আগামী ৭ অক্টোবর ৬৯ বছর পূর্ণ করবেন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। ২০০০ সালে দেশটির প্রথম প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন তিনি। এরপর চার মেয়াদে প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব পালন করেছেন। কিন্তু গত বছর গণভোটের মধ্য দিয়ে সংবিধান সংশোধন করে আগামী ২০২৪ ও ২০৩০ সালের নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার মধ্য দিয়ে দুই মেয়াদে আরও ছয় বছর করে দায়িত্ব পালনের সুযোগ করে নিয়েছেন পুতিন। রাশিয়ার নেতা হিসেবে সাম্প্রতিক দশকগুলোতে ভ্লাদিমির পুতিনের নামই বিশ্বজোড়া সবার জানা। কিন্তু রুশ রাজনীতির শীর্ষ রাজনৈতিক কৌশলবিদ হিসেবে ভ্লাদিস্ল্াভ সুরকভের কথা অনেকেরই অজানা। রাজনৈতিকভাবে অস্থিতিশীল, অর্থনৈতিকভাবে বিধ্বস্ত এবং সামরিকভাবে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়া একটি রাষ্ট্রে স্থিতিশীলতা স্থাপন করতে যিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন; যিনি ভ্লাদিমির পুতিন নামে রাজনীতিতে একজন প্রায় অচেনা ব্যক্তিকে একটি রাষ্ট্রের একচ্ছত্র ক্ষমতা লাভে সহায়তা করেছেন; যিনি একদিকে রাষ্ট্রটির মানবাধিকার সংগঠনগুলোকে সহায়তা করেন, আবার অন্যদিকে যারা এই সংগঠনগুলোর বিরোধী তাদেরও সমর্থন করেন; যিনি একইসঙ্গে রাষ্ট্রটির ডানপন্থি, বামপন্থি এবং মধ্যপন্থিদের নিয়ন্ত্রণ করেন এরকম সুচতুর রাজনৈতিক কৌশলবিদ পৃথিবীতে খুব বেশি নেই। এরকমই একজন রাজনীতিবিদ ও ব্যবসায়ী ভ্লাদিস্ল্াভ সুরকভ। তিনি রুশ রাজনৈতিক রঙ্গমঞ্চের পর্দার অন্তরালে থাকা পাপেট মাস্টার, যিনি প্রায় ২০ বছর ধরে রুশ রাজনীতিকে নিয়ন্ত্রণ করে আসছেন। ২০০৮ সালে প্রেসিডেন্ট হিসেবে পুতিনের দ্বিতীয় মেয়াদ যখন শেষ হলো, তখন তিনি দিমিত্রি মেদভেদেভকে সাময়িক উত্তরসূরি হিসেবে বেছে নেন। সে সময় পুতিনবিরোধী অ্যাকটিভিস্ট সের্গেই বিজুইকিন খুব সতর্কতার সঙ্গে কাজ করতেন। কারণ, তখন প্রধানমন্ত্রী পদে ছিলেন পুতিন। আসলে মূল কলকাঠি নাড়তেন পুতিনই। ২০১২ সালে তৃতীয় দফায় পুনর্নির্বাচিত হওয়ার আগ পর্যন্ত এভাবেই চলে। গত বছর মেদভেদেভকে রাশিয়ার ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের উপপ্রধান পদে নিযুক্ত করেন পুতিন। এর মধ্য দিয়ে তাকে ঠেলে দেওয়া হয় লোকচক্ষুর আড়ালে। এ ছাড়া রাশিয়ার পার্লামেন্ট দুমা-তে থাকা তিন দলের জোট ‘নিয়মের বিরোধী দলের’ নেতারাও নামেই আছেন বলে সমালোচকরা মনে করেন। তাদের বেশিরভাগই প্রবীণ। রাজনৈতিকভাবে তাদের নখদন্তবিহীন বলেই মনে করা হয়।
