১৪ ছাত্রের চুল কাটলেন প্রক্টর

আত্মহত্যার চেষ্টা এক শিক্ষার্থীর

সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুরে রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষক ১৪ ছাত্রের মাথার চুল কেটে দেওয়ার ঘটনায় অপমান সইতে না পেরে নাজমুল হাসান তুহিন (২০) নামে এক শিক্ষার্থী আত্মহত্যার চেষ্টা করেছেন। গত সোমবার রাত ৮টার দিকে ঘুমের ওষুধ খেয়ে তিনি আত্মহত্যার চেষ্টা করেন। এই শিক্ষার্থী সংকটাপন্ন অবস্থায় সিরাজগঞ্জের এনায়েতপুর খাজা ইউনুস আলী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। নাজমুল হাসান তুহিন বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও বাংলাদেশ অধ্যয়ন বিভাগের প্রথম বর্ষের ছাত্র। তার বাড়ি মাগুরা জেলায় বলে জানা গেছে।

এদিকে শিক্ষার্থীদের চুল কেটে দেওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে গতকাল মঙ্গলবার শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে উত্তাল হয়ে ওঠে রবীন্দ্র বিশ^বিদ্যালয় ক্যাম্পাস। শিক্ষার্থীরা গতকাল সকাল থেকে অভিযুক্ত শিক্ষক ফারহানা ইয়াসমিন বাতেনের স্থায়ী অপসারণসহ ৪ দফা দাবিতে পরীক্ষা বর্জন করে একাডেমিক ও প্রশাসনিক ভবনে তালা ঝুলিয়ে দিয়ে দিনভর বিক্ষোভ করেন।

বিশ্ববিদ্যালয়ের একাধিক শিক্ষার্থী জানান, চুল কাটার বিষয়ে ফেইসবুকে স্ট্যাটাস দেওয়ায় আত্মহত্যার চেষ্টা করা তুহিনকে গত সোমবার দুপুরে ডেকে নিয়ে গালিগালাজ করেন সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও বাংলাদেশ অধ্যয়ন বিভাগের চেয়ারম্যান ও সহকারী প্রক্টর ফারহানা ইয়াসমিন বাতেন। তাকে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কারের হুমকি দেন এই শিক্ষক। তিনিই পরীক্ষার হলে শিক্ষার্থীদের চুল কেটে দেন বলে অভিযোগ উঠেছে। ফারহানা ইয়াসমিন গালিগালাজ করার পর ওই দিন পরীক্ষা শেষে দ্বারিয়াপুরের শাহ মুখদুম ছাত্রাবাসের ৫ম তলার নিজ কক্ষে দরজা বন্ধ করে ৩৫টি ঘুমের বড়ি একসঙ্গে গুঁড়া করে খেয়ে তুহিন আত্মহত্যার চেষ্টা করেন। সহপাঠীরা বিষয়টি টের পেয়ে তাকে অচেতন অবস্থায় উদ্ধার করে শাহজাদপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যান। অবস্থা আশঙ্কাজনক হওয়ায় কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে এনায়েতপুর খাজা ইউনুস আলী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠান। সেখানে তার চিকিৎসা চলছে।

শাহজাদপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের কর্তব্যরত চিকিৎসক মনোয়ার হোসেন সুজন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘শিক্ষার্থী তুহিনের অবস্থা আশঙ্কাজনক হওয়ায় উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে এনায়েতপুর খাজা ইউনুস আলী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রেফার্ড করা হয়েছে।’

