্ব, কর্মদক্ষতা ও ন্যায়পরায়ণতা বাড়াতে কর্মরত কর্মকর্তাদের সুবিধাদানের বিপক্ষে আমি নই; তবে সেসব কতটুকু হচ্ছে, সেটাও দেখা দরকার। আর এখন যারা চাকরি শেষে অবসরে চলে এসেছেন এবং নিম্ন ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির যেসব মানুষ এই সঞ্চয়পত্রের লভ্যাংশের ওপর নির্ভরশীল হয়ে কোনো রকমে জীবনাতিপাত করছেন, সরকারি ব্যয় কমানোর অজুহাতে তারা মানবেতর জীবনের পঙ্কিলতায় নিমজ্জিত হয়ে পড়বেন কি না, সেটাও বিবেচনা করে দেখার দায়িত্ব রাষ্ট্রের। রাষ্ট্রকে অবশ্যই তার দায় ও দায়িত্বের মধ্যে একটা ভারসাম্য রক্ষা করার ব্যবস্থা নিতে হবে।
এখন এক নামে পেনশনারদের জন্য সর্বোচ্চ এক কোটি এবং অন্যদের জন্য সর্বোচ্চ ৫০ লাখ টাকার বিনিয়োগ সীমা নির্ধারণ করে দেওয়া আছে। হঠাৎ ২ শতাংশ লভ্যাংশ কমিয়ে ফেলার ফলে সমাজে ও অর্থনীতিতে এর সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে কোনো গবেষণা হয়েছে কি না, সে সম্পর্কে আমরা কিছু জানি না। তবে আমার মনে হয় সরকার যদি এর লভ্যাংশে কুড়াল চালাতেই চায়, তবে পরীক্ষামূলকভাবে ব্যক্তিভিত্তিক বিনিয়োগের সর্বোচ্চ সীমাকে তিন স্তরের পরিবর্তে সমান দুই স্তরে ভাগ করতে পারে এবং প্রথম অর্ধাংশের জন্য লভ্যাংশ অক্ষুন্ন রেখে দ্বিতীয় অর্ধাংশের ওপর ১ শতাংশ লভ্যাংশ কর্তন করে দেখতে পারে। নিম্ন-বিত্তদের অবস্থা বিবেচনা করে প্রথম স্তরের ঊর্ধ্বসীমা ৩০ বা ৩৫ লাখও করা যেতে পারে। অতঃপর এর প্রভাব যাচাই করে তার ভিত্তিতে আরও ন্যায়ানুগ ও বস্তুনিষ্ঠ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারে। আমরা আশা করি সরকার উভয় কূল রক্ষা করে দ্রুত অর্থনৈতিক দিক থেকে যৌক্তিক এবং সামাজিক দিক থেকে মনোহর সিদ্ধান্ত নিয়ে সব পক্ষের স্বার্থ সমন্বয় করবে।
লেখক খাদ্য অধিদপ্তরের সাবেক মহাপরিচালক ও কলামনিস্ট
rulhanpasha@gmail.com