অন্যদিকে, পঁচাত্তর বছর বয়সী ভøাদিমির জিরিনভস্কির অতিজাতীয়তাবাদী ধরনের উদ্ভট কথাবার্তার কারণে তাকে অনেকটাই যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মতো মনে করা হয়। তিনি এখন রাশিয়ার রাজনৈতিক অঙ্গনে ভাঁড়ের মতো। তিনি প্রায়ই ডানপন্থিদের প্রলুব্ধ করে কাছে টানার চেষ্টা করেন এবং পশ্চিমাদের হুমকি দেন। আর সবচেয়ে ছোট ‘নিয়মতান্ত্রিক বিরোধী’ দল ‘আ জাস্ট রাশিয়া’র নেতা সের্গেই মিরোনভ। ৬৯ বছর বয়সী এই ব্যক্তি দুবার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে লড়ে প্রতিবারই সবচেয়ে কম ভোট পেয়েছেন। এমন পরিস্থিতিতে রুশ রাজনীতিতে পুতিনের উত্তরসূরি কে হতে পারেন তা নিয়ে জল্পনা-কল্পনার শেষ নেই যেন। কিছু পর্যবেক্ষক অবশ্য পুতিনের সম্ভাব্য উত্তরসূরি হিসেবে প্রতিরক্ষামন্ত্রী সের্গেই শোইগুকে বিবেচনা করছেন। তিনি রুশ মন্ত্রিসভায় সবচেয়ে বেশি সময় ধরে কাজ করছেন। পুতিনের পর তাকেই দ্বিতীয় জনপ্রিয় ব্যক্তি বলে মনে করা হয়। শোইগুর নামের প্রথম অংশটি রুশ হলেও তিনি তুর্কি ভাষাভাষী দরিদ্র প্রদেশ তুবার একজন বৌদ্ধ। এই প্রদেশটি চীন সীমান্তের সঙ্গে। রাশিয়ার মধ্যে এ অঞ্চলটিতে খুন ও আত্মহত্যার হার সর্বোচ্চ। তুবার অনেক বুদ্ধিজীবী তাকে মঙ্গোলীয় জেনারেল সুবেদেইর নতুন আবির্ভাব বলে মনে করে থাকেন। আট শতাব্দী আগে সুবেদেইর সেনাবাহিনী বর্তমান রাশিয়া ও ইউক্রেনের কাছে ব্যাপকভাবে পরাজিত হয়েছিল। ১৯৯০ দশকের শুরুর দিকে শোইগু রাশিয়ার জরুরি পরিস্থিতি বিষয়ক মন্ত্রী হিসেবে তার কর্মজীবন শুরু করেন। মন্ত্রণালয়টিকে কার্যকর করে সামরিক কাঠামোতে রূপ দেন তিনি। পুতিন প্রেসিডেন্ট হওয়ার আগ পর্যন্ত তিনিই সব রাজনৈতিক তালিকায় শীর্ষে ছিলেন।
অবশ্য, পুতিন এখনো ২০২৪ সালের নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার সিদ্ধান্ত নেননি। ক্রেমলিনপন্থি বিশ্লেষকরা পুতিনের যোগ্য উত্তরসূরি হিসেবে বর্তমান মন্ত্রিসভা থেকে কারও নাম প্রকাশ করতেও অস্বীকৃতি জানাচ্ছেন। মস্কোর একটি থিংকট্যাংক ‘সেন্টার অব পলিটিক্যাল ইনফরমেশন’-এর প্রধান আলেক্সেই মুখিন বলেন, আমি গোপন নথিতে এই বিষয়ে অনেকবার লিখেছি। কিন্তু প্রকাশ্যে তাদের নাম উচ্চারণ করিনি, কারণ এতে মানুষ প্রভাবিত হতে পারে। আলেক্সেই বলেন, পুতিনের অবসর বা মৃত্যুর পর ক্রেমলিনে তার সম্ভাব্য উত্তরসূরিদের নামের তালিকা প্রকাশ করা হবে। তার মতে, এটি পুতিনের বিষয় না। এটি হলো, জনগণের স্বার্থে তালিকাটি একেবারে শেষ সময় পর্যন্ত গোপন রাখা। স্মরণ করা যেতে পারে, প্রেসিডেন্ট প্রার্থী হওয়ার চেষ্টা করায় ২০১৯ সালে রাশিয়া ছাড়তে বাধ্য হয়েছিলেন পুতিনবিরোধী অ্যাকটিভিস্ট সের্গেই বিজুইকিন। তিনি বলেন, পুতিন খুবই সন্দেহপ্রবণ ও চাপা স্বভাবের। এমনকি তিনি যদি কাউকে উত্তরসূরি হিসেবে মনে মনে চূড়ান্ত করেও থাকেন, উপযুক্ত সময়ের আগে তা প্রকাশ করবেন না। তিনি আরও বলেন, ‘অবশ্য বেঁচে থাকতে ক্ষমতা হস্তান্তরের বিষয়টি পুতিন ভাবছেন না বলেই আমার ধারণা। কারণ, স্বৈরশাসকরা ভবিষ্যতে