এদিকে তুহিনের আত্মহত্যাচেষ্টার খবর ছড়িয়ে পড়লে সোমবার রাত ১১টার দিকে শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে এসে ভিড় করেন। এ সময় তারা শিক্ষার্থীদের চুল কাটার ঘটনার নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়ে এতে জড়িত শিক্ষকের অপসারণ দাবিতে বিক্ষোভ করেন। এ সময় সেখানে উপস্থিত রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার সোহরাব আলী ও কয়েকজন শিক্ষক-কর্মচারী তাদের শান্ত করার চেষ্টা করেন। এরপর গতকাল দিনভর বিক্ষোভ করেন শিক্ষার্থীরা। তারা সকাল থেকে চুল কাটায় অভিযুক্ত শিক্ষক ফারহানা ইয়াসমিন বাতেনের স্থায়ী অপসারণসহ ৪ দফা দাবিতে পরীক্ষা বর্জন করে একাডেমিক ও প্রশাসনিক ভবনে তালা ঝুলিয়ে দিয়ে বিক্ষোভ করেন। ছাত্রীরা হাতে লেখা প্ল্যাকার্ড ও পোস্টার হাতে নিয়ে এ বিক্ষোভে অংশ নেন। এ সময় আন্দোলনকারীরা বিভিন্ন স্লোগান দিতে থাকেন। এমন পরিস্থিতিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের একাধিক শিক্ষক ও কর্মকর্তা-কর্মচারী চুল কাটার ঘটনায় দুঃখ প্রকাশ করে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের শান্ত করার চেষ্টা করেন। কিন্তু এতে কাজ না হওয়ায় ঢাকা থেকে ছুটে এসে বিশ্ববিদ্যালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত ভিসি আব্দুল লতিফ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে ছাত্রনেতাদের সঙ্গে দফায় দফায় বৈঠক করেন। তবে কোনো সিদ্ধান্ত ছাড়াই ওই সব বৈঠক শেষ হয়। বৈঠক শেষে আন্দোলনরত ছাত্ররা জানান, তাদের দাবি অনুযায়ী অভিযুক্ত শিক্ষকের স্থায়ী অপসারণ না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চলবে। অন্যদিকে বিশ্ববিদ্যালয় কর্র্তৃপক্ষ বলছে, তদন্ত করে বিষয়টির সন্তোষজনক সমাধান করা হবে।

উল্লেখ্য, গত রবিবার দুপুরে সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও বাংলাদেশ অধ্যয়ন বিভাগের প্রথম বর্ষের ইয়ার চেঞ্জ ফাইনাল পরীক্ষা চলছিল। পরীক্ষার হলে প্রবেশের সময় ওই বিভাগের চেয়ারম্যান সহকারী প্রক্টর ফারহানা ইয়াসমিন বাতেন কাঁচি দিয়ে ১৪ জন পরীক্ষার্থীর মাথার সামনের অংশের কিছু চুল কেটে দেন। এ সময় সেখানে উপস্থিত ছিলেন একই বিভাগের সহকারী প্রক্টর রাজিব অধিকারী ও জান্নাতুল ফেরদৌস মুন। তারা ঘটনার প্রতিবাদ না করে সেখানে নীরব দর্শকের মতো দাঁড়িয়ে ছিলেন। পরদিন সোমবার দুপুরে ওই বিভাগের বাংলাদেশের ইতিহাস বিষয়ে পরীক্ষা শুরুর আগে লাঞ্ছিত পরীক্ষার্থী ও তাদের সহপাঠীরা চুল কাটার ঘটনার প্রতিবাদে পরীক্ষা বর্জন করে বিক্ষোভ ও মানববন্ধন করার জন্য বিশ^বিদ্যালয়ের অস্থায়ী ক্যাম্পাস-১-এর ফটকে জড়ো হন। এ সময় শিক্ষক ফারহানা ইয়াসমিন বাতেন ও তার অনুসারীরা পরীক্ষায় ফেল করিয়ে দেওয়ার ভয়ভীতি দেখিয়ে ও গালাগালি করে শিক্ষার্থীদের পরীক্ষার হলে যেতে বাধ্য করেন। এ ঘটনার পর থেকে ওই বিভাগের শিক্ষার্থীরা আতঙ্কিত হয়ে পড়েন।

সার্বিক বিষয়ে বক্তব্য জানতে চাইলে ফারহানা ইয়াসমিন বাতেন বলেন, তিনি কোনো অন্যায় করেননি। গুটিকয়েক ছাত্র ষড়যন্ত্রমূলকভাবে তাকে হেনস্তা করতে মিথ্যা অভিযোগ তুলে আন্দোলনের নামে ক্যাম্পাস অস্থিতিশীল করে তুলেছে।

অন্যদিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার সোহরাব আলী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা নাজমুলের চিকিৎসার ব্যবস্থা করেছি। তার উন্নত চিকিৎসা চলছে। আশা করি সে ভালো হয়ে আমাদের মধ্যে ফিরে আসবে। আর ছাত্রদের সঙ্গে আলোচনা করে তাদের দাবি-দাওয়ার বিষয়টি সমাধান করা হবে। এ ছাড়া লিখিত অভিযোগের ভিত্তিতে দোষী শিক্ষকের বিরুদ্ধে তদন্ত কমিটি করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’