কী ঘটবে, তা নিয়ে ভাবেন না। পুতিনের শাসনের অধীনে তার সব ক্যারিশম্যাটিক সমালোচক যারা জনমনে ইতিবাচক ছাপ ফেলতে পারেন, তাদের আগাছা নিড়ানোর মতো করে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। এ জন্যই পুতিনবিরোধী সাবেক দাবা চ্যাম্পিয়ন গ্যারি কাসপারভকে ২০১৩ সালে দেশ ছাড়তে হয়েছিল। এছাড়া আলোচিতদের মধ্যে ছিলেন, নিষিদ্ধ ন্যাশনাল বলশেভিক পার্টির প্রতিষ্ঠাতা এবং নানা কারণে সমালোচিত ঔপন্যাসিক এডওয়ার্ড লিমোনভ ২০১৪ সালে ক্রিমিয়া দখলের পর ক্রেমলিনের অনুগত হিসেবে বিবেচিত হন। পুতিনের প্রথম প্রধানমন্ত্রী মিখাইল কাসানভ উদার গণতান্ত্রিক বরিস নেমতসভের সঙ্গে যোগ দিয়েছিলেন। কিন্তু ২০১৫ সালে বরিসকে ভাড়াটে খুনি দিয়ে হত্যা করা হলে মিখাইল রাজনীতিকে বিদায় জানান। আর তিনবারের পার্লামেন্ট সদস্য ইরিনা হাকামাদা ২০০৪ সালে পুতিনের প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী ছিলেন। কিন্তু তিনি এখন সরাসরি রাজনীতির মাঠ থেকে দূরে। মানুষকে উজ্জীবিত করার এক বক্তা ও টেলিভিশন ব্যক্তিত্বে পরিণত হয়েছেন।
এ ছাড়া এখন ক্ষমতায় থাকা ব্যক্তিদের মধ্যে যাদেরই উত্তরসূরি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে, তাদের গুরুত্বহীন জায়গায় নিচের পদে নামিয়ে দেওয়া হয়েছে। এর জলজ্যান্ত উদাহরণ দিমিত্রি মেদভেদেভ। অন্যদিকে, ২০১২ সালে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব নেওয়ার আগ পর্যন্ত শোইগুকে উদার গণতন্ত্রপন্থি হিসেবে মনে করা হতো। কিন্তু তার হাত ধরেই পুতিনের ক্রেমলিনের সব সাফল্য। ক্রিমিয়া দখল ও সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদকে ক্ষমতায় টিকিয়ে রাখার সাফল্য তার হাত ধরেই আসে। ৬৬ বছরের শোইগুকে প্রায়ই পুতিনের সঙ্গে মাছ ধরতে ও শিকারে যেতে দেখা যায়। এটিকে সম্ভাব্য উত্তরসূরি হিসেবে বেছে নেওয়ার প্রতীকী কর্মকাণ্ড হিসেবেও মনে করা হচ্ছে। অবশ্য পুতিন মাঝেমধ্যেই বিশ্বকে তার খেলোয়াড়ি নৈপুণ্য দেখান। ২০০৭ সালে মঙ্গোলিয়ায় স্নাইপার রাইফেল হাতে দেখা গেছে পুতিনকে। সিনেমায় নায়কদের সচরাচর এমন আগ্নেয়াস্ত্র হাতে দেখা যায়। কখনো আইস হকি, কখনো জুডো কারাতে খেলেন। সে যাই হোক, জার্মানির ব্রেমেন ইউনিভার্সিটির গবেষক নিকোলাই মিত্রোখিনও বলেন, এখনকার জন্য অন্য যে কারও তুলনায় শোইগু’র সম্ভাবনা অনেক বেশি।
অনেকেই প্রশ্ন করেন, প্রেসিডেন্ট পুতিন কি আজীবন ক্ষমতায় থাকতে চান? এ প্রসঙ্গে পুতিনের শুরুর গল্পটা খুবই প্রাসঙ্গিক। গোয়েন্দা বইয়ের পোকা ছিলেন ভ্লাদিমির পুতিন। ১৬ বছর বয়সে যোগ দিতে চলে গিয়েছিলেন গোয়েন্দা সংস্থা কেজিবিতে। কর্মকর্তারা শারীরিক গড়ন ও বয়স নিয়ে হাসাহাসি করে বলেছিলেন, ফিল্ড ওয়ার্ক হবে না তোমাকে দিয়ে। এক কাজ করো, দু-তিনটি ভাষা শিখে নাও আর আইন পড়ো। তাহলে বড় হয়ে কেজিবির ডেস্ক ওয়ার্ক করতে পারবে। সেদিন হতাশা নিয়ে ফিরে ছেলেটি কয়েকটি ভাষা শিখলেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন পড়লেন। পুতিনের ২৩ বছর বয়সে একদিন খোদ কেজিবির কর্মকর্তারাই কড়া নাড়েন তার দরজায়। সেই ছেলে ১৯৯৯ সালের ৩১ ডিসেম্বর রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট হন। পরবর্তী দুই দশকে যুক্তরাষ্ট্রের তিনজন প্রেসিডেন্ট এবং ব্রিটেনের পাঁচজন প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতায় আসা-যাওয়া দেখলেন পুতিন। কিন্তু তিনি বহাল তবিয়তে।
পুতিন যে সংবিধান পরিবর্তনের পদক্ষেপ নিয়েছেন, তার মধ্য দিয়ে পার্লামেন্ট ও প্রধানমন্ত্রীর পদ শক্তিশালী হয়ে উঠবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। সংবিধানে কী কী পরিবর্তন হবে, তার একটি ইঙ্গিতও দিয়েছেন পুতিন। তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন, প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রিসভা নির্ধারণ করবেন আইনপ্রণেতারা। বর্তমানে এই ক্ষমতা প্রেসিডেন্টের। দেশটির পার্লামেন্টের উচ্চকক্ষ ফেডারেল কাউন্সিলের সঙ্গে আলোচনা করে প্রেসিডেন্ট বিভিন্ন নিরাপত্তা সংস্থার প্রধানদের নিয়োগ দেবেন। এটি নতুন সংশোধনী। এ ছাড়া প্রেসিডেন্টের উপদেষ্টা পরিষদ হিসেবে কাজ করবে স্টেট কাউন্সিল। এদিকে প্রেসিডেন্ট প্রার্থী হওয়ার ক্ষেত্রে কড়াকড়ি আরোপ করেছেন পুতিন। অতীতে বিদেশে বসবাস করেছেন এমন কেউ প্রেসিডেন্ট প্রার্থী হতে পারবেন না। সরকারি কর্মকর্তারা অন্য কোনো দেশের নাগরিক হতে পারবেন না। এ ছাড়া আরও বেশ কিছু পরিবর্তন এনেছেন তিনি। ধারণা করা হচ্ছে, এর মধ্য দিয়ে পুতিনের ক্ষমতা আঁকড়ে রাখা আরও সহজ হতে যাচ্ছে। কারণ, এসব পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে সংবিধান লংঘন না করেই ক্ষমতা কাজে লাগাতে পারবেন তিনি।
কিন্তু সংবিধান অনুসারে টানা তৃতীয় মেয়াদে প্রেসিডেন্ট হওয়ার সুযোগ পুতিনের নেই। তবে, এটা পুরোপুরি পরিষ্কার নয়, তিনি আবার কোন পদে ফিরবেন। বিশ্লেষকরা বলছেন, আবারও প্রধানমন্ত্রী হতে যাচ্ছেন তিনি। পার্লামেন্টের ক্ষমতা বাড়ানো হচ্ছে মূলত এ জন্যই। তবে অনেক বিশ্লেষক এর সঙ্গে ভিন্নমত পোষণ করেছেন। তারা বলছেন, সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের আরেক দেশ কাজাখস্তানের প্রেসিডেন্ট নুরসুলতান নজরবায়েভের পথে হাঁটছেন তিনি। সবচেয়ে বেশি সময় ধরে কাজাখস্তানে ক্ষমতায় ছিলেন তিনি। ২০১৮ সালে তিনি দেশটির সিকিউরিটি কাউন্সিলের ক্ষমতা বৃদ্ধি করেন এবং আজীবনের জন্য এই কাউন্সিলের চেয়ারম্যান হন। সংবিধান সংশোধনের যেসব ইঙ্গিত পাওয়া গেছে তাতে মনে হচ্ছে, পুতিনও সেই পথে হাঁটছেন।
লেখক গবেষক ও কলামনিস্ট
raihan567@yahoo.com